খুলনা | রবিবার | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

স্বর্ণের কানের দুলের জন্য হত্যা সন্দেহ স্বজনদের

বাগেরহাটে শিশু মুসলিমা হত্যার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ৩

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাগেরহাট |
০৫:২৫ পি.এম | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


হত্যার শিকার সাত বছরের মেয়ে মুসলিমার বউ সাজা ছবি হাতে বাড়ির উঠোনে নির্বাক বসে আছেন বাবা ইসলাম শেখ। আর মেয়ে হারানোর শোকে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন মা লাইলি বেগম। জ্ঞান ফিরলেই স্বজনদের জড়িয়ে ধরে অঝোরে কান্না করছেণ। মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ আর বাবার নিস্তব্ধতায় ভারী হয়ে উঠছে আকাশ বাতাস। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর একটায় দৃশ্য বাগেরহাটের মোল্লাহাটের কচুড়িয়া গ্রামের হতভাগা শিশু মুসলিমার বাড়ির দৃশ্য এটি।

গতকাল শনিবার পরন্ত বিকেলে মায়ের অনুমতি নিয়ে প্রতিবেশী জাহাঙ্গীরের মেয়ে মরিয়মের সাথে খেলতে যায় শিশু মুসলিমা। সন্ধ্যা হয়ে আসলেও মুসলিমা ফিরে না আসায় শুরু হয় খোজাখুজি। তখনও জাহাঙ্গীরের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয় মুসলিমা তাদের বাড়ি নেই।

এক পর্যায়ের সন্ধ্যার পরে এলাকাবাসী সবাই মিলে খোজাখুজি শুরু করে। এলাকার লোকজন জাহাঙ্গীরের বসত ঘর ও বরাজ এলাকায় তল্লাশী চালাতে গেলে জাহাঙ্গীর ও তার স্ত্রী মৌখিকভাবে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করে। মুসলিমা মোল্লাহাট সদরের দিকে গেছে, সবাইকে ওই দিকে যাওয়ার জন্য বলতে থাকে তারা। তবে স্থানীয়রা তাদের কথায় কান না দিয়ে, জাহাঙ্গীরের বরাজ, পুকুর ও পার্শ্ববর্তী মাছের ঘেরের পারে তল্লাশী শুরু করে। এক পর্যায়ে জাহাঙ্গীরের পানের বরাজ ও একটি মাছের ঘেরের মাঝামাঝি স্থানে পলিথিন মোড়ানো অবস্থায় বস্তাবন্দি গলাকাটা অবস্থায় মুসলিমার মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয়রা। মরদেহ পাওয়ার সাথে সাথে জাহাঙ্গীর ও তার পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

তখন এলাকাবাসী জাহাঙ্গীর শেখ (৫৫), তার দুই ছেলে রমজান শেখ (২৩) ও আব্দুর রহমান (১৯)কে ধরে ফেলে। পরে পুলিশ তাদেরকে গ্রেপ্তার করে। তবে জাহাঙ্গীরের স্ত্রী পলাতক রয়েছে। আর উত্তেজিত জনতা জাহাঙ্গীরে বসত ঘর, পানের বরাজ, খরের গাদা ও রান্না ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। রোববার বিকেলেও, জাহাঙ্গীরের বসত ঘর ও খরের গাদা থেকে ধোয়া উড়ছিল।

স্থানীয়রা জানান, জাহাঙ্গীরের ছেলে রমজান শেখ মাদকের সাথে জড়িত। এমনকি আব্দুর রহমানও মাদক সেবন করেন। এভাবে মুসলিমাকে মেরে ফেলে, প্রতিবেশীর কাছেও যদি শিশুরা নিরাপদ না হয় তাহলে সমাজ চলবে কেমনে।

নুরুন্নাহার নামের এক নারী বলেন, ৭ বছরের একটি শিশু কতই বা বোঝে, তাকে হত্যা করে ফেলল। হয়ত ধর্ষনের পরে হত্যা করেছে। শুধু নুরুন্নাহার নয়, স্থানীয় আরও কয়েকজন বলেছেন শারীরিক নির্যাতনের পর মুসলিমাকে হত্যা করেছে রমজান শেখ। তবে ধর্ষণের কোন আলামত পায়নি পুলিশ।

মেয়ে হারানোর কষ্টে কথা বলতে পারছিলেন না মুসলিমার বাবা ইসলাম শেখ। ফ্যাসফেসে গলায় তিনি বলেন, যখন বাড়ি (একতলা বিশিষ্ট ভবন) করি তখন রমজান আমার কাছে টাকা চেয়েছিল। তখন বলেছি, আমি তোরে টাকা দেব কেন, তখন রমজান বলেছে, বাড়ি করতেছ কিছু টাকা দেবা। তখন বলেছি, কোন টাকা দিতে পারব না।

তিনি আরও বলে, আমার মেয়েকে যেভাবে অত্যাচার করে হত্যা করেছে, আমি এই ঘটনার এমন শাস্তি চাই, যাতে আর কারও বুক খালি করতে না পারে।

ইসলাম বলেন, আমার মেয়ের কানে এক জোড়া স্বর্ণের দুল ছিল। কিন্তু তা আর পাওয়া যায়নি। মনে হয় রমজান খুলে নিয়ে গেছে। এজন্যই আমার মেয়েকে হত্যা করেছে ওরা।

মুসলিমার মা লাইলি বেগম বলেন, আমার মেয়েকে ওরা অনেক কষ্ট দিয়ে মেরেছে। জাহাঙ্গীর ও তার স্ত্রী সব জানে। ওরা না জানলে বার বার আমাকে কেন বলবে, তোমার মেয়ে মোল্লাহাটের দিকে গেছে। আমার বুকটা খালি করে দিল, আমি কাকে নিয়ে বাঁচব বলে আবারও কান্না শুরু করেন সন্তান হারা লাইলি বেগম।

এদিকে, এ ঘটনায় মুসলিমার বাবা ইসলাম শেখ বাদী হয়ে শনিবার রাতেই মোল্লাহাট থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তার ৩ আসামীকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করেছে মোল্লাহাট থানা পুলিশ।

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. জামিরুল ইসলাম বলেন, শিশু মুসলিমার হত্যা মামলায় এজাহার নামীও ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ময়না তদন্ত শেষে নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। হত্যার ঘটনা খুব গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান জেলা পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

ইসলাম শেখ ও লাইলি দম্পতির ৩ সন্তানের মধ্যে মুসলিমা সবার ছোট। আদরের বোনকে হারিয়ে শোকাহত তারাও। নামাজে জানাজা শেষে বিকেলে মুসলিমার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ