খুলনা | মঙ্গলবার | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

অশ্র“সিক্ত বিদায় : এক স্নেহময় অভিভাবকের অকাল প্রস্থান

কৃষ্ণ গোপাল সেন, রূপসা |
০১:০৯ এ.এম | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


একটি অনাকাক্সিক্ষত মুহূর্ত কীভাবে একটি সাজানো সংসার আর পুরো জনপদকে শোকের অতল গহŸরে ভাসিয়ে দিতে পারে, তারই এক হৃদয় বিদারক সাক্ষী হলো রূপসার সামন্ত সেনা গ্রাম। রূপসা উপজেলার এক চিরচেনা, প্রিয়মুখ-নজরুল ইসলাম ভাই হঠাৎ করেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। জাগতিক সব মায়া ছিন্ন করে তার এই আকস্মিক ও অকাল চলে যাওয়া যেন গোটা এলাকার বাতাসকেই ভারী করে তুলেছে।
ঘটনাটি ঘটেছিল একটি  স্নেহের টানে।  গতকাল সোমবার সকাল দশটার কিছু পর, নিজের একমাত্র নয়নের মণি প্রিয় নাতনীর জন্য ওষুধ কিনতে মোটরসাইকেল নিয়ে লকপুর এলাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন তিনি। যে পথ ধরে তিনি ছুটেছিলেন পরম মমতায়, সেই পথেই ওৎ পেতে ছিল নিষ্ঠুর নিয়তি। লকপুর এলাকায় রাস্তা অতিক্রম করার মুহূর্তে প্রায় একশ’ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা একটি বেপরোয়া প্রাইভেট কার সজোরে ধাক্কা দেয় তাকে। মুহূর্তের মধ্যে সব ওলটপালট হয়ে যায়; দুমড়ে-মুচড়ে যায় মোটরসাইকেলটি আর রাজপথে ছিটকে পড়ে মাথায় ও শরীরে মারাত্মক রক্তক্ষরণ নিয়ে লুটিয়ে পড়েন তিনি। ঘাতক প্রাইভেট কারের চালকই তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নিকটস্থ সিএসএস হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে তাকে স্থানান্তর করা হয় খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সময় তখন আনুমানিক সকাল সাড়ে দশটা। চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা আর স্বজনদের বুকফাটা প্রার্থনাকে ব্যর্থ করে দিয়ে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তিনি পাড়ি জমান অনন্তের ওপারে। নজরুল ইসলাম ভাই ছিলেন এক বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। লোকদেখানো আড়ম্বর নয়, সাদাসিধে ও অমায়িক জীবন যাপনেই ছিল তার আত্মতৃপ্তি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে নিষ্ঠাবান, চরম সত্যবাদী এবং স্পষ্টভাষী এই মানুষটি আজীবন অন্যের কল্যাণে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। এলাকায় এমন কোনো মানুষ নেই, যিনি বলতে পারবেন নজরুল ভাই কারও সামান্যতম অপকার করেছেন। তার এই অমায়িক ব্যবহার আর নিষ্কলুষ চরিত্র তাকে এলাকার প্রতিটি মানুষের আপনজনে পরিণত করেছিল।
অথচ নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, এই স্নেহশীল মানুষটি যখন চিরতরে চোখ বুজলেন, পেছনে রেখে গেলেন এক অপূরণীয় শূন্যতা আর পাহাড়সম ট্রাজেডি। তার একমাত্র পুত্র জ্যাকি ইসলাম সজল দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে । অসুস্থ শরীরে যখন বাবার নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, ঠিক তখনই মাথার ওপর থেকে সরে গেল বটবৃক্ষের ছায়া। পিতৃহারা হয়ে মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে অসুস্থ সজল; তার সেই শূন্য দৃষ্টি আর বুকভাঙা হাহাকার উপস্থিত কাউকেই স্থির থাকতে দেয়নি। অন্যদিকে প্রিয়তম স্বামীকে হারিয়ে নির্বাক, পাথর হয়ে বসে আছেন স্ত্রী; বাবার স্নেহবঞ্চিত কন্যাটিও শোকে যেন স্তব্ধ, চোখের জলও যেখানে শুকিয়ে গেছে বোবা যন্ত্রণায়। 
সন্ধ্যার আঁধার নামার পর যখন তার নিথর দেহ সামন্ত সেনা গ্রামের নিজ বাড়িতে এসে পৌঁছায়, তখন পুরো বাড়িতে শুরু হয় শোকের মাতম। কান্না আর আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। তাকে শেষবারের মতো একনজর দেখার জন্য ভিড় জমান শত শত নারী-পুরুষ, পাড়া-প্রতিবেশী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গ। সর্বস্তরের মানুষের এই উপস্থিতিই প্রমাণ করে দেয়, কতটা ভালোবাসার মানুষ ছিলেন তিনি। অবশেষে রাত ৯টায় কাজদিয়া সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় মরহুমের নামাজে জানাজা। হাজারো মানুষের সজল চোখ আর কায়মনোবাক্যে দোয়ার মধ্য দিয়ে নিজ পারিবারিক কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। পৃথিবীর আলো নিভে গেলেও নজরুল ইসলাম ভাই বেঁচে থাকবেন তার সরলতা, পরোপকার আর সততার সুবাসে-রূপসার মানুষের অন্তরে চিরকাল। মহান সৃষ্টিকর্তা  শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি দিন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ