খুলনা | বুধবার | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ফুরিয়ে আসছে সমাধানের পথ, আরও বাড়তে পারে জ্বালানির দাম

খবর প্রতিবেদন |
০২:০১ এ.এম | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতি আগামীতে জ্বালানি পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৫ ডলার থাকলেও, চলতি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে তা ১০৮ ডলার ছাড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়েও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল হ্রাস পেয়ে ১৫ শতাংশের নিচে নেমেছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলের হামলার পর পরই বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করেছিলেন যে, তেলের দাম শিগগিরই ব্যারেলপ্রতি ১৫০ বা এমনকি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এখনও তেমনটা ঘটেনি। তবে সংঘাত সাত মাস ধরে চলার পরও যুদ্ধ শেষের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত না মেলায় বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার বিদ্যমান সুরক্ষা ব্যবস্থাও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।

জ্বালানি ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেন এমন গবেষকেরা জানিয়েছেন, তারা পুরো সংঘাতজুড়ে এই গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তাদের মতে, তেলের বাজারে এখন এমন কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যাতে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি, এমনকি ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা সত্ত্বেও পারস্য উপসাগর থেকে কিছু তেল বাইরে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। সৌদি আরব তার পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পরিবহন বাড়িয়েছে। এই পাইপলাইনটি পারস্য উপসাগরের আবকাইক থেকে স্থলপথে লোহিত সাগরের উপকূলের ইয়ানবু পর্যন্ত বিস্তৃত। পূর্ণ সক্ষমতায় পাইপলাইনটি প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করতে পারে। তবে সাধারণত প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করা হয়।

কিন্তু সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পাইপলাইনে হুতিদের হামলার ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে ওই পাইপলাইনে তেল সরবরাহ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। পাইপলাইনটি এখন খুব কম পরিমাণে আবার চালু হয়েছে। তবে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে সম্ভবত অন্তত ছয় থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগবে। এই স্বল্পমেয়াদি বিরতিও আগে থেকেই সংকুচিত তেলের বাজারকে আরও সংকুচিত করেছে। লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানিতে হুতিদের আরও হামলার হুমকি মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বাড়াবে।

এদিকে রাশিয়ায় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় তেল শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে রাশিয়ায় ডিজেল উৎপাদন কমে গেছে এবং দেশটি ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। ফলে ট্রাক ও জাহাজ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ডিজেলের বৈশ্বিক দৈনিক সরবরাহ আরও ৩ শতাংশ কমেছে। ডিজেলের দাম বাড়লে বিশ্ব অর্থনীতিজুড়ে পণ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়ে।

গত ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭টি রাজ্যে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। দেশটিতে ডিজেলের জাতীয় গড় দাম দাঁড়িয়েছে প্রতি গ্যালন ৬ দশমিক ৫২ ডলার। উচ্চমূল্যের কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার হুমকি দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এমন পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী সরবরাহের ঘাটতির কারণে মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করবে।

বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি উৎপাদক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এই ধাক্কা আরও তীব্র। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল। যুদ্ধ শুরুর পরপরই এসব দেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েকটি দেশকে জ্বালানি রেশনিং করতে হয়েছে। অন্যগুলো জ্বালানি ব্যবহার কমাতে কর্মসপ্তাহ বা স্কুলসপ্তাহ সংক্ষিপ্ত করার মতো জরুরি ব্যবস্থা নিয়েছে।

এই সংকট এখন ইউরোপেও তীব্রভাবে আঘাত হানছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর জানা গেছে, ফ্রান্সের প্রায় ১৫ শতাংশ সার্ভিস স্টেশনে ডিজেল বা গ্যাস ফুরিয়ে গিয়েছিল।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তেলের চাহিদা কমাতে এবং সরবরাহ বাড়াতে ইতোমধ্যে প্রায় সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপ তেলের মূল্যবৃদ্ধির মাত্রা কমিয়েছে, কিন্তু তা পুরোপুরি ঠেকাতে পারেনি। এখন হাতে থাকা উপায়গুলো প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। ফলে তেলের দাম আবারও আকস্মিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

২০২৬ সালের মার্চে ৩২টি দেশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় তাদের কৌশলগত মজুত থেকে ৪০ কোটিরও বেশি ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে ছাড়া হয়। সেই মজুত এখন অনেকটাই কমে গেছে। যুদ্ধ চলতে থাকলে দেশগুলো আর কতটা অতিরিক্ত তেল ছাড়তে ইচ্ছুক বা সক্ষম হবে, তা স্পষ্ট নয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই ১৩ কোটি ব্যারেল তেল ছেড়েছে। ফলে দেশটির মজুত গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ সংরক্ষণাগারে কাঠামোগত কারণে তারাও হয়তো আর বেশি তেল ছাড়তে পারবে না।

সরকারি মজুত প্রকাশের পাশাপাশি আগে জনসাধারণের কাছে অপ্রকাশিত বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত মজুত উন্মোচনের মাধ্যমে চীন এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। দেশটি গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে অপরিশোধিত তেল আমদানি প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়েছে। এ সময়ে চীনা অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতায়ন দেশটির তেলের চাহিদা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অন্যান্য দেশও সাহায্যের জন্য চীনের দিকে তাকিয়ে আছে। তেলের বাজারে ধাক্কা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে এসব দেশ চীনের বৈদ্যুতিক যান, ব্যাটারি ও সৌর প্যানেলের দিকে ঝুঁকছে। ফলে এসব পণ্যের আন্তর্জাতিক বিক্রি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের দিক থেকে আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তেলের চাহিদা মেটাতে ও পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদনের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে চীন আরও বেশি কয়লা ব্যবহার করেছে।

সম্ভবত আরও তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয় হলো, চীনের তেলের চাহিদা এখন আবার ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। আগস্টে আগের মাসের তুলনায় দেশটির অপরিশোধিত তেল আমদানি ৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। চীনের আমদানি শিগগিরই যুদ্ধের আগের পর্যায়ে না পৌঁছালেও দেশটির বাড়তি চাহিদা এবং তেলের বাজারে সংকটের কারণে আগামী কয়েক সপ্তাহে দাম আরও বাড়তে পারে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ