খুলনা | শনিবার | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

শিশুরা যখন জলবায়ুর কথা বলে, খুলনা কি শুনছে?

এলিন মাহবুব |
০১:০০ এ.এম | ০৩ অক্টোবর ২০২৬


খুলনায় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ উপকূলীয় শিশু জলবায়ু সম্মেলনে প্রায় দুই শত শিশু যে ১৩ দফা দাবি তুলেছে, সেগুলোকে শুধু একটি সম্মেলনের বক্তব্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। নিরাপদ পানি, জলবায়ু-সহনশীল বাঁধ, শিশুবান্ধব আশ্রয়কেন্দ্র, স্বাস্থ্যসেবা এবং দুর্যোগের মধ্যেও শিক্ষা অব্যাহত রাখার দাবি,এসব আসলে উপকূলের শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা দাবি।
আর এখানেই সম্মেলনটির গুরুত্ব। প্রশ্ন হলো, শিশুরা যখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এত স্পষ্টভাবে কথা বলছে, তখন আমরা কি শুধু তাদের শুনছি, নাকি তাদের অভিজ্ঞতাকে নীতিনির্ধারণের অংশও করছি? বাংলাদেশের উপক‚লীয় অঞ্চলের জন্য প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন এখানে কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যতের সংকট নয়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ¡াস, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও নিরাপদ পানির সংকট ইতোমধ্যে মানুষের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে উঠেছে। আর এর অভিঘাত শুধু একটি পরিবারের বর্তমান জীবনকে বদলায় না; তা একটি শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও প্রভাবিত করে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ শিশুর শিক্ষা কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়েছিল বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা। তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার কারণে বিভিন্ন সময়ে বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয়েছে। খুলনা, চট্টগ্রাম ও রংপুরের প্রতিটি জেলায় এক বছরের মধ্যে জলবায়ুজনিত কারণে প্রায় ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত বিদ্যালয় বন্ধ ছিল। সিলেটে শিশুরা হারিয়েছে সর্বোচ্চ আট সপ্তাহের শিক্ষাদিবস।
এটি শুধু কয়েক সপ্তাহ বিদ্যালয়ে যেতে না পারার হিসাব নয়। একটি শিশু যখন বারবার বিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তার শেখার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। দুর্যোগের পর দরিদ্র পরিবারের জন্য সন্তানকে আবার বিদ্যালয়ে পাঠানোও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা ব্যাহত হলে বিশেষ করে কিশোরীদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া এবং বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে এমন সুর্কতাও দিয়েছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা। অর্থাৎ জলবায়ু সংকটকে যদি আমরা শুধু পরিবেশের সংকট হিসেবে দেখি, তাহলে সমস্যাটির একটি বড় অংশ আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যাবে।
নিরাপদ পানি কি শিক্ষারও শর্ত? উপকূলের শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের আটটি উপকূলীয় জেলার তথ্য বিশ্লেষণ করে পানির লবণাক্ততা ও শিশুদের শিক্ষাগণ অগ্রগতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকা ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা গড়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ-পয়েন্ট কমে যায়। গবেষণাটি আরও দেখিয়েছে, দারিদ্র্য এই নেতিবাচক প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে।নিরাপদ পানি তাই শুধু স্বাস্থ্যগণ প্রয়োজন নয়। উপকূলীয় শিশুর শিক্ষা ও বিকাশের সঙ্গেও পানির নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে।
একটি শিশুর বাড়িতে নিরাপদ পানি না থাকলে তার পরিবারকে বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। অসুস্থতা বাড়তে পারে। পরিবারের আয় কমে যেতে পারে। দুর্যোগের পর বিদ্যালয়ে ফেরার সক্ষমতাও কমতে পারে। ফলে পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দারিদ্র্য, এসবকে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখলে উপক‚লের বাস্তবতাকে পুরোপুরি বোঝা যায় না।
শিশুরা যে প্রশ্নগুলো আমাদের সামনে এনেছে এই বাস্তবতার মধ্যেই খুলনার শিশুদের ১৩ দফা দাবি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তারা নিরাপদ পানির স্থায়ী সমাধান চেয়েছে। চেয়েছে টেকসই জলবায়ু-সহনশীল বাঁধ, আধুনিক ও শিশুবান্ধব আশ্রয়কেন্দ্র, স্বাস্থ্যসেবা এবং দুর্যোগের মধ্যেও শিক্ষা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা। পাশাপাশি তারা জলবায়ু শিক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি, মানসিক সুস্থতার সহায়তা, বাস্তুচ্যুত পরিবারের সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ও মৎস্যব্যবস্থার কথাও বলেছে। নদী-খাল ও সুন্দরবন রক্ষার দাবিও তাদের বক্তব্যে এসেছে।
দাবিগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়-উপকূলের শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু পরিবেশের সমস্যা হিসেবে দেখছে না। তাদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন মানে পানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ঘরবাড়ির নিরাপত্তা, পরিবারের জীবিকা এবং শেষ পর্যন্ত মানে তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ।
আমাদের নীতিনির্ধারণেও কি জলবায়ু সংকটকে একইভাবে দেখা হচ্ছে? একটি বাঁধ কি একটি শিশুকে নিরাপদ করে? উপকূলীয় সুরক্ষায় বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি বাঁধ কতটা শক্তিশালী শুধু এই প্রশ্ন দিয়ে একটি শিশুর জলবায়ু নিরাপত্তা মাপা যায় না। আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপদ পানি আছে কি? মেয়ে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত শৌচাগার আছে কি? প্রতিবন্ধী শিশু সেখানে সহজে প্রবেশ করতে পারে কি? দুর্যোগের পর বিদ্যালয় কত দ্রুত চালু হয়? দীর্ঘদিন বিদ্যালয় বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা আছে কি?
দুর্যোগের কারণে পরিবার বাস্তুচ্যুত হলে শিশুটির শিক্ষা কোথায় চলবে? এই প্রশ্নগুলো দেখিয়ে দেয়, জলবায়ু সহনশীলতা শুধু অবকাঠামোর বিষয় নয়। এটি মানুষের সক্ষমতা, নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার বিষয়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে শিশুরা কী শিখছে? ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ৩০ জন প্রাথমিক শিক্ষকের গভীর সাক্ষাৎকার নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক শিক্ষার বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ্যক্রমে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়বস্তু ধারাবাহিকভাবে একীভ‚ত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষা, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও সেখানে উঠে এসেছে। অবশ্যই এই গবেষণার ফলাফল পুরো বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না। এটি একটি নির্দিষ্ট এলাকার ৩০ জন শিক্ষকের গুণগণ গবেষণা।
তবু প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। শ্যামনগরের একটি শিশু যদি প্রতিদিন লবণাক্ত পানি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ¡াস, নদীভাঙন কিংবা সুন্দরবনের পরিবর্তন দেখে বড় হয়, তাহলে জলবায়ু শিক্ষা তার কাছে শুধু পাঠ্যবইয়ের একটি অধ্যায় হওয়া উচিত কি? তার এলাকার পানি, নদী, বাঁধ, কৃষি, মৎস্য ও দুর্যোগের অভিজ্ঞতাও কি সেই শিক্ষার অংশ হতে পারে না?
জলবায়ু শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু শিশুকে জলবায়ু পরিবর্তনের সংজ্ঞা শেখানো নয়। তাকে নিজের পরিবেশ বুঝতে, ঝুঁকি শনাক্ত করতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে সক্ষম করাও এর অংশ হওয়া উচিত।
এখানেই খুলনার শিশুদের সম্মেলন আমাদের জন্য একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায়।শিশুদের কথা শোনা মানে এই নয় যে প্রতিটি নীতি তাদের দিয়ে তৈরি করতে হবে।বরং তাদের অভিজ্ঞতাকে নীতিনির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।কারণ তারা জানে কোন রাস্তা বৃষ্টির পর ডুবে যায়। তারা জানে কোথায় নিরাপদ পানি পাওয়া কঠিন। তারা জানে কোন আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। তারা জানে দুর্যোগের পর বিদ্যালয়ে ফিরতে তাদের কী বাধার মুখোমুখি হতে হয়।এই স্থানীয় অভিজ্ঞতা অনেক সময় বড় পরিসরের পরিকল্পনার এমন কিছু দুর্বলতা দেখাতে পারে, যা কাগজের পরিসংখ্যানে সহজে ধরা পড়ে না।
তাই শিশুদের অংশগ্রহণকে শুধু সম্মেলন, বক্তৃতা কিংবা প্রতীকী কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এখন প্রয়োজন দাবির পরবর্তী ধাপ। খুলনার শিশুদের ১৩ দফা দাবি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে এর পর কী?প্রথম কাজ হতে পারে দাবিগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনায় ভাগ করা। কোন দাবি স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব? কোনটির জন্য জাতীয় বাজেট প্রয়োজন? কোনটির জন্য দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো বিনিয়োগ দরকার? কোনটির জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন প্রয়োজন? একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, বিদ্যালয়, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিশুদের নিয়ে একটি স্থায়ী পরামর্শব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে দুর্যোগের পর শিশুদের শিক্ষা, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার অবস্থা নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা হবে।এতে শিশুদের অংশগ্রহণও প্রতীকী থাকবে না, আবার নীতিনির্ধারণের দায়িত্বও শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুদের শুধু জলবায়ু সংকটের শিকার হিসেবে দেখা যাবে না।তারা বর্তমানেরও নাগরিক। আজ যে বাঁধ তৈরি হচ্ছে, তার নিরাপত্তা তারা ভোগ করবে। আজ যে বিদ্যালয় তৈরি হচ্ছে, সেখানে তারা পড়বে। আজ যে পানি ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তার ফল তাদের পরিবার বহন করবে। আজ যে জলবায়ু পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে, তার প্রভাব তাদের ভবিষ্যতের ওপর পড়বে।তাই খুলনার শিশুদের কণ্ঠ শুধু তাদের ভবিষ্যতের একটি সতর্কবার্তা নয়; এটি আমাদের বর্তমান নীতিরও একটি পরীক্ষা।
প্রশ্নটি এখন আর শুধু “আমরা কি শিশুদের কথা শুনেছি? প্রশ্ন হলো তাদের কথা থেকে আমরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছি? কারণ একটি শিশু যখন জলবায়ুর কথা বলে, তখন সে শুধু আগামী দিনের কথা বলে না। সে আজকের বাস্তবতার কথাও বলে। আর জলবায়ু সম্মেলনের প্রকৃত সাফল্য কতজন শিশু সেখানে কথা বলেছে, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। সাফল্য তখনই, যখন সেই শিশুদের কথার কিছু অংশ নীতি, বাজেট এবং বাস্তব কর্মসূচিতে জায়গা পায়। শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষার কথা বলার আগে তাই তাদের কণ্ঠকে আজকের সিদ্ধান্তের অংশ করা জরুরি।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ