খুলনা | মঙ্গলবার | ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

অস্তিত্ব সংকটে বন্যপ্রাণি জরুরি পদক্ষেপ নিন

|
১২:১৬ এ.এম | ০৬ অক্টোবর ২০২৬


নির্বিচারে বন উজাড়, অবাধে শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের কারণে একসময়ের পরিচিত পশুপাখি আজ আর দেখা যায় না। এরই মধ্যে বেশ কিছু প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, আর অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। অথচ ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তুসংস্থানের জন্য প্রতিটি প্রজাতির টিকে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দেড় দশকে ১৮টি প্রজাতির বন্য প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। এর আগের দশকে বিলুপ্ত হয়েছে ১৩টি। সব মিলিয়ে দেখা গেছে, গত ২৫ বছরে ৩১টি প্রজাতির বন্য প্রাণি বিলুপ্ত হয়েছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা প্রজাতির প্রাণি অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল বিশ্বব্যাপী পালিত হয়েছে ‘বিশ্ব প্রাণি দিবস’। এ বছর দিবসটির প্রতিবাদ্যও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ‘তাদের চোখে বিশ্ব দেখুন’। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) জরিপের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়, বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রাণির মধ্যে রয়েছে ১৯ প্রজাতির পাখি, ১১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী ও এক প্রজাতির সরীসৃপ।
এ তো গেল হারিয়ে যাওয়া প্রজাতির সংখ্যা। আর বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে আরো বেশি প্রজাতি ৯০টি। এ ছাড়া আমাদের ৩৯০ প্রজাতির বন্যপ্রাণি কোনো না কোনোভাবে বিপন্ন। এর মধ্যে ৫৬ প্রজাতি মহাবিপন্ন, ১৮১ প্রজাতি বিপন্ন এবং ১৫৩ প্রজাতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্য প্রাণী বিলুপ্তির পেছনে মানবসৃষ্ট কারণ সবচেয়ে বেশি দায়ী। প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে। মানুষ নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অন্য প্রাণির অস্তিত্ব হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ এ ধরনের অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ড খোদ মানুষকেই বিপদে ফেলছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক বন্যপ্রাণি ও প্রাণি গবেষক অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ যথার্থই বলেছেন, ‘মানুষের পৃথিবীতে টিকে থাকা এবং ভালো থাকার সঙ্গে অন্যান্য প্রাণির অস্তিত্বের গভীর সংযোগ রয়েছে। না হয় মানুষের অস্তিত্বও সংকটে পড়বে। বন্যপ্রাণি ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা এখন শুধু দরকারই নয়, বরং অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।’
খবরে বলা হয়, বর্তমান সরকার হাতি, বাঘসহ বন্যপ্রাণি সুরক্ষা ও সারা দেশে বন্যপ্রাণি নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে ওয়াইল্ডলাইফ কমিশন গঠন করেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে ১০ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া বন্যপ্রাণির বর্তমান পরিস্থিতি, বাসস্থান ও সংখ্যার পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে আবার প্রাণির ‘লাল তালিকা’ হালনাগাদ শুরু হয়েছে। আইইউসিএন বাংলাদেশ ও সরকার যৌথভাবে এ কাজ শুরু করেছে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো বিপন্ন সামুদ্রিক মাছের তালিকাও প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আমাদের তিক্ত বাস্তবতা হলো, বন্যপ্রাণি সুরক্ষায় দেশে আইন-কানুন রয়েছে, কিন্তু যথাযথ প্রয়োগ নেই। সংরক্ষিত বনও সংরক্ষিত থাকছে না। সা¤প্রতিক সময়ে জানা গেছে, কক্সবাজার ও বনাঞ্চলে একের পর এক সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। সংগত কারণে প্রশ্ন আসে, এসব উন্নয়ন নাকি পরিবেশ ধ্বংসের আয়োজন।
আমরা মনে করি, বন্যপ্রাণি রক্ষায় নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে বিলুপ্তির পথে যেসব প্রজাতি রয়েছে সেসব প্রাণি রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রাণি শিকার বন্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি এমন সচেতন সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বন্যপ্রাণির অস্তিত্বের গুরুত্ব প্রতিটি নাগরিক উপলব্ধি করেন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ