খুলনা | বুধবার | ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

রূপসায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ : স্কুলছাত্রীসহ চার জনের মৃত্যু

কৃষ্ণ গোপাল সেন, রূপসা |
০১:১৮ এ.এম | ০৭ অক্টোবর ২০২৬


খুলনা জেলার রূপসা উপজেলায় আশঙ্কাজনক হারে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যেই এক স্কুলছাত্রীসহ চারজনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। খুলনা জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে রূপসাতেই আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি। রূপসার পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে নৈহাটি ইউনিয়নে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বাধিক। ঘনবসতি, অধিক জনসংখ্যা এবং শ্রমিক অধ্যুষিত এ অঞ্চলে অসচেতনতার কারণে এলাকাটি এডিস মশার প্রধান হটস্পটে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে করোনার মতো রূপসায় এবার ডেঙ্গুও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে উপজেলার ঘাটভোগ ইউনিয়নের ধোপাখোলা গ্রামের যুবক দেব বিশ্বাস, খাজাডাঙ্গা গ্রামের স্কুলছাত্রী নাসিমা খাতুন এবং ভবানীপুর গ্রামের দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় বাড়িঘরের আশপাশে ফেলে রাখা পাত্র, ফুলের টব ও পরিত্যক্ত টায়ারে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার ডিম থেকে দ্রুত বংশবৃদ্ধি ঘটছে। এই মশার কামড়ে তীব্র জ্বর, প্রচন্ড মাথাব্যথা, গিঁটে গিঁটে ব্যথা, পেটে পানি জমা ও জটিল ক্ষেত্রে শরীর দিয়ে রক্ত পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকরা জানান, তীব্র জ্বর সাধারণত সাত দিনের মতো থাকলেও শরীর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে এবং ক্লান্তি দূর হতে ১৫ থেকে ২০ দিন বা তারও বেশি সময় লাগছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ, এমনকি চিকিৎসক ও নার্সরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার এবং জ্বর অনুভূত হলেই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবহেলিত রূপসার অধিকাংশ এলাকায় মশক নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় জনবল, ফগার মেশিন ও বাজেটের তীব্র সংকট রয়েছে। এডিস মশার কামড়ে একের পর এক মানুষ প্রাণ হারালেও মশক নিধনে কার্যকর উদ্যোগের বড়ই অভাব। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের চেয়ে অক্টোবর মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
হাসপাতাল পরিসংখ্যান সূত্রে জানা যায়, বছরের শুরু থেকেই রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি শুরু হয়। জানুয়ারি মাসে ৩ জন ও ফেব্র“য়ারি মাসে ২ জন রোগী ভর্তি হন। মার্চ ও এপ্রিল মাসে কোনো রোগী ভর্তি না থাকলেও মে মাসে ১০ জন, জুন মাসে ৪১ জন, জুলাই মাসে ৮১ জন, আগস্ট মাসে ২৫০ জন এবং সেপ্টেম্বর মাসে ২৫৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। চলতি বছর এ পর্যন্ত হাসপাতালে সর্বমোট ৬৩১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ৩৬৪ জন, নারী ২৫৯ জন এবং শিশু ৮ জন। পরিসংখ্যানে এবার পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি দেখা গেছে।
রোগীদের ডেঙ্গু শনাক্তে হাসপাতালে এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৬৪৯টি কিট দিয়ে বিনামূল্যে পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে মার্চে ১৪টি, এপ্রিলে ১২টি, মে মাসে ৭টি, জুলাইয়ে ১১৮টি, আগস্টে ৭১০টি এবং সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ ৭৮৮টি কিট ব্যবহার করা হয়। তবে জুন মাসে সরকারি কিট সরবরাহ ছিল না। বর্তমানে কিট সংকট থাকায় প্রতিদিন মাত্র ২০ থেকে ২৫ জন রোগীকে সরকারিভাবে বিনামূল্যে পরীক্ষা করানো সম্ভব হচ্ছে।
রূপসায় বেসরকারি সিএসএস রেভা আব্দুল মেমোরিয়াল হাসপাতালে সীমিত পরিসরে চিকিৎসা চললেও সরকারি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমটেবণক্সে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. খন্দকার এহসান হিমেল জানান, ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে তিন শিফট মিলিয়ে মোট ৪১ জন চিকিৎসকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে ১২ জন বিশেষজ্ঞের স্থলে কর্মরত আছেন মাত্র ৬ জন এবং ২৩ জন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে আছেন ১০ জন। এছাড়া ৩০ জন নার্সের মধ্যে কর্মরত ২৮ জন। বর্তমানে হাসপাতালে নিয়মিত ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৮০ থেকে ১০০ জনেরও বেশি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ডেঙ্গুর পাশাপাশি হাম-রুবেলা, টাইফয়েড, সাধারণ জ্বর, ডায়রিয়া, হিটস্ট্রোক ও নিউমোনিয়ার রোগীদেরও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর গড়িয়ে গেলেও তিন টাকার টিকিটে বহির্বিভাগে বিপুল রোগীর চিকিৎসা শেষে ভর্তি রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসকদের বাড়তি ডিউটিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মাজেদুল হক কাউসার বলেন, প্রতিদিন হাসপাতালে ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য আসেন। কিন্তু কিট স্বল্পতার কারণে মাত্র ২৫ জন এই সুযোগ পাচ্ছেন। বাকি ২৫ থেকে ৩০ জন রোগীকে বাধ্য হয়ে বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। সরকারিভাবে পর্যাপ্ত কিট সরবরাহ না থাকায় রোগীরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
চিকিৎসকরা জানান, ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে তিনটি পরীক্ষা জরুরি। এর মধ্যে সরকার এনএস-১ পরীক্ষা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিনামূল্যে করেছে, যা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ২৩৬টি সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া সরকার নির্ধারিত স্বল্পমূল্যে ৫০ টাকা ফি নিয়ে আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষা এ পর্যন্ত ৫৯০টি করা হয়েছে। তবে রক্তের সেল কাউন্ট পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সিবিসি পরীক্ষাটি হাসপাতালে কিট বা রি-এজেন্ট না থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে ৪ থেকে ৫ বার করাতে হচ্ছে। যেখানে সাধারণ জ্বরে নামমাত্র খরচে সুস্থ হওয়া যায়, সেখানে একজন ডেঙ্গু রোগীর পরীক্ষা ও ওষুধ বাবদ ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে, যা নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বড় বোঝা।
সচেতন মহলের মতে, মশক নিধনে চরম অবহেলা ও দীর্ঘসূত্রতা রূপসার পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর মশক নিধন অভিযান পরিচালনা এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দ্রুত পর্যাপ্ত ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও চিকিৎসক পদায়ন করা এখন সময়ের দাবি।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ