খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

নগরীতে দিনদুপুরে সাব-রেজিস্ট্রারকে অপহরণ, একঘন্টা পর ছেড়ে দেওয়া নিয়ে রহস্য, তদন্তে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক |
১২:০৪ এ.এম | ০৮ অক্টোবর ২০২৬


প্রকাশ্য দিবালোকে খুলনা সদর সাব রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মন্ডলকে অপহরণ ও প্রায় একঘণ্টা পর ফিরে আসা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে রহস্য। বুধবার দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে ৩-৪টি মোটরসাইকেলে করে আসা বেশ কয়েক জন যুবক প্রথমে তাকে রিকশায়, পরে মোটরসাইকেলে করে নগরীর কালীবাড়ি ঘাটের দিকে নিয়ে যায়। প্রায় ৪০ মিনিট পরে তাকে আবার রিকশায় করে কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু ফিরে এসে কারা তাকে নিয়ে গেছে-এ ব্যাপারে কোনো সদুত্তর দেননি তন্ময় মণ্ডল। তিনি পাইকগাছা উপজেলার লতা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা গোলক মন্ডলের ছেলে।
ঘটনাস্থলের সন্নিকটেই খুলনা সিটি কর্পোরেশন, জেলা পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং কেসিসি সুপার মার্কেট অবস্থিত। এমন জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকে সাব রেজিস্ট্রারের মতো একজন কর্মকর্তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ায় মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর আড়াইটার দিকে নগরীর কে ডি ঘোষ রোডে অবস্থিত সদর সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে কয়েকজন তাকে একটি মোটরসাইকেলের মাঝখানে বসিয়ে ভৈরব নদীর জেলখানা ঘাটের দিকে নিয়ে যায়। মুহূর্তেই ঘটনাটি জানাজানি হলে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর তিনি নিজ কার্যালয়ে ফিরে আসেন।
এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নে সদর সাব রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মন্ডল বলেন, ‘কারা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল, আমি তা বলতে পারছি না। তবে তারা সেখানে নিয়ে (ভৈরব নদীর কাছে) কিছু কাজ আছে বলে জানায়।
কারা তাকে নিয়ে গিয়েছিল এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি অফিস থেকে বেরুচ্ছিলাম, নিয়ে গেল বিষয়টি ওই রকম না। পরিচিত লোকজন, বলল একটু বাইরে যেতে হবে, বললাম অসুবিধা নেই। পরিচিত লোকজন যেহেতু তারা রিকশায় নিয়ে গিয়েছিল। কেসিসি মার্কেটে তাদের সঙ্গে পরিচয়, এই যা। তবে তাকে কেউ অপহরণ করেনি। তাদের দাবি বলতে কিছু ছিল না, দলিলের একটি পারপাজ। ঠিকঠাক করা যায় কি না। এই জাস্ট। ভাই, এটা তো আপনারা ওইখানেই (অফিসে) বলতে পারতেন।’
সাংবাদিকদের সদর সাব রেজিস্ট্রার আরও বলেন, ‘কয়েকজন যুবক কালীবাড়ি ঘাটের কাছে একটি দোকানে নিয়ে কিছু কাগজ সঠিক কিনা দেখতে দিয়েছে। কাজ শেষ তারাই রিকশায় তুলে দিয়েছে।’
খুলনা সদর দলিল লেখক সমিতির সভাপতি বাহাউদ্দিন খন্দকার বলেন, সাব রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মন্ডল প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে লাঞ্চ করেন। আজকেও (বুধবার) ঠিক দুইটার থেকে আড়াইটার মধ্যে লাঞ্চে যাচ্ছিলেন, গেটের সামনে গিয়ে তিনি রিকশায় উঠলেন। আমরা তখন পেছনে বসা। আমরা শুনলাম যে সাব রেজিস্ট্রার সাহেবকে কারা তুলে নিয়ে গেছে। আমরা দৌড়ায়ে আসলাম, এসে শুনি যে জেলা পরিষদ ও সাব রেজিস্ট্রার অফিসের মাঝখান দিয়ে যে রাস্তা সেই রাস্তা দিয়ে নিয়ে গেছে। তখন আমরা দলিল লেখক, নকল নবিশ এবং আমাদের সহকারী সবাই আমরা নদীর ঘাটে গেলাম, সেখানে তার খোঁজখবর পেলাম না। পথের মধ্যে এক মহিলাকে দেখলাম, সে বলল, এক লোককে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, সে জোরাজুরি করছে, তাকে ঠেকাতে গেলাম, আমারে ঠেলা মেরে ফেলে দিয়েছে, তখন আমরা বিভিন্ন সংস্থা ও থানায় ঘটনাটি জানিয়েছি।
এ ব্যাপারে খুলনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) লোকমান হোসেন বলেন, কারা এ ঘটনায় জড়িত, তা অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। তন্ময় মন্ডলের সঙ্গে পুলিশের কথা হয়েছে। তিনি এখনও ট্রমার মধ্যে থাকায় সঠিকভাবে কোনো তথ্য বা অভিযোগ দিতে পারেননি। তবে আমরা জানতে পেরেছি, ঘটনার সঙ্গে তিনজন ছিল, তাদের গ্রেফতারে চেষ্টা করছি।
পুলিশের ভাষ্য, কাগজপত্র দেখানোর কথা বলে তন্ময় কুমার মণ্ডলকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে খুলনা নিউমার্কেট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি রহস্যজনক হওয়ায় এর সঙ্গে কারা জড়িত এবং প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ঘটনার পর অফিসপাড়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। তদন্ত শেষে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর এড. মোমিনুল ইসলাম বলেন, মহানগরীর সবচেয়ে জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকে সাব রেজিস্ট্রারের মতো একজন কর্মকর্তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা না যায় তাহলে খুলনা মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ