খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

চলতি বছরে নয় মাসে নগরীসহ জেলাতে ৭২ খুন

সশস্ত্র বডিগার্ড, নিরাপত্তার জিডি : কোনো কিছুতেই প্রাণ বাঁচছে না খুলনায়

আল মাহমুদ প্রিন্স |
০১:১৩ এ.এম | ০৮ অক্টোবর ২০২৬


খুলনায় দিন দিন বেড়ে চলেছে ডাকাতি, হত্যা, চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। থানাগুলোতে বাড়ছে মামলার সংখ্যা। প্রায়ই ঘটছে হত্যাকাণ্ড। ফলে আতঙ্কে রয়েছে সাধারণ মানুষ। এক সময়ের শান্তির নগরী খুলনা এখন যেন মৃত্যুপুরিতে পরিণত হয়েছে। অপরাধীরা অস্ত্রসহ ধরা পড়লেও থেমে নেই তাদের তৎপরতা। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও উদ্বিগ্ন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে একের পর এক খুন করে যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের গডফাদাররা। 
অপরাধের স্বর্গরাজ্য খুলনা : চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত খুলনা মহানগর ও জেলায় অন্তত ৭২টি হত্যাকান্ড ঘটেছে। এসব ঘটনার বেশির ভাগই হয়েছে প্রকাশ্যে, গুলি ও কুপিয়ে সংঘটিত হয়েছে। এর কোনোটিরই বিচার হয়নি। পুলিশের দাবি, ২৫টির রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। 
মহানগরীতে ৩৮ হত্যাকাণ্ড : খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে এখন পর্যন্ত মহানগরীতে ৩৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। কারণ একাধিক হত্যার ঘটনায় একটি মামলা হওয়ায় মোট মামলার সংখ্যা ২৩টি। এসব মামলার মধ্যে পুলিশের হিসাবে ১৯টির রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছেন ৮১ জন। বাকিগুলোর তদন্ত চলছে। 
পুলিশ বলছে, রহস্য উদঘাটন হওয়া ১৯টি মামলার ১৭টি তদন্তাধীন এবং দু’টি বিচারাধীন। এগুলোর ১৪টিতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, নয়টি হত্যায় পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ, সাতটিতে মাদক ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্ব›দ্ব, দু’টিতে ইজিবাইক চুরি এবং একটি চোর সন্দেহে পিটুনির ঘটনা।
জেলায় ৩৫ হত্যাকান্ড : জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত নগরীতে ৩৫ জন খুন হয়েছে। এর মধ্যে গুলি করে ৯ জন, মাদক সংক্রান্ত ব্যাপারে কুপিয়ে ৩ জন, সামাজিক বিরোধ (জমিজমা) সংক্রান্ত ব্যাপারে ১৩ জন, রাজনৈতিক দ্ব›েদ্বর কারণে ২ জন, আজ্ঞাত (ডোবা নালা) ২ জন, শ্বাসরোধ করে ২ জন, এবং পারিবারিক বিরোধের কারণে ৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন  অভিযানে বিপুল সংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। 
হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে : সবমিলিয়ে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রূপসায় ছেলেকে হত্যার দেড় মাসের মাথায় বাবাকে হত্যার ঘটনাটি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ছেলে হত্যা মামলার আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিনে এসে বাবাকে হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। এর আগে লবণচরায় তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দু’টি হত্যার পেছনেও জামিনে বেরিয়ে আসা অপরাধীর সংযোগের কথা জানিয়েছে পুলিশ। 
আতঙ্কে চুপ ভুক্তভোগীরা : খুনের পর শুধু একটি পরিবার নয়, গোটা এলাকার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। এ কারণে খুনের শিকার পরিবারগুলোও নির্বিকার হয়ে চুপ থাকছে। তারা মামলা করারও সাহস হারিয়ে ফেলছে। প্রতিবেশী, প্রত্যক্ষদর্শী, সাধারণ মানুষও ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে নীরবতা পালন করছে। 
তবে পুলিশ বলছে, ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষকে মুখ খুলতে হবে, তথ্য দিতে হবে। কিন্তু যে মানুষটি তথ্য দেবেন, তার নিরাপত্তা কে নিশ্চিত হবে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারছে না পুলিশ। যার প্রমাণ আক্তার ঢালী। ছেলেকে হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে হুমকি দেওয়ার পর জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় ১৫ দিন আগে জিডি করলেও তাকে বাঁচাতে পারেনি পুলিশ; এমনকি তার পরিবারকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি। 
সবশেষ বুধবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে নগরীর দৌলতপুরে বিএল কলেজ দ্বিতীয় গেট এলাকায় দুর্বৃত্তের গুলিতে মহিদুল ইসলাম (২৫) নামের এক যুবক আহত হয়েছেন। আহত যুবক গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার বনগাঁ গ্রামের শওকত খাঁর ছেলে।
রূপসায় নিহত আক্তার ঢালী মৃত্যুর পূর্বে জিডিতে যা লিখেছিলেন: ছেলে জয় ঢালীকে খুন করার পর ওই ঘটনায় বাদী হয়ে ১৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছিলেন মা নাসিমা বেগম। এরপর থেকেই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মুনজিল শেখ, মুরাদ শেখ, মাসুদ মোল­া ও রোপা মোল্যা মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন।
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের পাশাপাশি রূপসা পুলিশের সহযোগিতাও চেয়েছিলেন আক্তার ঢালী ও নাসিমা বেগম। কিন্তু আশ্বাস ছাড়া কিছুই পাননি তারা। এরপর করা হয় জিডি।
জিডিতে আক্তার ঢালী লিখেছেন, এর আগে একই আসামিরা আমার ছেলে জয় ঢালীকে দুর্জনীমহলের শহীদের মোড়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিলো। ওই মামলার আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিনে এলাকায় এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আমিসহ আমার পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। জানমালের ক্ষতি করবে বলে হুমকি দিতাছে। আসামিদের এমন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে আমি ও আমার পরিবারবর্গ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেছি বিধায় আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণসহ আমার জীবনের নিরাপত্তার জন্য জিডি করছি।
রূপসা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আনোয়ার জাহিদ নিহত আক্তার ঢালীর জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে তার নিরাপত্তা চাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান।  তিনি বলেন, কী কারণে, কারা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সূত্রে জানা যায়, পুলিশের অভিযানে তালিকাভুক্ত অনেক সন্ত্রাসী গ্রেফতার হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন ধরনের মামলা রয়েছে। এর মধ্যে অনেকে জামিনে ছাড়াও পেয়েছেন। কয়েকজন জেল থেকে বের হওয়ার পর আবারও অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েছেন। দুর্বৃত্তদের অবাধ বিচরণ, হত্যা, নৃশংসতার ঘটনায় নিরাপদে নেই সাধারণ মানুষ। 
প্রাপ্ততথ্য মতে, সবশেষ সোমবার ছেলেকে হত্যার ৫১ দিন পর পিতা আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গত ৫ অক্টোবর  সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রূপসা উপজেলার দুর্জনীমহল শহীদের মোড় ঢালী বাড়িতে এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে।
গত ২০ আগস্ট দুপুর পৌনে ১টার দিকে বটিয়াঘাটা বাজার সংলগ্ন কাজিবাছা নদী থেকে অজ্ঞাত এক যুবতীর ভাসমান লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একইদিন রাতে দিঘলিয়া উপজেলায় বিদ্যালয় ছুটির প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর স্কুলের বাথরুম থেকে হাত-পা ও মুখ বাঁধা অবস্থায় এক ছাত্রীকে উদ্ধার করা হয়। উপজেলার গাজীরহাট হাজী নঈম উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। উদ্ধার হওয়া ছাত্রী ওই বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ে।
এর আগের দিন ১৯ আগস্ট নগরীর লবণচরা এলাকায় জোড়া খুন হয়েছে। আশিবিঘা এলাকায় মাত্র দু’ঘণ্টার ব্যবধানে গুলিতে দুই তরুণ নিহত হয়। ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) নামের এক তরুণকে গুলি ও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে একই এলাকায় নাজমুল (১৮) নামের আরেক তরুণের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। 
এরআগে ১৮ আগস্ট রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে রূপসা উপজেলার নৈহাটী ইউনিয়নের আলো ফুটবে প্রতিবন্ধী স্কুলের অদূরে মামুন মীর (৩৫) নামের এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। সংকটজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ৩৫ দিন পর তার মৃত্যু হয়। 
একই রাতে নগরীর রায়েরমহল এলাকায় শিশু অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে গণপিটুনিতে রাজু (২৬) নামের এক যুবক নিহত হন। ১৫ আগস্ট জয় ঢালী (২৭) নামের এক যুবককে নৃশংসভাবে গলাকেটে ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রূপসার আইচগাতী এলাকায় রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঘটনাটি ঘটে। নিহত জয় ঢালী দুর্জনীমহল গ্রামের বাসিন্দা আক্তার ঢালীর ছেলে। গত ১১ আগস্ট রূপসার নৈহাটী ইউনিয়নের ফখরুল শেখ (৩২) নামের এক যুবককে ইটভাটায় গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রাত আনুমানিক ১টার দিকে নৈহাটী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কিসমত খুলনায় মেসার্স রূপসা ব্রিকস নামক ইটভাটার অফিসের সামনে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ফখরুল শেখ নৈহাটি ইউনিয়নের ৭নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মমিন উদ্দিনের ছেলে। 
এদিকে গেল সেপ্টেম্বর মাসে খুলনায় বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব হত্যাণ্ডের মধ্যে রয়েছে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৫টার দিকে রূপসা উপজেলার ইলাইপুর গ্রামের মোমিনবাগ এলাকায় বিপ্লব পালের মৎস্য ঘের থেকে বাপ্পি (৩৫) ওরফে কলম বাপ্পি নামে যুবকের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত বাপ্পি উপজেলার আলাইপুর গ্রামের আকবর শেখের ছেলে। 
দিঘলিয়ায় বাড়ির সামনে চা খেতে বেরিয়ে গুলিতে নিহত হয়েছেন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম (৪৫)। তিনি উপজেলার ফরমাইশখানা এলাকার মৃত আব্দুল গফুরের ছেলে। গত ৪ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফরমাইশখানা এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে ঘটনা ঘটে। 
সর্বশেষ, গত ৭ অক্টোবর ভোর সাড়ে ৬টার দিকে নগরীর দৌলতপুর থানার ব্রজলাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএল) কলেজের দ্বিতীয় গেট এলাকায় মহিদুল ইসলাম নামের এক যুবক দুর্বৃত্তরা গুলি করে পালিয়ে যায়। আহত যুবক গোপালগঞ্জ জেলার মোকছেদপুর উপজেলার বনগাঁ গ্রামের শওকত খাঁ’র ছেলে। এছাড়া আরো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। 
সচেতন মহল বলছেন, খুলনা শহরে এখন শুধু খুন নয়, আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড নগরসহ জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে বাড়িয়ে দিয়েছে আতঙ্ক। কোনো একসময় শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে যাদের নাম উঠে এসেছিল, তারাই এখন আন্ডারওয়াল্ডের গডফাদার। তাদের অনুসারীরা এখনো নিয়ন্ত্রণ করছে। 
অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ মতে, ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে খুলনায় তা অপরাধীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন এলাকার পুরোনো সন্ত্রাসী ও মাদক বিক্রেতারা ফের সক্রিয় হয়েছে। এছাড়া পারিবারিক কলহ, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ ও পূর্বশত্র“তার কারণেও খুলনায় হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। যেসব এলাকায় নিম্ন আয়ের ও ভাসমান মানুষের বসবাস বেশি, সেখানেও অপরাধের ঘটনা বেশি। চলতি বছরে কেএমপি’র আট মাসে হত্যা মামলার পরিসংখ্যানের নথিতে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে মাদক ও আধিপত্য বিস্তার, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণ, ইজিবাইক চুরি এবং চোর সন্দেহে গণপিটুনির কথা উলে­খ করা হয়েছে। 
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বললে তারা বলেন, খুলনায় স¤প্রতি বেশির ভাগ খুনের ঘটনা ঘটছে মাদক ব্যবসা ও আধিপত্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আগের সিন্ডিকেট ভেঙে যাওয়ায় বিভিন্ন গ্র“পের মধ্যে যুদ্ধ বেড়েছে। খুলনাসহ সারাদেশে খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। এর মূল কারণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা। এর সাথে যোগ হয়েছে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে সংঘবদ্ধ অপরাধীদের তৎপরতা।
আইনশৃঙ্খলার অবনতির ফলে খুলনায় প্রায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে। এ নিয়ে সবার মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। জামিনে মুক্তি পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীরা। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটছে। ক্রমেই বাড়ছে খুনের ঘটনা। বাড়ছে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কমে যাওয়ার কারণে সন্ত্রাসীরা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। অপরাধ দমনে বিভিন্ন থানা পুলিশের মনোযোগেও ভাটা পড়েছে।
সচেতন মহলের মন্তব্য, চলমান সংকট উত্তরণের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও কঠোর হতে হবে। নিজ নিজ এলাকায় পুলিশি টহল বৃদ্ধি করতে হবে। অপরাধীদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরও বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে। এমনভাবে চার্জশিট উপস্থাপন করতে হবে, যাতে আসামি কোনোভাবে ছাড় না পায়। 
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করে চিরুনি অভিযানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এছাড়া নিষ্ক্রিয় পুলিশ কর্মকর্তাদের সরিয়ে যোগ্যদের দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে সামনের দিনগুলোতে সহিংসতা আরও বেড়ে যাবে। মাদক কার্যক্রম দমনে সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহŸান জানান তিনি। 
কেএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ক্রাইম এন্ড অপারেশন (ভারপ্রাপ্ত) এমএম শাকিলুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক টিম কাজ করছে। তবে সাধারণ জনগণকে সচেতনতার পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে হবে। তাহলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কমে আসবে। তিনি আরো বলেন, সন্ত্রাসী যেই হোক না কেন তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।  
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে প্রেসব্রিফিং-এ বলেন, ইতোমধ্যে খুলনা জেলায় স্পেশাল অপারেশন শুরু হয়েছে। স¤প্রতি রূপসা উপজেলায় জয় ঢালী ও তার পিতা আক্তার ঢালী এবং দিঘলিয়া উপজেলায় নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম হত্যাকাণ্ডে তদন্তের পাশাাপাশি প্রতিটি থানায় বিশেষ করে রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা এ চারটি থানাকে প্রকাশ করেই স্পেশাল অপারেশন চালানো হচ্ছে। গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টায় পুলিশ সুপারের সম্মেলন কক্ষে আয়েজিত প্রেসব্রিফিংয়ে-এ তথ্য জানানো হয়।
এসআরবি-৬-এর কমান্ডিং অফিসার নিস্তার আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সন্ত্রাসী গ্র“পের অনলাইন তৎপরতা ও হুমকি প্রদর্শনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইনটেলিজেন্স উইং নজরদারি জোরদার করেছে। সোনাডাঙ্গাসহ নগরীতে স¤প্রতি ঘটে যাওয়া একাধিক হত্যাকাণ্ডের আসামিদের সনাক্ত ও গ্রেফতারে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।  
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মোহাম্মদ সামিউল হক বলেন, খুলনা শহরে খুন যেন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সা¤প্রতিক সময়ে বেড়ে গেছে বিভৎস, বিকৃত ও রোমহর্ষক খুনের ঘটনা। এক সময়ের শান্তির নগরী বলে খ্যাত খুলনা এখন রূপ নিয়েছে মৃত্যুপুরীতে। হত্যাকাণ্ড এখন নিয়মিু ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
কেন বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা, এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক সামিউল হক বলেন, নৈতিক অবক্ষয়, কিশোর গ্যাং, স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই, মাদক ও পরকীয়া, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিরোধ, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক শত্র“তা। সবকিছু মিলে হত্যার ঘটনা ঘটছে। তিনি আরো বলেন, বিগত দিনে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলোর সঠিক বিচার হলে এবং অপরাধীরা উপযুক্ত শাস্তি পেলে অপরাধের মাত্রা কমে আসবে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অপরাধীদের ধরতে আরও তৎপর হতে হবে। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ