খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রেস ব্রিফিংয়ে জানালেন পুলিশ সুপার : খুলনা জেলায় পুলিশের ‘স্পেশাল ড্রাইভ’ প্রথম দিনেই গ্রেফতার ৯৫

রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা থানা সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:১৬ এ.এম | ০৮ অক্টোবর ২০২৬


সা¤প্রতিক সময়ে সংঘটিত কয়েকটি অপরাধ, বিশেষ করে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে খুলনায় বিশেষ অভিযান (স্পেশাল ড্রাইভ) শুরু করেছে জেলা পুলিশ।  প্রথম দিনেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হওয়া অভিযানে বুধবার বিকেল পর্যন্ত ৯৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারদের বড় একটি অংশ অনলাইন জুয়া ও মাদকের সঙ্গে জড়িত। পুলিশের অভিযানের তথ্য অপরাধীদের কাছে পাচারকারী কয়েকজন ওয়াচারকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।  বুধবার খুলনা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে চান তিনি। অপরাধীদের উদ্দেশ্যে তার বার্তা, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ে এলাকায় কোনো কাজ করা যাবে না।
তিনি বলেন, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে লাভের ভাগাভাগি ও স্বার্থের দ্ব›দ্ব থেকেই হত্যাকাণ্ডের একটি অংশ ঘটছে। একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারও হত্যাকাণ্ড বাড়াচ্ছে। এ কারণে বিশেষ অভিযানে মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মাদক, অবৈধ অস্ত্র, সন্ত্রাস ও অন্যান্য অপরাধ দমনে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে জেলা পুলিশ। এরই ধারাবাহিকতায় সা¤প্রতিক সময়ে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনা, বিশেষ করে টার্গেট কিলিংয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা আরও সুসংহত করতে বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়েছে। 
খুলনা জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ৬ অক্টোবর রাত থেকে এ বিশেষ অভিযান শুরু করে। অভিযানে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী, দুষ্কৃতকারী ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং আদালতের পরোয়ানা তামিলসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার নিজেই স্বীকার করেছেন, ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়মিত অভিযান চললেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তার ভাষায়, আগের অভিযান যথেষ্ট তীব্র ছিল না। এবার কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করার পরও রূপসায় এক ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এ ঘটনায় সেনসিটিভিটি যথাযথভাবে মোকাবিলা করা যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে যাদের নাম এসেছে, তাদের দ্রুত গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। শুধু পুলিশি অভিযান নয়, ভাড়াটিয়া শনাক্তকরণ ও সিসিটিভি ব্যবস্থার ঘাটতিও উঠে এসেছে সংবাদ সম্মেলনে।
পুলিশের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে বাসাবাড়ির ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংরক্ষণে বড় ধরনের গ্যাপ তৈরি হয়েছে। ফলে পাশের বাড়িতে কে থাকছে, সে তথ্যও অনেক সময় পুলিশ পাচ্ছে না। হটস্পটগুলোতে সিসিটিভি স্থাপনে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার জানান, এবার চেকিং ও দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি ২৪/৭ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। মাদক স্পট, সন্ত্রাসীদের সম্ভাব্য আস্তানা ও চাঁদাবাজদের এলাকায় অভিযান চলবে।
পুলিশ সুপার বলেন, আগের একক প্রচেষ্টায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় এবার কেএমপি, জেলা পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে সমন্বিত অভিযান চালানো হচ্ছে। 
দুর্গাপূজা নির্বিঘœ করা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনাও এ অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য। রাজনৈতিক কোনো অনুরোধে অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
এদিকে অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি সচেতন নাগরিক, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছে খুলনা জেলা পুলিশ।
পুলিশের তথ্যমতে, স্পেশাল ড্রাইভের প্রথম দিনেই জেলার বিভিন্ন ইউনিটের অভিযানে মোট ৯৫ জনকে আটক ও গ্রেফতার করা হয়েছে। আটক ও গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা জেলায় চলতি বছরে ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৫টি মামলার রহস্য উদ্ঘাটন হলেও ১০টি এখনও অনুদ্ঘাটিত। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি রূপসা উপজেলায়। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে ১২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সর্বশেষ দুই টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এমন বাস্তবতায় এবার ডাবল ডোজ অভিযানে নামার ঘোষণা দিয়েছে জেলা পুলিশ।  রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা এই চার থানাকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ধরে ২৪ ঘণ্টা অভিযান, চেকপোস্ট ও ব্লক রেইড চালানো হচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, চলতি বছরের ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে গুলি করে টার্গেট কিলিং হয়েছে ৯টি। মাদককে কেন্দ্র করে হত্যা তিনটি, সামাজিক দ্ব›দ্ব বা মারামারিতে ১৩টি, রাজনৈতিক গ্র“পিংয়ে দু’টি, অজ্ঞাত কারণে দু’টি, শ্বাসরোধে দু’টি নবজাতক হত্যা এবং পারিবারিক বা পরকীয়া জনিত কারণে আরও চারটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। গুলি করে হত্যার ঘটনাগুলোর পেছনেও মূলত মাদককেন্দ্রিক বিরোধ রয়েছে বলে পুলিশের বিশ্লেষণ।
সূত্র জানায় রূপসাকে অপরাধের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করার পেছনে ভৌগোলিক ও জনবসতিগত কারণও দেখছে পুলিশ। শহরের কাছাকাছি হলেও রূপসা নদী দিয়ে খুলনা শহর থেকে বিচ্ছিন্ন এ অঞ্চল। অপরাধ করে নদীপথে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ঘনবসতি, অসংখ্য সরু গলি ও শাখা-প্রশাখা সড়ক অপরাধীদের আত্মগোপন ও দ্রুত স্থান পরিবর্তনে সহায়তা করছে। এই অবস্থাকে সামনে রেখে মঙ্গলবার রাত থেকে চার থানায় বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। নড়াইল ও যশোরসহ অন্য জেলা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এনে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। প্রথম দিনেই প্রায় ১০০ জনকে গ্রেফতার এবং প্রায় ২৫০ পিস ইয়াবা ও এক কেজি গাঁজা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।  গ্রেফতারদের বড় একটি অংশ অনলাইন জুয়া ও মাদকের সঙ্গে জড়িত। পুলিশের চলাচলের তথ্য অপরাধীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া কয়েকজন ওয়াচারকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ