খুলনা | শনিবার | ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মা-বাবা

যশোরে দাদার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত শিক্ষার্থী তাজমিন

নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর |
০১:২৩ এ.এম | ১০ অক্টোবর ২০২৬


কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মরদেহ যশোরে দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ তার মা-বাবা ও স্বজনেরা। এদিকে কুমিল্লায় চাঞ্চল্যকর জান্নাতুল তাজমীন (১৩) হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। 
শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস। একইদিন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর অলংকার শিল্প এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। 
সুমন মিয়া (৩৮) চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার বাসিন্দা। তিনি কুমিল্লার বাগমারা দক্ষিণের জয়নগর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। প্রায় এক মাস আগে সেখান থেকে চলে যান সুমন। তিনি মাদকাসক্ত ও বখাটে প্রকৃতির লোক বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তাজমিনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রিয়জনের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তার মা-বাবা ও স্থানীয়রা।
তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা শহরে থাকত সে। সেখানে স্থানীয় ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ায় তাজমিনের বাড়িতে শোকাহত স্বজনদের ভিড় দেখা যায়। মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ তার মা কেয়া খাতুন। সাংবাদিকেরা স্বজনদের ছবি তুলতে গেলে ক্ষোভ ও কষ্ট প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘কী হবে এসব ছবি তুলে! আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে; এখন আর কিছু বলব না।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে এবং তাকে সেখান থেকে নিয়ে যেতে বলেছিল। মেয়ের কাছে বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও সে কিছু জানায়নি বলে দাবি করেন কেয়া খাতুন।
তাজমিনের মা ওই বান্ধবীর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তার দাবি, ওই বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে পুলিশের তদন্তে কী তথ্য পাওয়া গেছে, তা এখনো জানা যায়নি।
তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম কুমিল্লা শহরে একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে তিনি শোকে স্তব্ধ। তিনি জানান, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। এরপর বিভিন্ন সময়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীর বাসায় আছে বলে জানিয়েছিল।
আবদুল আলীম বলেন, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে মেয়ের কাছ থেকে একটি খুদে বার্তা ও লাইভ লোকেশন পান। বার্তায় তাকে এসে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। তখন ঘুমিয়ে থাকায় তিনি বার্তাটি দেখতে পারেননি। সকালে ঘুম থেকে উঠে বার্তাটি দেখেন। পরে লাইভ লোকেশন অনুসরণ করে মেয়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে তার মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান তিনি।
আবদুল আলীম বলেন, তিনি এখন কাউকে নিয়ে অনুমানভিত্তিক অভিযোগ করতে চান না। মেয়ের সঙ্গে কী ঘটেছিল, কারা তাকে হত্যা করেছে এবং ঘটনার পেছনে কী রহস্য রয়েছে, তা জানতে চান। জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয়রা জানান, তাজমিনের কোনো ভাই-বোন ছিল না। সে মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। বিভিন্ন ছুটিতে মা-বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসত। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারটি ভেঙে পড়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে কী ঘটেছিল? : পুলিশের অনুসন্ধান অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল তাজমিন। একপর্যায়ে সে কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারে যায়। বুধবার দুপুরের পর কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় সে।
পুলিশ জানায়, বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে তাজমিন। এরপর কীভাবে সে লালমাইয়ের জগতপুর এলাকার ধানক্ষেতে পৌঁছায়, তা তদন্ত করা হচ্ছে।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, নূরজাহান হোটেল থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির বিষয়েও তদন্ত চলছে। অটোরিকশাটি শনাক্ত করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে সুমন আত্মগোপনে ছিলেন। তাকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেই এবং তিনি মোবাইলও ব্যবহার করেন না। তাই তার অবস্থান শনাক্ত করতে সময় লাগছে।
ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন, আটক অটোরিকশা চালক : কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুজ্জামান জানান, তাজমিনের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব আলামত থেকে কিশোরীটি প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করে থাকতে পারে বলে ধারণা পুলিশের।এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম নগরী থেকে সুমন নামে এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তাজমিন কীভাবে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফিরল, পদুয়ার বাজার থেকে লালমাইয়ের ঘটনাস্থলে কীভাবে পৌঁছাল এবং হত্যাকান্ডে কারা জড়িত; এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী দল।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ