খুলনা | শনিবার | ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ইউরোপে পাঠানোর নামে কোটি টাকা আত্মসাৎ

মানবপাচারকারী দম্পতির ফাঁদে দিশেহারা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্ধশত যুবক

এন আই রকি |
০১:২৫ এ.এম | ১০ অক্টোবর ২০২৬


ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার অর্ধশতাধিক যুবকের প্রায় দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে চম্পট দিয়েছে এক প্রতারক দম্পতি। ‘জিসান ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরিজম’-এর নামে অফিস খুলে পাতা এই প্রতারণার জালে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগীরা। এ ঘটনায় আদালত ও থানায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীর তেঁতুলতলা মোড়ে ডাচ-বাংলা ব্যাংক ভবনের উপরের একটি অংশ ভাড়া নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন ফেনীর দাগনভূঞার নূর মোহাম্মদের ছেলে মোহাম্মদ ফিরোজ রাশেদ ওরফে জিসান। তাঁর সাথে প্রধান সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিলেন স্ত্রী শিলা খানম। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী জিসান হলেও আর্থিক লেনদেনের মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল শিলার হাতে। বিশ্বাস অর্জনে ভুক্তভোগীদের সাথে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্র সম্পাদন, ভুয়া ভিসা প্রদর্শন, এমনকি ঢাকায় নিয়ে কথিত ট্রেইনিংয়ের নাটকও সাজাত এই চক্র।
নগরীর নতুন রাস্তা এলাকার বাসিন্দা ও পেশায় প্রাইভেটকার চালক আরমান জানান, “খুব কম সময়ে সার্বিয়া পাঠানোর চুক্তিতে জিসানের স্ত্রী শিলা নতুন রাস্তা মোড়ে এসে আমাদের কাছ থেকে নগদ টাকা নিয়ে যান। পরবর্তীতে আমাদের হাতে যে ভিসা ও ম্যানপাওয়ারের কাগজপত্র তুলে দেওয়া হয়, তা পুরোটাই ভুয়া ও জাল প্রমাণিত হয়।”
অন্যতম ভুক্তভোগী হাসানুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা কয়েকজন মিলে প্রায় ১৪ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। আমাদের সার্বিয়ার জাল ভিসা ও এয়ার টিকিট দেওয়া হয়। গত ৮ আগস্ট আমাদের ফ্লাইট থাকার কথা থাকলেও তার আগের দিনই তারা অফিস বন্ধ করে পালিয়ে যায়। পরে ঢাকায় গিয়ে জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে খুলনা ফিরে আসি। এসে শুনি, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের প্রায় ৫০ জন যুবকের কোটি কোটি টাকা নিয়ে কেটে পড়েছে এই দম্পতি।”
শেখপাড়ার বাসিন্দা কুমকুম বেগম জানান, “আমার বাসার পাশেই ওদের অফিস ছিল। বিশ্বাস করে স্বামীকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে ডেনমার্ক পাঠানোর চুক্তি করি। কিছু টাকা দেওয়ার পর তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।”
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, জিসানের বিরুদ্ধে আগে থেকেই পাঁচটি গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলার চোখ ফাঁকি দিয়ে জিসান ইতিমধ্যে ভারতে পালিয়ে গেছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, তাঁর স্ত্রী শিলা খানম গত ৭ আগস্ট অবৈধ পথে ভারতে পালানোর সময় চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সীমান্তে আটক হন। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে জীবননগর থানায় পৃথক মামলা রয়েছে।
আরো জানা যায়, জিসান-শিলা দম্পতি এই অঞ্চলের যুবকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে তারা চুয়াডাঙ্গা জেলার একটি বর্ডার থেকে ভারতের যাওয়ার চেষ্টা করে। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে জিসান দালালদের মাধ্যমে ভারতের পালিয়ে যায়। কিন্তু তার স্ত্রী শিলা যেতে পারেনি। 
এদিকে কয়েকজন ভুক্তভোগী তাদের টাকা উঠানোর জন্য সরকারি বিএল কলেজ ছাত্রদলের একনেতা, দৌলতপুর থানার সাবেক একজন পুলিশ কর্মকর্তা, এবং খুলনা রেলের একজন পুলিশের সহযোগিতায় শিলার নিকট থেকে কিছু টাকা উদ্ধার করে। শিলা বাকি টাকা ভুক্তভোগীদের দেয়ার প্রতিশ্র“তি দিয়ে ফের আত্মগোপনে চলে যায়। একাধিকবার জিসান ও শিলার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
খুলনা জজ কোর্টের আইনজীবী এড. মোঃ মনিরুল ইসলাম পান্না জানান, “বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নালিশি আমলী আদালতে জিসান ও শিলার বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করা হয়েছিল। আদালত আবেদনটি এজাহার হিসেবে রজু করার জন্য সোনাডাঙ্গা মডেল থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন।”
সোনাডাঙ্গা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ রফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আদালতের নির্দেশে জিসান ট্রাভেলসের মালিক দম্পতির বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতার ও খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধারে পুলিশি তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ