খুলনা | রবিবার | ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

হারিয়ে যাচ্ছে কি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার বলয়?

জয়া মাহবুব |
১২:৩৯ এ.এম | ১১ অক্টোবর ২০২৬


কখনো কখনো একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক হয়ে থাকে না। সেটি আমাদের চারপাশের সমাজকে নিয়ে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে এনে দেয়। কুমিল্লার ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনাটি তেমনই একটি প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। অপরাধের দায় যার, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু অপ্রতিমের মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে আমার মনে আরেকটি প্রশ্ন আসে, হারিয়ে যাচ্ছে কি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার বলয়? নিরাপত্তা কি শুধু বাবা-মায়ের দায়িত্ব? একজন মা তার সন্তানকে যতই সতর্ক করুন, তিনি তো প্রতিটি রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন না। একজন বাবা সন্তানকে বিপদ চিনতে শেখাতে পারেন, কিন্তু সন্তানের চারপাশের প্রতিটি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।
শিশু যখন বাড়ির বাইরে যায়, তখন তার নিরাপত্তার একটি অংশ অদৃশ্যভাবে নির্ভর করে সেই সমাজের ওপর, যার মধ্য দিয়ে সে চলাচল করে। পাশের দোকানদার তাকে চেনে কি না। প্রতিবেশী তাকে দেখলে খেয়াল করেন কি না।
স্কুলের শিক্ষক জানেন কি না সে কার সঙ্গে মিশছে। স্থানীয় মানুষজন কোনো অস্বাভাবিক আচরণ দেখলে সেটি গুরুত্ব দেন কি না। অর্থাৎ, একটি শিশুর চারপাশে নিরাপত্তার একটি সামাজিক বলয় থাকার কথা।
প্রশ্ন হলো, সেই বলয় কি আগের মতো শক্ত আছে?
শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে, ঝুঁকি সাধারণত একটি মাত্র কারণে তৈরি হয় না।
যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি-এর যুব সহিংসতা বিষয়ক গবেষণা-ভিত্তিক কাঠামোতে ব্যক্তি, পরিবার, সম্পর্ক, স্কুল, কমিউনিটি এবং বৃহত্তর সমাজ,সব স্তরের ঝুঁকি ও সুরক্ষামূলক বিষয় বিবেচনা করা হয়। একই গবেষণায় দেখা যায়, পরিবার বা পরিবারের বাইরের দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে দৃঢ় সংযোগ, বাবা-মায়ের সঙ্গে সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারা এবং স্কুলে ইতিবাচক সম্পর্ক কিশোরদের জন্য সুরক্ষামূলক ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ, একটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু নজরদারির বিষয় নয়। সংযোগও নিরাপত্তা। একজন শিশু যদি জানে, বিপদে পড়লে কার কাছে যাবে, কার সঙ্গে কথা বলবে এবং কে তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনবে, তাহলে তার চারপাশে একটি অদৃশ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি হয়। এই জায়গাটিই হয়তো আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। তবে আগের দিনের সমাজকে নিখুঁত করে দেখার কোনো কারণ নেই। তখনও অপরাধ ছিল, ঝুঁকি ছিল, শিশু নির্যাতন ছিল। তবু একটি বিষয় ছিল, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ একে অন্যকে চিনতো। একটি শিশু কার সন্তান, কোন বাড়িতে থাকে, কোন স্কুলে পড়ে, এসব তথ্য অনেকের জানা থাকতো। এখন শহুরে জীবনে আমরা একই ভবনে থাকি, কিন্তু একে অন্যকে চিনি না। পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে জানি না। আমাদের সন্তানের সঙ্গে কারা মিশছে, সবসময় জানি না। আমাদের সন্তানের বন্ধুর বড় ভাই কে, সে কোথায় যায়, কী করে, এসবও অনেক সময় আমাদের অজানা থেকে যায়।
এটি শুধু সামাজিক পরিবর্তন নয়; এটি নিরাপত্তার কাঠামোকেও বদলে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবার থেকে কমিউনিটি এবং বৃহত্তর সামাজিক পরিবেশ পর্যন্ত একাধিক স্তরে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ, শিশুর সুরক্ষা কোনো একক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয়।
অপ্রতিমের ঘটনাটি আমাদের আরেকটি বিষয় ভাবায়, প্রথম দিকে ঘটনাটি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পরে তদন্তে অপ্রতিমের সঙ্গে তার চেয়ে বয়সে বড় কয়েকজনের যোগাযোগ, কথিত বন্ধুত্ব বিষয়ও সামনে এসেছে বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তদন্তকারীরা এই সম্পর্ককে ‘অসম বন্ধুত্ব ’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। এই তথ্যগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। শিশুর নিরাপত্তা শুধু অপরিচিত মানুষ থেকে তাকে দূরে রাখার বিষয় নয়।
আমাদের পরিচিত মানুষদের সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি। শিশু কার সঙ্গে মিশছে, কার কথায় কোথাও যাচ্ছে, কে তাকে প্রভাবিত করছে, এসব নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে এমন সম্পর্ক থাকা দরকার, যেখানে শিশু ভয় না পেয়ে সত্যি কথা বলতে পারে। কারণ অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কখনো কখনো শিশুকে আরও গোপনীয় করে তুলতে পারে। নিরাপত্তার জন্য তাই শুধু নজরদারি নয়, প্রয়োজন বিশ্বাসের সম্পর্ক।
একটি শিশুকে রক্ষা করার জন্য আমাদের হয়তো আরও বেশি সিসিটিভি  দরকার, আরও কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা দরকার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি দরকার। কিন্তু এর পাশাপাশি দরকার মানুষ। এমন শিক্ষক, যিনি বুঝতে পারবেন কোনো শিশু হঠাৎ বদলে গেছে। এমন বাবা-মা, যাঁদের সঙ্গে সন্তান নিজের অস্বস্তির কথা বলতে পারে।
এমন প্রতিবেশী, যিনি কোনো শিশুকে বিপদে দেখলে ‘এটা আমার বিষয় নয়’ বলে পাশ কাটিয়ে যাবেন না। এমন কমিউনিটি, যেখানে অস্বাভাবিক কিছু দেখলে মানুষ প্রশ্ন করতে দ্বিধা করবে না। এবং এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে একটি শিশু নিখোঁজ হলে দ্রুত ও সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ নিরাপত্তা কেবল প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হয় না। নিরাপত্তা তৈরি হয় সম্পর্ক দিয়ে।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর হয়তো অনেক বাবা-মা সন্তানকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করবেন। কোথায় যাবে, কার সঙ্গে যাবে, কখন ফিরবে, সবকিছু আরও কঠোরভাবে নির্ধারণ করবেন। তাদের ভয়কে অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমরা যদি প্রতিটি ট্র্যাজেডি’র পর শিশুদের স্বাধীনতা কমিয়ে দিই, অথচ সমাজের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন না তুলি, তাহলে আমরা সমস্যার বোঝা শিশুর ওপরই চাপিয়ে দিই। একটি শিশু কেন স্বাধীনভাবে বাইরে যেতে পারবে না? কেন তাকে সবসময় ভয় নিয়ে চলতে হবে? কেন নিরাপদ থাকার জন্য তার পৃথিবী ছোট করতে হবে? বরং আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করতে পারি না, যেখানে একটি শিশু স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠবে এবং একই সঙ্গে তার চারপাশে থাকবে দায়িত্বশীল মানুষের একটি নিরাপত্তার বলয়?
অপ্রতিমকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না। তার পরিবার যে শূন্যতার মধ্যে পড়েছে, সেটিও কোনো বিচার পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু তার মৃত্যুর পর যদি আমরা শুধু অপরাধীর শাস্তি দাবি করে থেমে যাই, তাহলে একটি বড় সুযোগ হারাব। আমাদের দেখতে হবে কোথায় কোথায় সামাজিক সংযোগ দুর্বল হচ্ছে। কোথায় শিশুরা বড়দের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কোথায় কমিউনিটি একে অন্যের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ছে। কোথায় আমরা নিরাপত্তাকে শুধু ক্যামেরা, তালা আর পাহারার মধ্যে সীমাবদ্ধ করছি।
কারণ একটি শিশুর নিরাপত্তার প্রথম প্রাচীর সবসময় দেয়াল নয়। কখনো সেটি একজন মা। কখনো একজন শিক্ষক। কখনো একজন প্রতিবেশী। কখনো একজন বন্ধু। কখনো এমন একজন অপরিচিত মানুষ, যিনি বিপদ দেখে এগিয়ে আসেন।
অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে না; এটি আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলোরও হিসাব চায়। আমরা কি এখনও এমন একটি সমাজে বাস করি, যেখানে পথে একটি শিশুকে দেখলে তাকে শুধু ‘অন্যের সন্তান’ বলে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে নিজের সন্তানের মতো নিরাপদে বাড়ি ফেরার দায়িত্বটুকু অনুভব করি? নাকি পাশাপাশি বসবাস করতে করতে আমরা এতটাই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি যে, একটি শিশুকে ঘিরে আজও অনেক মানুষ থাকে, অথচ তাকে আগলে রাখার মতো একটি সামাজিক নিরাপত্তার বলয় থাকে না?
অপ্রতিমের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক। তবে একই সঙ্গে আমাদের হারিয়ে যাওয়া সামাজিক নিরাপত্তার বলয়টিকেও পুনর্গঠন করতে হবে। কারণ একটি শিশুকে নিরাপদ রাখা কেবল তার ওপর নজরদারি বাড়ানোর বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি সচেতন ও দায়িত্বশীল সমাজ, যেখানে একটি শিশুর নিরাপত্তা তার পরিবারের একার দায়িত্ব না হয়ে আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব হয়ে ওঠে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ