খুলনা | রবিবার | ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

মমতা ও কেজরিওয়ালকে ছেড়ে দিলো দিল্লি পুলিশ

‘পতনের দ্বারপ্রান্তে মোদি’, সোমবার দিল্লিতে বিক্ষোভের ডাক ইন্ডিয়া জোটের

খবর প্রতিবেদন |
০২:১১ এ.এম | ১১ অক্টোবর ২০২৬


মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায়’ এবার দিল্লিতে বড় ধরনের প্রতিবাদের ডাক দিয়েছে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট। শনিবার সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল আলপ্পুঝায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা জানান। খবর রেডিফের।
তিনি বলেন, সংবিধানের সুরক্ষা ও জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার এই চলমান লড়াইয়ের অংশ হিসেবে আগামী সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানী দিল্লিতে এক বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করবে ইন্ডিয়া জোট। স¤প্রতি এই ইস্যুতে নিজেদের উদ্বেগ জানাতে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেছেন জোটের নেতারা। সোমবার ভারতের প্রধান বিচারপতির সঙ্গেও তাদের সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সুরক্ষা দেয়ার ‘অপচেষ্টার’ জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিু শাহর তীব্র সমালোচনা করেন বেণুগোপাল। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনারকে আড়াল করার এই প্রক্রিয়াই মোদি ও শাহের পুনের কারণ হবে।’ দাবি করেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মোদির আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তিনি পতনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন। বিরোধীদের আন্দোলনকে তিনি ভয় পাচ্ছেন।’ ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ঘোষিত শনিবারের বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লিতে রীতিমত লকডাউন জারি করেছে ভারত সরকার। বন্ধ করে দিয়েছে মেট্রো স্টেশন ও সারা দেশের সঙ্গে দিল্লির রেল যোগাযোগ। মাঠে নামানো হয়েছে হাজার হাজার সশস্ত্র পুলিশ সদস্য।
নির্বাচনি প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অবাধ এবং সুষ্ঠু না হওয়া পর্যন্ত কংগ্রেস ও ইন্ডিয়া জোট তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যাবে বলে হুঁশিয়ারি দেন এই কংগ্রেস নেতা। কেরালা রাজ্যের পরিস্থিতি তুলে ধরে বেণুগোপাল বলেন, কেরালায় ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) বিরুদ্ধে কংগ্রেস অত্যন্ত সুর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের লেটারহেডে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নির্বাচনী প্রতীক ‘পদ্ম’ ভেসে ওঠার বিতর্কের বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
মমতা ও কেজরিওয়ালকে ছেড়ে দিলো দিল্লি পুলিশ : পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। দিল্লিতে সিইসির পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে আজ তাদের আটক করা হয়েছিল।
আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে মমতাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তার সঙ্গে আটক বাকি তৃণমূল নেতাদেরও ছেড়ে দিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
এদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কেজরিয়ালকেও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। জাফরপুর কালান পুলিশ স্টেশন থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মনে হচ্ছিল যেন অপহরণ করা হচ্ছে : পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘দিল্লির যন্তর মন্তরে যাওয়ার পথে পুলিশ আমাদের বাধা দেয়। পরে জোর করে প্রিজন ভ্যানে তুলে বিভিন্ন থানায় ঘোরানো হয়। ওই সময় আমাদের মনে হচ্ছিল, যেন অপহরণ করা হচ্ছে।’
মমতা বলেন, ‘ইন্ডিয়া জোটেরও গণকাল একটি কর্মসূচি ছিল। আমরা সেখানে যাওয়ার আগে বাড়ির বাইরে মোতায়েন পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞাসা করি, আমাদের যন্তর মন্তরে যেতে দেওয়া হবে কিনা। তারা জানান, যেতে দেওয়া হবে না; পথে আটকে দেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, আমাদের যেতে বাধা দেওয়ায় বাড়ির সামনের বাসস্ট্যান্ডে বসেছিলাম। আমরা সেখানে সমর্থন জানাতে গিয়েছিলেন। পরে পুলিশ এসে জানায়, একসঙ্গে তিনজনের বেশি থাকা যাবে না।
মমতার ভাষ্য, ‘এক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ আমাদের সরিয়ে দেয়। জোর করে প্রিজন ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়, যেন আমরা ভয়ংকর কোনো অপরাধী।’
এ ধরনের অভিজ্ঞতা আমার কখনো হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গ্রেফতার করে পুলিশ ভ্যানে তুলে নেওয়া। তারা আমাদের দুই ঘণ্টা ধরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরিয়েছে। এক থানায় নিয়ে যায়, পরে আরেক থানায়, তারপর অন্য থানায়। প্রতিটি থানায় বলা হয়, জায়গা নেই। শেষ পর্যন্ত আমাদের মনে হচ্ছিল, যেন অপহরণ করা হচ্ছে।’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ‘ইন্ডিয়া’ জোটের কর্মসূচি অনুযায়ী তারা যন্তর মন্তরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানাতে তারা বাসস্ট্যান্ডে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান নিলে মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল পুলিশ বাহিনী এসে দাগি অপরাধীদের মতো জোরপূর্বক তাদের প্রিজন ভ্যানে তুলে নেয়। 
কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বা জায়গা না জানিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে ভ্যানে করে এক থানা থেকে অন্য থানায় ঘুরিয়ে চরম হয়রানি করা হয়, যা একেবারেই নজিরবিহীন। এই ধরনের দমনপীড়ন চালিয়ে বিরোধী কণ্ঠরোধ করা যাবে না উল্লেখ করে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের এই স্বৈরাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদী লড়াই অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।
নেহা বোরাকে মুক্তি দিলো দিল্লি পুলিশ : অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরাকে মুক্তি দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স এ পোস্ট দিয়ে এ কথা জানিয়েছেন তিনি।
মুক্তি পাওয়ার পর এক্সে দেওয়া এক পোস্টে নেহা বোরা জানান, পুলিশ তার মুঠোফোন নিয়ে গিয়েছিল। পরে তিনি সেটি ফেরত পেয়েছেন। থানা থেকে আটক অন্য নারীদেরও মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
নেহা বোরা ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদ্যুাগের দাবিতে চলমান আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে এই আন্দোলন চলছে।
দিল্লিতে চলমান এই আন্দোলনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের বিভিন্ন শহরেও। বেঙ্গালুরু, মুম্বাই, চেন্নাই, চণ্ডীগড়, কলকাতা, পাটনা ও হায়দরাবাদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচির খবর পাওয়া গেছে।
বিমান থেকে আটক সিজেপির নেতারা : সকালে মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলটির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে বিমান থেকেই আটক করা হয় বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিমান থেকে প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে অভিজিৎ দীপকেকে বলতে শোনা যায়, তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিতে এসেছেন। অথচ তাদের অপরাধীর মতো আটক করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এর আগে সিজেপির আইনি বিভাগের প্রধান রতœা সিংকেও আটক করা হয়। দলটির অভিযোগ, তাঁকে রাস্তায় গাড়ির ভেতর থেকে আটক করে পুলিশ। এ ছাড়া ইউটিউবার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ধ্র“ব রাঠিকে গুরুগ্রামে তার বাড়ি থেকে আটক করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়।
বামপন্থী নেতারাও আটক : বিক্ষোভে যোগ দিতে গিয়ে কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নসহ একাধিক বামপন্থী নেতা আটক হন। তাদের মধ্যে সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, বাম নেত্রী বৃন্দা কারাট, এম ভি গোবিন্দন ও পি কে শ্রীমুীর নামও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
সিপিআই (এম) সংসদ সদস্য জন ব্রিটাস অভিযোগ করেন, পুলিশ তাদের কয়েকজনকে দীর্ঘ সময় ধরে দিল্লির বিভিন্ন স্থানে ঘোরানোর পর ছত্রসাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যায়। সেখানে কিছুক্ষণ রাখার পর আবার অন্যত্র নেওয়া হয়। তবে কোথায় নেওয়া হচ্ছে, তা তাদের জানানো হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বামপন্থী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরাকেও আটক করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। আটক হওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি আন্দোলনকারীদের যেখানে বাধা দেওয়া হবে, সেখানেই বসে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানান।
গুরুদোয়ারা থেকে মিছিল, লাঠিচার্জের অভিযোগ : গণ রাত থেকে দিল্লির বাংলা সাহিব গুরুদোয়ারায় আশ্রয় নিয়েছিলেন কয়েকশ’ বিক্ষোভকারী। শনিবার সকালে তারা যন্তর মন্তরের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয় এবং লাঠিচার্জ করে বলে অভিযোগ ওঠে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, গুরুদোয়ারা এলাকায় প্রায় ৬০০ জন জমায়েত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। তবে এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
হায়দরাবাদের সফটওয়্যার প্রকৌশলী অজয় জিঙ্গাদের অভিযোগ, সকাল থেকেই আন্দোলনকারীরা যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বিপুলসংখ্যক পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পরে লাঠিচার্জ করে অনেককে বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
দিল্লির বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তির খবরও পাওয়া যায়। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ দিল্লি হাট এলাকায় জড়ো হন। সিজেপি নেতা আজিঙ্ক্যা শিন্ডে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহŸান জানান, যেখানেই আন্দোলনকারীদের থামানো হবে, সেখানেই যেন তারা প্রতিবাদ চালিয়ে যান।
সাংবাদিক ও আইনজীবীদের আটকের অভিযোগ : বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিকও পুলিশের হাতে আটক হন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের সামনে প্রতিবাদ করা কয়েকজন আইনজীবীকে আটক করার খবর পাওয়া যায়। পরে তাদের কয়েকজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়।
সিজেপির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, দলটির কয়েকজন সদস্যের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক : ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরেই রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছিল। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, যাচাই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষের স্থানান্তর, ৩ কোটি মানুষের খোঁজ না পাওয়া এবং ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যুর বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, যাচাই প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত নামগুলোই বাদ দেওয়া হয়েছে এবং যোগ্য কোনো ভোটারের নাম ভুল করে বাদ পড়লে তিনি পুনরায় নিবন্ধন করতে পারবেন।
অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়নি। বিজেপি অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, নির্বাচনে তাদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা ও সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড।
শনিবারের ধরপাকড় ও বিক্ষোভে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং বিরোধীদের প্রতিবাদ করার অধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ