খুলনা | সোমবার | ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

দাকোপে নবনির্মিত আধুনিক উঁচু ও টেকসই ভেড়িবাঁধের ৪৫ মিটার ঢাকী নদীগর্ভে বিলীন

দাকোপ প্রতিনিধি |
০১:৩৭ এ.এম | ১২ অক্টোবর ২০২৬


দাকোপের বটবুনিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে হরিসভা মন্দির ও স্থানীয় সরদার বাড়ির সামনে নবনির্মিত আধুনিক উঁচু ও টেকসই ভেড়িবাঁধের ৪৫ মিটার বাঁধ ঢাকী নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় ভাঙন কবলিত স্থান সংলগ্ন প্রায় ১৫ থেকে ২০টি বসত ঘর বাড়ি সম্পূর্ণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। বেশ কয়েকটি পরিবার তাদের বসতঘর বাড়ি ঢাকী নদীগর্ভে হারিয়ে এখন তারা ওয়াপদা ভেড়িবাঁধের ওপর মানবেতর আশ্রয় গ্রহণ করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধটি আটকিয়ে লোকালয়ে পানি ঢোকা বন্ধ করলেও আতঙ্ক কাটছে না উপজেলার তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের ৭/৮টি গ্রামের প্রায় ৫ হাজার মানুষের।
সরজমিনে ঘুরে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দাকোপ উপজেলার  তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের বটবুনিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে হরিসভা মন্দিরের সামনে ৪৫ মিটার বাঁধ ঢাকী নদী গর্ভে বিলীন হয় যায়। ঘটনার পর লোকালয়ে ঢুকে পড়া পানি ভাটায় নেমে যাওয়ার সাথে সাথে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ড। 
উলে­খ্য গত বছর একই সময়ে এ স্থানের বাঁধটি নদী গর্ভে বিলীন হলে তৎকালীন সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নক্সা ও ডিজাইনে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স আমিন এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে সাড়ে ৩শ’ মিটার দীর্ঘ আধুনিক উঁচু ও টেকসই ভেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। বাঁধ নির্মাণের পরবর্তী সময়ে বাঁধের তীরবর্তী নদীর গভীরতা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি ঢাকী নদীর প্রবল জোয়ার ও ভাটার কারণে এ নির্মিত বাঁধের একাংশে ৪৫ মিটার বাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয় এবং জোয়ারের সময় লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। 
লোকালয়ে ঢুকে পড়া পানিতে তলিয়ে গেছে বটবুনিয়া গ্রামের প্রায় ২০ থেকে ২৫ বসতঘর বাড়ি। বসত ঘরবাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়া নদীর পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া পরিবাররা হলেন কৃষ্ণপদ সরদার, প্রশান্ত সরদার, অলোকেশ সরদার, রীনা মন্ডল, প্রদীপ সরদার, যদুবর সরদার, অজিত সরদার, রনজিদ সরদার, গোবিন্দ সরদার, গোপাল সরদার, পরিতোষ সরদার, সূর্য্যকান্ত সরদার, শেখর সরদার, নিরঞ্জন সরদার, রবিন রায়, অবনি মন্ডলসহ অন্যান্যরা। নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বেশ কয়েকটি পরিবার খোলা আকাশের নিচে ওয়াপদা ভেড়িবাঁধে মানবেতর আশ্রয় নিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ পাশর্^বর্তী তাদের নিকট আত্বীয় সজনের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন।
এদিকে ভাটায় পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে অনেকে পরিবার তাদের ঘর বাড়ি রক্ষার্থে তা অন্যত্র সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। নদী ভাঙন এলাকার পাশ দিয়ে বিকল্প বাঁধ নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ড সকল পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি ভাঙ্গন কবলিত স্থানে প্রয়োজনীয় বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলছেন এবং বালু ভর্তি টিউব ঢেলে লোকালয়ে পানি ঢোকা বন্ধের প্রচেষ্টা চালাতে দেখা গেছে। সব মিলিয়ে এ স্থানের বাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হওয়া এবং জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ার কারণে অত্র ইউনিয়নের প্রায় ৭ থেকে ৮টি গ্রামের প্রায় ৫ হাজার মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
নদীর পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষ্ণপদ সরদার জানান “আমার কৃষি জমি বলতে কিছুই নাই। বাপ-দাদার পৈতৃক সম্পত্তি বলতে শুধু ৩ কাঠা ভিটে বাড়িই ছিলো। গত তিন বছর আগে আমার ২টি বসত ঘর গিলে খাইছে এই ঢাকী নদী। পরবর্তীতে মানুষির কাছে ধার দেনার পাশাপাশি কামলার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে আবারও একটি বসতঘর নির্মাণ করেছি। সেই বসতঘরে আমার বৃদ্ধ মা ও আমার পরিবারের ৪ সদস্যদেরকে নিয়ে কোন রকম বসবাস করতাম। আজ আমার সেই ঘরটিও এই রাক্ষসী ঢাকী নদী গিলে খাইছে। এখন আমি আমার পরিবারের সদস্যদেরকে নিয়ে কোথায় যাব কোথায় থাকবো জানি না”। এ আর্তনাদ শুধু একা কৃষ্ণপদ সরদারের একার নয়। তার মতো করে নদীগর্ভে বসত ঘরবাড়ি হারা স্থানীয় অনেকেই বুক নানা কষ্টের কথা বর্ণনা করেছেন। 
উলে­খ্য গত ৪/৫ বছরে একের পর এক ঢাকী নদী ভাঙনে বটবুনিয়া বাজারের পূর্ব-পশ্চিম পাশে ওয়াপদা ভেড়িবাঁধ সংলগ্ন প্রায় দুই শতাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং শতাধিক বসতঘর বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। তিলডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান গাজী জালাল উদ্দিন বলেন, বটবুনিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে হরিসভা মন্দির ও স্থানীয় সরদার বাড়ির সামনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ বাঁধটি  ঢাকী নদীর প্রবল জোয়ার-ভাটার তোড়ে প্রায় বছর কোন না কোন স্থান দিয়ে বাঁধ দেবে বা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এ স্থানে নদীর গভীরতা সৃষ্টি রোধে এবং জোয়ার-ভাটার গতিরোধ কল্পে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে না পারলে কোন ভাবেই এ স্থানে বাঁধ টিকানো সম্ভব হবে না। এ স্থানে বাঁধ দেবে যাওয়ার সাথে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ শুরু করেছেন বিকল্প বাঁধ নির্মাণের জন্য। তবে চলমান আমাবশ্যা গোনের রাতের প্রবল জোয়ারের তোড়ে আটকে ফেলা এ স্থানের বাঁধ অবশেষে টিকবে কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
চালনা পৌরসভা বিএনপি’র সাবেক আহবায়ক শেখ মোজাফ্ফার হোসেন বলেন, এ নদী ভাঙন স্থানে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে বিকল্প বাঁধ নির্মাণ না করা হলে খরস্রোতা ঢাকী নদীর তীব্র জোয়ার-ভাটার কারণে আটকানো বাঁধটি আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গ্রামবাসীদের রক্ষার্থে নদী ভাঙন স্থানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছেন। 
দাকোপ উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সদস্য সচিব আব্দুল মান্নান খান জানান ঢাকী নদীর জোয়ার-ভাটায় দেবে যাওয়া বাঁধটি সরজমিনে পরিদর্শন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের সাথে কথা বলে তাদেরকে শান্তনা দিয়েছি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের তালিকা তৈরি পূর্বক আমার দলের পক্ষ থেকে কিছু খাদ্য সহায়তা প্রদানের জন্য জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদের সাথে বলেছি।  সেই সাথে এ স্থানে দ্রুত বিকল্প বাঁধ নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি। 
পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাশেদুর রহমান জানান, দাকোপ উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩১নং পোল্ডারের ভেড়িবাঁধ যুগোপযোগী করে নির্মানের পাশাপাশি দুর্যোগ সহশীল টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যে সকল পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। বটবুনিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে হরিসভা মন্দির ও সরদার বাড়ি সংলগ্ন ভেড়িবাঁধটির ৪৫মিটার বাঁধ ঢাকী নদীগর্ভে বিলীন হয়। বাঁধটি ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে নদীর জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। ভাটিতে লোকালয়ের পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে ওই স্থানে বাঁধ বন্ধির কাজ শুরু করে লোকালয়ে পানি ঢোকা কন্ধ করা হয়েছে। আশা করছি রাতের জোয়ার আসার আগেই এ স্থানে বিকল্প বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হবে।
দাকোপ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ বোরহান উদ্দিন মিঠু জানান, বটবুনিয়ায় দেবে যাওয়া বাঁধ পরিদর্শন করেছি এবং আমার জেলা প্রশাসককে বিষয়টি অবগত করেছি। দেবে যাওয়া স্থানে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নিয়ে দ্রুত বিকল্প বাঁধ নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ