খুলনা | মঙ্গলবার | ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

শুল্কায়ন ও পণ্য খালাসের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন

বেনাপোলে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা লাঞ্ছিত, এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ

বেনাপোল প্রতিনিধি |
০১:০৪ এ.এম | ১৩ অক্টোবর ২০২৬


বেনাপোল স্থলবন্দরের ৪১ নম্বর শেড থেকে দুই ট্রাক পণ্য বেরিয়ে ঢাকার সদরঘাট এলাকার একটি গুদামে পৌঁছানোর পর আটকের ঘটনায় শুল্কায়ন ও পণ্য খালাসের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এরই মধ্যে গত ৮ অক্টোবর দায়িত্ব পালনকালে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ তুলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাঈন উদ্দিন আরমান। ঘটনার প্রতিবাদে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতিতে ওইদিন প্রায় চার ঘণ্টা পণ্য খালাস বন্ধ ছিল।
সোমবার কাস্টমস সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এর আগে রোববার দেওয়া লিখিত অভিযোগে কাস্টমস হাউসের যুগ্ম-কমিশনার-২ শরফুদ্দিন মিঞার বিরুদ্ধে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আনেন আরমান। অভিযোগে বলা হয়, গত ৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বেনাপোল স্থলবন্দরের ৪১ নম্বর শেডে দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালে তাকে ডেকে পাঠান যুগ্ম-কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞা। সেখানে একাধিক কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বন্দরের কর্মকর্তাদের সামনে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহŸল হয়ে তিনি ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এ ঘটনায় কাস্টমসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবাদে তারা পণ্য ছাড়করণ কার্যক্রম বন্ধ রাখেন। এতে প্রায় চার ঘণ্টা আমদানি পণ্য খালাস ব্যাহত হয়। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কার্যক্রম শুরু হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে অপসারণ ও শাস্তির দাবিতে বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের মধ্যে কর্মবিরতি অব্যাহত রাখার দাবিও উঠেছে।
কাস্টমস সূত্র জানায়, বেনাপোল স্থলবন্দরের ৪১ নম্বর শেডে চার ট্রাক পণ্য ছিল। এর মধ্যে দুই ট্রাক পণ্য বন্দর থেকে বেরিয়ে ঢাকার সদরঘাট এলাকার একটি গুদামে পৌঁছায়। পরে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার অভিযানে পণ্যগুলো আটক করা হয়। চালানটির ম্যানিফেস্ট নম্বর ৬০১২০২৬০০৩০০৬২৬৫১। এ চালানের সঙ্গে ঢাকার সিএ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান গ্রিন ওয়ে ইন্টারন্যাশনাল এবং যশোরের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স আবিদ ইন্টারন্যাশনাল সংশ্লিষ্ট বলে কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের যুগ্ম-কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞা দুই ট্রাক পণ্য বন্দর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়ার পর শেডে গিয়ে খোঁজ নেন। ওই শেডে পণ্য তদারকির দায়িত্বে ছিলেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাঈন উদ্দিন আরমান, ট্রাফিক পরিদর্শক মামুনুর রশিদ ও সহকারী শেড ইনচার্জ আশরাফুল আলম। পণ্য বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আরমান অন্য কাজে অন্যত্র ছিলেন বলে জানান।
ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে ৪১ নম্বর শেডে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন কাস্টমসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, ঘটনার সময় ওই এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা চালু থাকলে ফুটেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব। 
তাদের দাবি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে ঘটনার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ যেন সংরক্ষণ করা হয়। পাশাপাশি একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে ওই সময়টাতে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
যুগ্ম-কমিশনার শরফুদ্দিন মিয়ার বিরুদ্ধে এর আগেও অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং বিভিন্ন ভাবে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, যুগ্ম-কমিশনারের নির্দেশ বা কথামতো না চললে কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক চাপ বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়, বেনাপোলের ব্যবসায়ী মহলেও যুগ্ম-কমিশনার শরফুদ্দিন মিয়াকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আজিজুর রহমান, আব্দুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পণ্য খালাস ও কাস্টমস-সংক্রান্ত কার্যক্রমে হয়রানি, ইচ্ছাকৃতভাবে জটিলতা সৃষ্টি, দায়িত্ব পালনে অসহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না করার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাদের।
অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা যাচায়ে বক্তব্য জানতে যুগ্ম-কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে গাড়িতে করে কাস্টমস হাউস ত্যাগ করেন। সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাঈন উদ্দিন আরমান বলেন, বেনাপোল কাস্টমস হাউসের যুগ্ম-কমিশনার শরফুদ্দিন কর্তৃক শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তবে অভিযোগের বিস্তারিত বিষয়ে প্রকাশ্যে আর কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি তিনি।
বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার ফাইজুর রহমান বলেন, ৪১ নম্বর শেড থেকে পণ্য খালাস ও এক কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। পণ্য খালাসের নথিপত্র, শুল্কায়ন প্রক্রিয়া এবং দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা যাচাই-বাছাই করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি রাজস্ব সুরক্ষা ও কাস্টমসের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ