খুলনা | মঙ্গলবার | ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

বাগেরহাটে মধ্যরাতে হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে লাঞ্ছিতের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাগেরহাট |
০২:১৯ এ.এম | ১৩ অক্টোবর ২০২৬


বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে মধ্যরাতে দায়িত্বরত চিকিৎসক সাকিয়া হককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে সাবেক শ্রমিক দল নেতার লোকজনের বিরুদ্ধে। ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেন ডায়ানা এ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত ডাঃ সাকিয়া হক।
সেখানে তিনি লিখেন, ‘বাগেরহাটে শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক শানু (নাকি হারুন জানিনা) এসে শুধু গায়ে হাত দেয়া বাকি রাখছে নাইট ডিউটিতে। আমি একা রুমে। ৮-১০ জন সাঙ্গোপাঙ্গ এসে মারমুখো, কারণ একটাই : আমাদের ওয়ার্ড বয় ক্যানুলা মিস করছে।’ এরপরই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। রোববার দিবাগত রাত ১২টার দিকে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ওই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে।
চিকিৎসক সাকিয়া হক বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার। স্থানীয় এক সাবেক শ্রমিক দল নেতার লোকজনে ক্যানুলা পরানোকে কেন্দ্র করে ওই নারী চিকিৎসকে তাঁর কক্ষে ঢুকে গালাগাল ও মারধর করতে তেড়ে আসেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
হাসপাতালের রেজিস্ট্রার অনুযায়ী, ওই রোগীর নাম শানু। বাগেরহাট পৌর শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম ভূঁইয়া ওরফে সেলিম ভূঁইয়া বলেন, বর্তমানে বাগেরহাটে শ্রমিক দলের কোন কমিটি নেই। আবু হানিফ শ্রমিক দলের জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও প্রস্তাবিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক।
সাকিয়া হক বলেন, গত রোববার দুপুর আড়াইটা থেকে সোমবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আমার ডিউটি ছিল। ওই সময়ে ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে আমিই একমাত্র চিকিৎসক ছিলাম। রাত ১২টার দিকে বুকে ও পেটে ব্যথা নিয়ে এক রোগী হাসপাতালে আসেন। প্রথমে তাঁর ইসিজি (ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম) করা হয়। পরীক্ষা ও রক্তচাপসহ অন্যান্য শারীরিক লক্ষণ পর্যবেক্ষণে তাৎক্ষণিকভাবে হৃদ্যন্ত্রের কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। পরে গ্যাসের সমস্যার জন্য ইনজেকশন দেওয়ার পরামর্শ দেন।
ইনজেকশন দেওয়ার জন্য রোগীর শরীরে ক্যানুলা পরাতে গিয়ে প্রথমবার ব্যর্থ হন সংশ্লিষ্ট ইন্টার্ন চিকিৎসক। দ্বিতীয়বারও একজন ওয়ার্ড বয় চেষ্টা করেন। এতে রোগীর স্বজনরা মারমুখি হয়ে ওঠে। দায়িত্বরতরা শিশু বিভাগের নার্সদের ডাকতে যান। কারণ তারা বেশ অভিজ্ঞ ক্যানুলা পরানোর বিষয়ে। এরমাঝেই রোগীর সঙ্গে আসা ব্যক্তিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তাঁরা আমার কক্ষে ঢুকে গালাগাল এবং বারবার মারতে তেড়ে আসেন।
ডাঃ সাকিয়া হক বলেন, ‘রোগীর সঙ্গে আসা সাঙ্গপাঙ্গরা (লোকজন) বেশি আক্রমণাত্মক ছিলেন। তাঁরা আমার কক্ষে ঢুকে গালাগাল করেন। বারবার তেড়ে আসেন। তাঁরা গায়ে হাত দেননি, দিতে পারেননি। তবে পরিস্থিতি এমন ছিল যে, তাঁরা গায়ে হাত দিতেন কি না, তা বলা কঠিন। চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে হাসপাতালের কর্মী ও অন্য রোগীর স্বজনেরা এগিয়ে আসেন। পরে হাসপাতালের কর্মীরা তাঁদের কক্ষ থেকে সরিয়ে দেন। 
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রাত সোয়া ১টার দিকে ওই চিকিৎসক তাঁর ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। যেখানে তিনি ব্যক্তিটি কোন দলের উদ্দেশ্য অভিযোগ নয় বলে ব্যাখ্যা করেছেন। একই সঙ্গে কাজের পরিবেশ ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।
বিষয়টি তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন উল্লেখ করেন বলেন, ‘এটা নতুন কিছু না। এমন ঘটনা মাঝে মধ্যেই হয়। অন্য চিকিৎসকদের সঙ্গেও ঘটে। এমন পরিবেশে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন। রাতে কেউ থাকে না। এমন হলে ভয় লাগে। হাসপাতাল ছাড়াও তো বাইরে বের হতে হয়। আমি এসব নিয়ে আর প্যারা নিতে চাই না।’
হাসপাতালের তত্ত¡াবধায়ক ডাঃ অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে এটা নতুন নয়। এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় আমরা মর্মাহত। কোন হাসপাতালেই এই পরিবেশ মেনে নেওয়া যায় না। হাসপাতালে পাঁচশ’র উপরে রোগী ভর্তি। কিন্তু কর্মী আছে পদের ৩ ভাগের এক ভাগ। তাঁর মাঝেও সবাই সেবা দিতে চেষ্টা করছেন। এমন ঘটনা দুঃখজনক। তবে দুপুর পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানায়নি। 
শ্রমিক দল নেতা সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ‘ব্যাপারটা আসলে তো যেভাবে ফলাউ হইছে, ওরকম না। ওতো দলীয় ভাবে যায়নি। ও হচ্ছে ৬ জায়গা সিরা পাচ্ছিল না। একটা নার্স ৬ জায়গা ফুটো করেছে। তখন গিয়ে বলে, ম্যাডাম আমার তো কষ্ট হচ্ছে। আপনি একটু প্লিজ এসে (ক্যানুলা) করে দেন। উনি (ডাক্তার) আবার বলছে, এটা আমার কাজ না। উনিও ত্যাড়া ত্যাড়া কথা বলেছে। এ জন্য একটু বাক বিতন্ডা হয়েছে। সেলিম ভূঁইয়া জানান, তিনি শ্রমিক দলের প্রস্তাবিত জেলা কমিটির সভাপতি। এটা (কমিটি) এখনো অনুমোদন হয়নি। অনুমোদন হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে।    
বাগেরহাট সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ সামসুল আরেফিন বলেন, এখনো কোন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ