খুলনা | বুধবার | ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

ধর্ষনের পর নদীতে ফেলে হত্যা করা হয় আসমাকে

নাকফুল ও কাপড়ের সূত্রে ধরে মোংলার ক্লুলেস হত্যা রহস্য উন্মোচন, গ্রেফতার ২

মোংলা প্রতিনিধি |
০৫:৩৮ পি.এম | ১৪ অক্টোবর ২০২৬



নিহতের নাকফুল এবং মরাদেহের পড়নের কাপড়ের সূত্রধরে দীর্ঘ দুই মাস পর আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর সালমা হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে মোংলা থানা পুলিশ। মোংলা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার রেফাতুল ইসলাম এর দীর্ঘ প্রচেস্টা ও সহযোগী আবু হানিফের সহযোগীতায় জোরালো কোন আলামত না থাকা সত্ত্বেও সূক্ষ্ম তদন্তের মাধ্যমে জোড়া খুনিকে সনাক্ত ও গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে বাগেরহাটের পার্শ্ববর্তী দাকোপ উপজেলার নিজ নিজ এলাকা থেকে আসামীদের গ্রেফতার করা হয়। এ সময় নিহত আসমা বেগমের ব্যবহৃত হারিয়ে যাওয়া মোবাইল ফোনটিও উদ্ধার করা হয়।

আজ বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে মোংলা থানা হলরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সহকারী পুলিশ সুপার (মোংলা সার্কেল) মোঃ রেফাতুল ইসলাম, ওসি আতিকুর রহমান সহ অন্যান্যরা। আসমাকে কৌশলে মোংলা দাকোপ এলাকায় নিয়ে ধর্ষনের পর তাকে হত্যা করা হয় বলে স্বীকার করে আটককৃতরা।

পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া দুই আসামী খুলনার দাকোপ উপজেলার লাইডোব এলাকার মৃত নুরুল শেখ এর ছেলে মো: ইকরামুল শেখ (৪০) ও মোংলা পোর্ট পৌরসভা ৮ নং ওয়ার্ড ছাড়াবাড়ি এলাকার মৃত মোজাফফর হাওলাদারের ছেলে মোঃ মীর আলী (৪৮)। আর নিহত নারী আসমা বেগম (৩৯) মোংলা উপজেলার মালগাজী এলাকার আঃ জবেদ আলীর কন্যা। তিনি দুই সন্তানের জননী ছিলেন।

নিহত আসমা মোংলা শহরের ফেরিঘাট সংলগ্ন ভেড়িবাধে চায়ের দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

পুলিশ জানায়, গত ১৪ আগস্ট রাতে মোংলা ফেরিঘাট সংলগ্ন নিজ দোকান বন্ধ করে বাড়ি য়াওয়ার জন্য বের হলে হঠাৎ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন আসমা বেগম। সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান না পেয়ে ১৬ আগস্ট মোংলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে তার পরিবার।

পরবর্তীতে ২০ আগস্ট খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার কাজিবাছা নদী থেকে অজ্ঞাতনামা এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে রূপসা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। মরদেহটি সনাক্ত করা না যাওয়ায় তৎকালীন সময়ে আলামত হিসেবে শুধু ছবি ও পরিধেয় বস্ত্রের বিবরণ সংরক্ষণ করা হয়।

নৌ পুলিশের সংরক্ষিত ছবি ও তথ্যের ভিত্তিতে মোংলা থানা পুলিশ ক্লুলেস এই মামলাটির ছায়া তদন্ত শুরু করে। তদন্তকারী দলের প্রধান থাকেন মোংলা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার রেফাতুল ইসলাম। তদন্ত টিম ভিকটিমের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে তার আগের ব্যবহার করা পোশাকের কাপড় পরীক্ষা করে। সেখানে দেখা যায়, নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরনে থাকা পাজামার রঙ, কাপড়ের বুনন ও নকশার সঙ্গে আসমার ঘরে থাকা অন্য একটি পাজামার হুবহু মিল রয়েছে—যা একই গজ কাপড় দিয়ে তৈরি ছিল।
পরবর্তীতে মরদেহের নাকে থাকা বিশেষ ধরনের নাকফুলটির ছবি স্বজনদের দেখালে তারা নিশ্চিত হন যে, নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহটি নিখোঁজ আসমা বেগমেরই।

নিহতের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মোংলা থানা পুলিশ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ এবং নিবিড় গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। প্রথম সন্দেহভাজন হিসেবে দাকোপের লাউডোব এলাকা থেকে ইকরামুল শেখ গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেয়া তথ্যানুযায়ী মোংলা থেকে আটক করা হয় মোঃ মীর আলীকে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত ইকরামুল শেখ আসমা বেগমকে কৌশলে মোংলা থেকে দাকোপে নিয়ে ধর্ষনের পর হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। পরবর্তীতে আসামীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ইকরামুলের হেফাজত থেকে নিহত আসমা বেগমের ব্যবহৃত হারিয়ে যাওয়া মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ।

ঘটনার রহস্য উন্মোচন ও আসামীরা গ্রেফতার হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতের স্বজনেরা। তারা জানান, আসমা বেগম অত্যন্ত পরিশ্রমী একজন নারী ছিলেন। সামান্য চায়ের দোকান চালিয়ে দুই সন্তানকে বড় করছিলেন। তাকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করা হবে তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। স্বজনেরা জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে সহকারী পুলিশ সুপার (মোংলা সার্কেল) মোঃ রেফাতুল ইসলাম বলেন, আসামীরা দীর্ঘদিন আসমার দোকানে চা-পান খেতো। সেই থেকেই পরিচয় এবং বিভিন্ন সময় টাকা পয়সাও লেনদেন করতো আসমা ও ঘাতক আসামীরা। সেই পরিচয় কৌশলে তাকে মোংলা থেকে নৌকা যোগে দাকোপে নিয়ে ধর্ষনের পর হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়। কিন্তু আসমা নিখোঁজ হওয়ার মামলাটি সম্পূর্ণ ক্লুলেস ছিল। কিন্তু একটি পাজামার কাপড় ও নাকফুলের মতো ক্ষুদ্রতম ক্লু ধরে এবং প্রযুক্তির সহায়তায় আমরা ঘাতকদের চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছি। ঘটনা উধঘাটনের বেশী অবধান রেখেছে আবু হানিফ নামের মোংলা থানার এক পুলিম অফিসারের। প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া শেষে গ্রেফতারকৃত দুই আসামীকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণের করা হয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ