খুলনা | শুক্রবার | ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১ কার্তিক ১৪৩৩

পাকিস্তানে স্কুলের ছাদ ধসে শিক্ষকসহ ২৮ শিক্ষার্থী নিহত

খবর প্রতিবেদন |
০১:৪৮ পি.এম | ১৫ অক্টোবর ২০২৬


পাকিস্তানের পেশোয়ারের আফ্রিদি আবাদ এলাকায় বৃহস্পতিবার একটি বেসরকারি স্কুলের ছাদ ধসে অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৭ জন শিক্ষার্থী ও একজন নারী শিক্ষক রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১৯ জন।

পেশোয়ারের লেডি রিডিং হাসপাতালের (এলআরএইচ) মুখপাত্র মুহাম্মদ আসিম ডনকে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৮ হয়েছে। এর আগে নিহতের সংখ্যা ২১ বলে জানানো হয়েছিল।

পেশোয়ারের উপকমিশনার আফাক ওয়াজির জিও নিউজকে জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের সব অংশ সরিয়ে ফেলেছে। ঘটনাস্থলে আর কোনো আহত শিশু নেই।’

এর আগে উদ্ধারকারী সংস্থা রেসকিউ ১১২২-এর মুখপাত্র বিলাল আহমেদ ফয়জি জানিয়েছিলেন, উদ্ধার অভিযান চলছিল।

লেডি রিডিং হাসপাতালের মুখপাত্র এর আগে জানিয়েছিলেন, আহত পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ঘটনায় হাসপাতালটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

পেশোয়ারের উপকমিশনার আফাক ওয়াজির ডনকে বলেন, আল খায়ের স্কুলের ছাদ ধসে পড়লে শিক্ষার্থীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে। তাঁর কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, দুর্ঘটনার সময় শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ছিল।

এর আগে রেসকিউ ১১২২-এর মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, উদ্ধারকর্মীরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসহ প্রায় ২০ জনকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। সে সময় লেডি রিডিং হাসপাতালের বরাত দিয়ে তিনি চারজনের মৃত্যুর খবর দিয়েছিলেন।

শোক প্রকাশ, তদন্তের নির্দেশ
স্কুলের ছাদ ধসে প্রাণহানির ঘটনায় খাইবার পাখতুনখাওয়ার (কেপি) গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়েছেন এবং ছাদ ধসের কারণ নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘নিরপরাধ শিশুদের মূল্যবান প্রাণহানি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এক ট্রাজেডি।’ নিহত শিশুদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান তিনি।

আহত শিশুদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশও দেন গভর্নর।

এদিকে খাইবার পাখতুনখাওয়ার পুলিশের মহাপরিদর্শক জুলফিকার হামিদ পেশোয়ারের পুলিশপ্রধানকে উদ্ধার অভিযান তদারকির নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি অ্যাম্বুলেন্সের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে ট্রাফিক পুলিশকে ‘গ্রিন করিডর’ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এক বিবৃতিতে বলা হয়, উদ্ধারকারী দল ও পুলিশকে সব ধরনের উপলভ্য সম্পদ কাজে লাগানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক বলেন, ‘এই শোকের মুহূর্তে খাইবার পাখতুনখাওয়ার পুলিশ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে রয়েছে।’

ঘটনার খবর পেয়ে স্কুলে ছুটে যাওয়া এক অভিভাবক সামিউল্লাহ ডনকে বলেন, তিনি আট বছরের কম বয়সী তিনটি মেয়েশিশুকে উদ্ধার করেছেন।

সামিউল্লাহ বলেন, ‘সকাল ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে বাড়ি থেকে ফোন পাই। প্রায় ১০ মিনিট পর, সকাল ৯টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাই। এই স্কুলে আমার ছয় সন্তান পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভবনটি দেখে ভেবেছিলাম, আমার ছেলেও মারা গেছে। সে যে শ্রেণিকক্ষে ছিল, সেটি ধসে পড়া প্রথম তলার ঠিক নিচে নিচতলায়। কিন্তু সে পানি পান করতে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়েছিল।’

প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এ ঘটনায় ‘গুরুতর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে নিহত শিশুদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান দার।

তিনি বলেন, ‘আমাদের শিশুরা সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাদের এ ধরনের প্রতিটি প্রাণহানি পুরো দেশের জন্যই এক ট্র্যাজেডি।’

দার আরও বলেন, ‘শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক সহায়তা, আহতদের সর্বোত্তম চিকিৎসা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে স্কুলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে।

এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারিও এ ঘটনায় গভীর শোক ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘হৃদয়বিদারক এই দুর্ঘটনা পুরো জাতিকে শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।’ নিহত শিশুদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।

আহতদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ‘এই শোকের মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দুঃখে পুরো জাতি সমানভাবে অংশীদার।’

দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ওপর গুরুত্ব দেন জারদারি। একই সঙ্গে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নিরাপত্তার মানদণ্ড মেনে তৈরি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও তাঁর কার্যালয়ের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি নিহত শিশুদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। আহত ব্যক্তিদের সম্ভাব্য সব ধরনের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম দ্রুততর করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।

পাকিস্তানে ভবন ও ছাদ ধসের ঘটনা
পাকিস্তানে ভবন ও ছাদ ধসে প্রাণহানির ঘটনা প্রায়ই ঘটে। দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহারকে এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

গত জুলাইয়ে উমেরকোটের কাছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরের দেয়ালের একাংশ ধসে তিন থেকে ১৩ বছর বয়সী তিনটি মেয়েশিশু নিহত হয়। দেয়ালের ধ্বংসস্তূপ তাদের ওপর পড়ে।

একই মাসে লাহোরের বাগবানপুরা এলাকায় নির্মাণাধীন একটি বেসরকারি স্কুল ভবনের ছাদ ধসে এক শিশু নিহত হয়। আহত হন অন্তত আরও পাঁচজন।

এর আগে জুনে লাহোরের কাহনা এলাকায় একটি বেসরকারি কোচিং সেন্টারের ছাদ ধসে ১৪টি শিশু প্রাণ হারায়। এর দুই মাসেরও কম সময় আগে ডেরা গাজি খানের একটি বেসরকারি স্কুলের শ্রেণিকক্ষের ছাদ ধসে চার শিশু নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছিল।

ডেরা গাজি খানের ওই দুর্ঘটনার তদন্তে জানা যায়, কোচিং সেন্টারের ভবন সম্প্রসারণের কাজ চলার সময় শ্রেণিকক্ষের ছাদ ধসে পড়ে।

গত সপ্তাহে প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার সময় পাকপাত্তানে একটি বাড়ির ছাদ ধসে দুই ব্যক্তি নিহত হন।

জুন মাসে গুজরাটের লালামুসার খাওয়াসপুর এলাকায় নির্মাণাধীন একটি ভবনের ছাদ ধসে এক শ্রমিক নিহত ও তিনজন আহত হন। একই মাসে লাহোরের নিশতার এলাকায় একটি বাড়ির ছাদ ধসে দুজন আহত হন।

আগস্টে টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টির পর ইসলামাবাদের শাহজাদ টাউনে একটি বাড়ির ছাদ ধসে এক দম্পতি নিহত হন। তাঁদের মেয়েরা আহত হয়।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ