খুলনা | শুক্রবার | ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

শোকের ভার বুকে, একটাই দাবি বিচার

স্বামীর মাথার খুলি ছিন্নভিন্ন মগজ বের হয়ে যায় : বিচার চান ইসমাইলের স্ত্রী

খবর প্রতিবেদন |
০১:৪৯ এ.এম | ১৬ অক্টোবর ২০২৬


রাজধানীর রামপুরায় জুলাই হত্যাকান্ডে শহীদ রিকশাচালক ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী লাকি বেগম রাষ্ট্রপক্ষের ১৬তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি পেশ করেছেন। জবানবন্দিতে স্বামী হত্যার জন্য মামলার চার আসামিকে দায়ী করে বিচার চান লাকি। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবিন্দ পেশ করেন তিনি। এদিন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান ও মামুনুর রশিদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার, মঈনুল করিমসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।
‘মাগরিবের নামাজের সময় ছেলের এক বন্ধু এসে জানাল, আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। খবরটি শুনে আমি আর আমার ছেলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে দেখি, প্রতিবেশীরা রিকশাভ্যানে করে তার রক্তাক্ত দেহ বাসায় নিয়ে এসেছেন। মাথার খুলি ছিন্ন-ভিন্ন, মগজ বের হয়ে গেছে। সারা শরীর রক্তে ভেজা। এ দৃশ্য কোনো দিন ভুলতে পারব না।’ জবানবন্দিতে কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন লাকি বেগম।
এর মধ্য দিয়ে রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চার আসামির বিরুদ্ধে পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৮ অক্টোবর দিন ঠিক করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
চার আসামির মধ্যে বর্তমানে গ্রেফতার হয়ে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেলে আছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মোঃ রাফাত বিন আলম। পলাতকরা হলেন-ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মোঃ রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ মশিউর রহমান।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রামপুরায় ২৮ জন নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালে চারজনের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
লাকি বেগমের বয়স ৩৮ বছর। তার স্বামী জীবিকা নির্বাহ করতেন অটোরিকশা চালিয়ে। প্রতিদিনের মতো ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে অটোরিকশা নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই বেরিয়ে যাওয়া যে পরিবারের কাছে তার শেষ বিদায় হয়ে থাকবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি লাকি। মাগরিবের সময় এলো মৃত্যু সংবাদ
লাকির বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন মাগরিবের নামাজের সময় তার ছেলের এক বন্ধু বাসায় এসে জানায়, ডেলটা কেয়ার হাসপাতালের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে তার স্বামী মারা গেছেন। আকস্মিক এ সংবাদে মুহ‚র্তেই ভেঙে পড়ে পরিবারটি। মা- ছেলে দু’জনই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে তারা দেখতে পান, এক প্রতিবেশী রিকশাভ্যানে করে তার স্বামীর মরদেহ বাসায় নিয়ে এসেছেন। স্বামীর ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখে আবারও শোকে স্তব্ধ হয়ে যান লাকি। তার ভাষ্য, স্বামীর মাথায় গুলি লেগেছিল। মাথার খুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে মগজ বেরিয়ে গিয়েছিল। শরীরের সর্বত্র ছিল রক্তের দাগ।
মরদেহের মাথায় ব্যান্ডেজ করানোর জন্য তাকে বেটার লাইফ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে এ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যাচ্ছিল না। পরে লাকির দেবর বাড়ি থেকে এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে হাসপাতালে আসেন। এরপর লাকি, তার ছেলে ও নিকটাত্মীয়রা মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
পথে পুলিশ-বিজিবির বাধা, পরিচয় গোপন করে ছাড় : লাকির অভিযোগ, গ্রামের বাড়ি যাওয়ার পথে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা তাদের নানা ভাবে হয়রানি করেন। এ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখা হয়। একদিকে স্বামীর মরদেহ, অন্যদিকে শোকাহত পরিবার-এমন পরিস্থিতিতে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত স্বামী দুর্ঘটনায় মারা গেছেন বলে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে এ্যাম্বুলেন্স ছাড়িয়ে নিতে হয় তাদের। পরদিন ২০ জুলাই, গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে স্বামীর মরদেহ দাফন করা হয়।
পরে ফেসবুক, ইউটিউব ও সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে তিনি জানতে পারেন, তার স্বামী পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে নিহত হন। তার জবানবন্দিতে রাফাত, রেদোয়ান, রাশেদুল ও মশিউর নামে চারজনের নাম উঠে এসেছে। লাকির অভিযোগ, তার স্বামীকে গুলি করার ঘটনায় এই ব্যক্তিরা জড়িত।
ছবিতে স্বামীকে শনাক্ত, আসামির ছবিও চিহ্নিত : জবানবন্দিতে লাকি তার স্বামীর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকার একটি ছবি (আলোকচিত্র) শনাক্ত করেন। মামলার নথিতে এটি প্রদর্শনী-১ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে; জব্দতালিকা, জিম্মানামা ও দালিলিক সাক্ষ্যের ভলিউমের ১৭ নম্বর পৃষ্ঠায় ছবিটি সংরক্ষিত রয়েছে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া প্রদর্শনী-২, ৩ ও ৪ হিসেবে চিহ্নিত তিনটি আলোকচিত্রে রাফাতের ছবিও শনাক্ত করেন তিনি। সংশ্লিষ্ট নথির ১৬-১৭ নম্বর পৃষ্ঠায় এসব ছবির উল্লেখ রয়েছে।
শোকের ভার বুকে, একটাই দাবি বিচার : লাকি বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এবং তিনি নিজের বক্তব্য দিয়েছেন। স্বামীকে হারানোর পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তার কষ্ট ও ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে সেই একই প্রশ্ন-কেন তাকে এভাবে প্রাণ হারাতে হলো, আর তার পরিবারের এই অপূরণীয় ক্ষতির বিচার কবে হবে?
স্বামী হারিয়ে এক অনিশ্চিত বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া লাকি বেগমের দাবি স্পষ্ট: তার স্বামীর হত্যার বিচার হতে হবে। স্বজন হারানোর বেদনা মুছে ফেলার কোনো উপায় নেই; তবে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হলে তবেই তিনি কিছুটা হলেও ন্যায়বিচার পাওয়ার সান্ত¡না খুঁজে পাবেন। লাকি আর্তি জানিয়ে বলেন, স্বামীকে আর ফিরে পাবেন না, কিন্তু তার মৃত্যুর বিচার যেন হারিয়ে না যায়।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ