খুলনা | শনিবার | ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ২ কার্তিক ১৪৩৩

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ

দেবহাটায় যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার ২

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা |
০১:৫৭ এ.এম | ১৭ অক্টোবর ২০২৬


সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া এলাকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনিতে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৪৩) নিহত হওয়ায় ঘটনায় থানা একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিল বাদী হয়ে ফেসবুকে উস্কানিদাতা পারুলিয়া এলাকার ফজলুল হক আমিনীসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ পূর্বক অজ্ঞাত নামা আরো ২০০-২৫০ জনকে আসামি করে বৃহস্পতিবার রাতে দেবহাটা থানায় এই মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ইতোমধ্যে মামলার আসামি মোক্তার হোসেন এবং আসাদুল মোল্লাকে গ্রেফতার করেছে।
এদিকে ফেসবুকে উস্কানি দিয়ে মানুষ জড়ো করে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যায় নেতৃত্বদানকারী ফজলুল হক আমিনীকে ধরিয়ে দিতে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন প্রথাবিরোধী আলোচিত-সমালোচিত লেখক মহিউদ্দিন মোহাম্মদ। ফেসবুকে নিজ প্রফাইলে এই ঘোষণা দেন তিনি।
এতে তিনি লেখেন, ‘সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার দোহাই দিয়ে যুবককে পিটিয়ে মারার ঘটনায় মামলা হয়েছে। মূল আসামি ফজলুল হক আমিনী নামের একজন। সে দফায় দফায় ফেসবুকে লাইভ করে মানুষ জড়ো করেছিলো। এজাহারে নাম উল্লেখ আছে আরও দশ আসামির। অজ্ঞাত আছে ২০০-২৫০ জনের মতো। পুলিশ, র‌্যাব, ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তৎপর হয়েছে আসামি গ্রেফতারে। আপনারা কেউ আসামিদের বর্তমান অবস্থান জানলে অনুগ্রহ করে সরাসরি সাতক্ষীরার পুলিশ সুপারকে জানাবেন। আপনার পরিচয় গোপন থাকবে।
আসামিদের বিশেষ করে প্রধান আসামিকে ধরিয়ে দিতে সহায়তা করলে আমাদের এই পেইজের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। জড়িত প্রত্যেকের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে, যেন ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আর কখনো এ ধরনের ঘটনা না ঘটে’।
অপর দিকে মামলার এজাহার ও স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক বচসায় জড়িয়ে গালিগালাজ করেন মানসিক রোগাক্রান্ত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম। এ সময় স্থানীয় এক ব্যক্তি সেই কথাবার্তার অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। অডিওতে ধর্ম নিয়ে কটূক্তি রয়েছে দাবি করে স্থানীয় ফজলুল হক আমিনী ফেসবুক লাইভ করে ‘তৌহিদী জনতা’কে একত্রিত হওয়ার আহŸান জানান।
এরপর উত্তেজিত জনতা শামীমের বসতবাড়ির গেট ভাঙচুর করে তাকে বাজারে এনে মারধর করে। পরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে ফিরে তিনি বিষপান করেন। রাতে স্থানীয় কুলিয়া এলাকার এক গ্রাম্য চিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে তার পাকস্থলী ওয়াশ করানোর পর তিনি সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে ফজলুল হক আমিনী ও তার অনুসারীরা চিকিৎসাধীন শামীমকে ওই চেম্বার থেকে বের করে আবারও গণপিটুনি দেয়। এসময় জরুরি সেবা ৯৯৯ থেকে কল পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। তবে হামলা থামেনি, আমিনীর নেতৃত্বে এক হাজারের বেশি লোক হাসপাতালে গিয়ে ফের হামলা চালায় এবং চিকিৎসাধীন শামীমকে দেয়ালে আছাড় মেরে বাইরে এনে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের ছোট ভাই জেলা রেফারি এ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও সুবর্ণাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি তাহসিভ রহমান সাগরের অভিযোগ, ‘এই অডিও প্রথমে স্থানীয় জামায়াত অফিসে নিয়ে তাদের শোনানো হয়। এরপর স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর একদল নেতাকর্মী লোক জড়ো করে প্রথম ‘মব’ বা উগ্র জনতা সৃষ্টি করেছিল।’
তবে এ অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন স্থানীয় জামায়াত নেতা কামরুল ইসলাম গাজী। তিনি বলেন, চিকিৎসকের চেম্বারের পাশে সাধারণ মানুষ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। এতে জামায়াতের কোনো দলীয় সম্পৃক্ততা ছিল না, এলাকাবাসীই সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
একই সঙ্গে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে জড়িয়ে অপপ্রচারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন দলটির দেবহাটা উপজেলা শাখার সেক্রেটারি এইচ এম এমদাদুল হক। এক প্রতিবাদলিপিতে তিনি উল্লেখ করেন, শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী বা এর কোনো নেতাকর্মীর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
প্রতিবাদ লিপিতে বলা হয়, একটি মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জামায়াতের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্যে কান না দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আহŸান জানান তিনি। একই সঙ্গে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে শামীমের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানান দলটির নেতারা।
এদিকে মামলার প্রধান অভিযুক্ত ফজলুল হক আমিনী সামাজিক মাধ্যমে লাইভ করে জনতা জড়ো করার কথা নিজ মুখে স্বীকার করলেও এবং প্রশাসনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানালেও এখনও পর্যন্ত তিনি গ্রেফতার হননি। এ নিয়ে সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
দেবহাটা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এইচ এম শাহীন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলা দায়েরের পর পুলিশ ইতোমধ্যেই দুজনকে গ্রেফতার করেছে। প্রধান অভিযুক্ত ফজলুল হক আমিনীসহ অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতারে একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে দ্রুতই বাকি আসামিদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ