খুলনা | বুধবার | ২১ অক্টোবর ২০২৬ | ৫ কার্তিক ১৪৩৩

“জীবন্ত প্রতিচ্ছবি আলোকবর্তিকা হেডমাস্টার মোহাম্মদ আমজাদ আলী”

পূর্ণ চন্দ্র মন্ডল |
০২:৩১ এ.এম | ২১ অক্টোবর ২০২৬


কালপ্রবাহের অনবদ্য নিয়মে পৃথিবীর বুক থেকে কত নদী শুকিয়ে যায়, কত নক্ষত্র ঝরে পড়ে গহন আঁধারে। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা সময়ের সীমারেখা অতিক্রম করে অমর হয়ে থাকেন মানুষের হৃদয়ে, তাঁদের কর্মে, চিন্তায় এবং মহৎ আদর্শে। তাঁরা সাধারণ রক্তমাংসের মানুষ হয়েও জীবনদর্শনের আলো ছড়িয়ে সমাজের অন্ধকার দূর করেন। তেমনি একজন কালজয়ী পুরুষ, ক্ষণজন্মা শিক্ষাবিদ, নীতি ও সততার অনন্য প্রতীক ছিলেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সফল প্রধান শিক্ষক মরহুম হেডমাস্টার মোহাম্মদ আমজাদ আলী স্যার।
মঙ্গলবার ছিলো তাঁর ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর (৫ কার্তিক ১৪১৯ বাংলা) শারদীয় হেমন্তের এক সুপ্রভাতে, সকাল ৭:০৩ মিনিটে ৭৮ বছর বয়সে তিনি পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদের ছেড়ে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। দীর্ঘ বার্ধক্যজনিত জটিলতা শেষে তাঁর প্রয়াণে সমগ্র পাইকগাছা তথা উপকূলীয় অঞ্চলে নেমে এসেছিল গভীর শোকের ছায়া। দেখতে দেখতে চোদ্দটি বসন্ত পার হয়ে গেল, কিন্তু তাঁর স্মৃতির দীপ্তি এতটুকু ম্লান হয়নি। খুলনা জেলার কপোতাক্ষ ও শিবসা নদীর পলিবিধৌত এই পল্লি-জনপদের প্রতিটি ধূলিকণা, পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিটি ইট-পাথর এবং হাজার হাজার শিক্ষার্থীর স্মৃৃতিতে তিনি আজও একইভাবে জীবন্ত, একইভাবে ভাস্বর।
আমাদের সমাজে শিক্ষকের অভাব নেই, কিন্তু ‘শিক্ষাগুরু’ বা ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ বলতে যা বোঝায়, আমজাদ আলী স্যার ছিলেন ঠিক তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। উনার জ্যেষ্ঠ পুত্র, গুণী আইনজীবী ও সমাজসেবক এড. মোঃ মাফতুন আহমেদ ভাইয়ের বিশেষ অনুরোধে এবং স্যারের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে এই দীর্ঘ স্মারক নিবন্ধটি রচনার প্রয়াস পেলাম। আমার শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের স্মৃতিপটে স্যার যেভাবে অমলিন হয়ে আছেন, সাহিত্যিক অনুভূতির আল্পনায় সেই স্মৃতি ও ইতিহাসকেই আজ নতুন করে মেলে ধরছি।
১. নদীঘেরা জনপদের এক নক্ষত্রের উদয়: জন্ম, শিক্ষা ও সংগ্রাম : দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক উর্বর জনপদ পাইকগাছা ও কয়রা। ১৯৩৫ সালের ২রা জুলাই, অবিভক্ত পাইকগাছা (বর্তমান কয়রা) উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাগালী ইউনিয়নের ‘বাগালী’ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও বুনিয়াদি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আমজাদ আলী। কপোতাক্ষ নদীর কূলঘেঁষা সেই গ্রামটি তখন প্রকৃতির সান্নিধ্যে শান্ত হলেও আধুনিক শিক্ষাদীক্ষার আলো থেকে ছিল অনেকটাই বঞ্চিত।
তৎকালীন সময়ে বঙ্গঞ্চলের উপকূলীয় পল্লী এলাকায় পড়াশোনা করাটা ছিল এক মহাসংগ্রামের মতো। কাঁচা মেঠো পথ, নদী-নালার প্রতিবন্ধকতা, আর যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম অনুন্নত পরিবেশ অতিক্রম করে শিক্ষা গ্রহণ করতে হতো। কিন্তু বাল্যকাল থেকেই আমজাদ আলীর মেধা, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং শিক্ষার প্রতি যে অনুরাগ দৃশ্যমান হয়েছিল, তা ছিল সাধারণ আর দশটা শিশুর চেয়ে আলাদা। প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয়েছিল পাইকগাছা উপজেলার ল²ী খোলা গ্রামে।
স্থানীয় আত্মীয় কাগজী বাড়িতে থেকে মক্তবে মেধার স্বাক্ষর রেখে সেখানে প্রাথমিক গণ্ডি শেষ করে ১৯৪৫ সালে তিনি ভর্তি হন খুলনা জেলা স্কুলে। 
তখনকার দিনে হাইস্কুলে ভর্তি হওয়া এবং টিকে থাকা অত্যন্ত দুরুহ ব্যাপার ছিল। বহু মাইল পথ পায়ে হেঁটে, বর্ষায় কাদা-জল পেরিয়ে তিনি স্কুলে যেতেন। ১৯৫১ সালে এই স্কুল থেকেই কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা (মেট্রিক) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
মেট্রিক পাশের পর তাঁর শিক্ষার তৃষ্ণা তাঁকে টেনে নিয়ে যায় দূরবর্তী খুলনা শহরের বিখ্যাত দৌলতপুর বি.এল. কলেজে। সেখান থেকে ১৯৫৪ সালে তিনি সাফল্যের সাথে আই.এ (উচ্চ মাধ্যমিক) পাস করেন এবং ১৯৫৮ সালে একই কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। সেই যুগে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করা মানেই ছিল তৎকালীন সিভিল সার্ভিস বা প্রশাসনের উচ্চপদে আসীন হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। অর্থ, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির মোহ যে কাউকেই আকর্ষণ করতে পারত। কিন্তু আমজাদ আলী স্যার বেছে নিয়েছিলেন এক ভিন্ন পথ-আলোকিত সমাজ গড়ার পথ, নিঃস্বার্থ জ্ঞান বিতরণের পথ।
শিক্ষকতাকে নিছক পেশা নয়, বরং ‘ব্রত’ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তিনি। শিক্ষক হিসেবে নিজেকে আরও সুসংগঠিত ও আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতিতে দক্ষ করে তুলতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পরবর্তী ১৯৭৪ সালে তিনি খুলনা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে সি.ইন.এড অর্থাৎ বিএড অর্জন করেন। এবং তারপর রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে অতি উচ্চ নম্বরে মাস্টার্স ইন এডুকেশন (এম.এড) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন ১৯৯১ সালে। আধুনিক মনস্তাত্তি¡ক শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং প্রশাসনিক দক্ষতার পেছনে তাঁর এই প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
২. কর্মজীবন ও পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়: একটি সোনালী যুগ : ১৯৬০ সালে তরুণ আমজাদ আলী পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর সুদীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সূচনা এখান থেকেই। এর পর থেকে একটানা তিন দশকেরও বেশি সময় তিনি এই বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন, শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা এবং শৃঙ্খলার মান উন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করে গেছেন। পরবর্তীতে তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের আসন অলঙ্কৃত করেন।
আমজাদ আলী স্যারের প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন সময়টিকে পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসের “সোনালী যুগ” বললে এতটুকু বাড়িয়ে বলা হবে না। একটি সাধারণ গ্রামীণ স্কুলকে প্রশাসনিক সততা, একাডেমিক সাফল্য এবং শৃঙ্খলার দিক থেকে তিনি জাতীয় পর্যায়ের সমকক্ষ করে তুলেছিলেন।
১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এবং পরবর্তী সময়ে দেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো এই বিদ্যালয়টিও অবকাঠামোগতভাবে দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যুদ্ধোত্তর সেই চরম সংকটের দিনে বিদ্যালয়ের হাল ধরেছিলেন আমজাদ আলী স্যার। ভাঙাচোরা ঘর মেরামত করা, বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের আবার ক্লাসে ফিরিয়ে আনা, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ এবং পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন। বিদ্যালয়ের আঙিনায় তিনি নানা প্রজাতির বনজ, ফলজ ও ফুলের গাছ লাগিয়েছিলেন পরিবেশবান্ধব।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ