খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২২ অক্টোবর ২০২৬ | ৬ কার্তিক ১৪৩৩

জেটিতে দিন দিন জাহাজ আগমনের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে : বন্দর ব্যবহারকারী

ইকোনমিক জোন ও বন্দর পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী-বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা

মোংলা প্রতিনিধি |
০১:৪২ এ.এম | ২২ অক্টোবর ২০২৬


দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক রদবদল ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করার পর এই প্রথম দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি মোংলা সমুদ্র বন্দর পরিদর্শনে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই প্রথম মোংলা সফরে আসছে সরকার প্রধান। এক কেন্দ্র করে মোংলা সহ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রশাসনিক ব্যস্ততা ও সাধারণ মানুষের মাঝে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তার কাছে প্রত্যাশা করছে মোংলা বন্দরকে বিশ্বমানের বানিজ্যিক বন্দরের রূপান্তিত করা।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে শুধু মোংলা বন্দরই নয়, পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক ও বাণিজ্য মহলে তৈরি হয়েছে বিপুল উদ্দীপনা। বন্দর কেন্দ্রিক দীর্ঘদিনের নানা সমস্যা, নাব্য সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে মোংলাকে আন্তর্জাতিকমানের অর্থনৈতিক ‘হাব’-এ রূপান্তরের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ চান স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা।
পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ পরিদুল ইসলাম জানান, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা, জেটি এলাকা এবং মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি সরেজমিনে মূল্যায়ন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই হাই-প্রোফাইল সফরের প্রধান আলোচনার বিষয়গুলো হলো চীনা বিনিয়োগ ও নতুন জেটি নির্মাণ। চীন সরকারের সাথে পূর্বচুক্তিকৃত মোংলা বন্দরের নতুন জেটি নির্মাণ প্রকল্প পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এই বিনিয়োগ দ্রুত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এছাড়া মোংলা ইপিজেড এবং বন্দর সংলগ্ন স্পেশাল ইকোনমিক জোন এলাকায় শিল্পায়নের গতি বাড়াতে নতুন কর্মপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মোংলা বন্দর, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা ও পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়ার পাশাপাশি উপকূলের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মানে এক ইতিবাচক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারযোগে মোংলা বন্দর চ্যানেল, হিরণ পয়েন্ট এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্পট আকাশপথে ও সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন। বন্দরের সাগর মোহনা আকরাম পয়েন্ট এলাকায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনের নির্ধারিত স্থানটি পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এলএনজি ষ্টেশন পরিদর্শন শেষে চলে যাবেন নলিয়ানে। পরে নৌপথে চলে আসবেন মোংলা নৌবাহিনীতে, সেখান থেকে বিকালে তিনি মোংলা বন্দরের জেটি এলাকা পরিদর্শন শেষ করে যাবেন ইকোনমিক জোন পরিদর্শন করবেন।
প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, মোংলা নদীর ওপর বহুল কাক্সিক্ষত সেতু নির্মাণ এবং মোংলা-খুলনা মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করার প্রস্তাবও প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে এবং মোংলা বন্দর উন্নয়নের পাশাপাশি তাকে এটিও স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে।
মোংলা বন্দরকে চট্টগ্রাম বন্দরের বিকল্প নয়, বরং সমকক্ষ ও পরিপূরক আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে দেখতে চান স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে বাণিজ্যিক সংগঠনগুলো তাদের নির্দিষ্ট কিছু দাবিও প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হবে।
মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ জুলফিকার আলী বলেন, বন্দর চ্যানেলে নিয়মিত নাব্যতার অভাবে অনেক বড় বিদেশি জাহাজ সরাসরি জেটিতে জেটিতে এসে ভিড়তে পারে না। স্থায়ী ও বিজ্ঞানসম্মত ড্রেজিং ব্যবস্থার মাধ্যমে চ্যানেলের গভীরতা বজায় রাখাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী চীনের সহায়তায় নতুন জেটি নির্মাণের স্থান দেখার পাশাপাশি চ্যানেলের গভীরতা বাড়ানোর স্থায়ী নির্দেশনা দেবেন বলে আমরা আশাবাদী। এছাড়া মোংলা ইপিজেড ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এটি সম্ভব হলে বিশ্ববাজারের তীব্র প্রতিযোগিতায় আমাদের উৎপাদন খরচ কমবে। একই সাথে বন্দর থেকে খালাসকৃত পণ্য কম সময় ও খরচে ঢাকায় পৌঁছাতে সড়ক ও রেললাইনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
বন্দর ব্যবহারকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জেটিতে দিন দিন জাহাজ আগমনের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি এবং অনিয়ম দূর করা না গেলে ড্রেজিং করলেও পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাবে না। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে এসব বাধা অপসারণের জন্য কঠোর নির্দেশনা প্রত্যাশা করছি। চট্টগ্রাম বন্দরের তুলনায় সক্ষমতা থাকা সত্তে¡ও মোংলা পিছিয়ে আছে কেবল প্রশাসনিক লালফিতার দৌরাত্ম্যের কারণে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার যে প্রতিশ্র“তি বারবার দিয়েছেন, তা এই সফরের মাধ্যমে বাস্তবে দেখতে চায় ব্যবসায়ীরা।
দলীয় নেতাকর্মীরা বলেন, যদিও এটি সম্পূর্ণ একটি সরকারি, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পর্যালোচনা সফর এবং এতে কোনো দলীয় রাজনৈতিক জনসভার কর্মসূচি রাখা হয়নি, তবুও নেতাকর্মীদের উদযাপনে কোনো ঘাটতি দেখা যাচ্ছে না। পুরো বাগেরহাট জেলা ও মোংলা উপজেলায় আনন্দ মিছিল ও রঙিন ব্যানার-ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে পথঘাট।
তারা বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে দেশ পরিচালনায় সফল নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের প্রিয় নেতা তারেক রহমান দিনরাত পরিশ্রম করছেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের থমকে যাওয়া অর্থনৈতিক গতি ফিরিয়ে আনতেই তাঁর এই সফর। উপজেলা ও পৌর বিএনপি’র পক্ষ থেকে আমরা আমাদের প্রিয় রাষ্ট্রনায়ককে মোংলার মাটিতে আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই মোংলা সফর কেবল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ বা অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান করবে না, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্য, ট্রানজিট সুবিধা ব্যবহার এবং সুন্দরবন কেন্দ্রিক পরিবেশবান্ধব পর্যটন অর্থনীতিতেও বড় ধরণের গতি আনবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। এখন সবার দৃষ্টি আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ঐতিহাসিক পরিদর্শনের দিকে। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ