খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২২ অক্টোবর ২০২৬ | ৭ কার্তিক ১৪৩৩

পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানী তেল উৎপাদন করছে সুজন

এস এস সাগর, চিতলমারী |
০২:৫৩ পি.এম | ২২ অক্টোবর ২০২৬


বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলা হেলিপ্যাড। হেলিপ্যাডের পাশে বসবাস করে ঋষি (দলিত) সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবার। এদের মধ্যে একটি পরিবার সুজন বিশ্বাসের (৩৫)। বাবা হাজরা বিশ্বাস, মা শেফালী বিশ্বাস, স্ত্রী বিউটি বিশ্বাস, ছেলে সুজয় বিশ্বাস ও মেয়ে সংগীতা বিশ্বাস। এদের নিয়ে তাঁর ৬ সদস্যর পরিবার। জীবিকার তাগিদে উপজেলা সদর বাজারের ফুটপাতে মুচির কাজ করেন। দিনে দুই’শ থেকে তিন’শ টাকা আয় হয়। এ দিয়েই কোন মতে খেয়ে না খেয়ে তাঁদের সংসার চলে। কিন্তু এই অভাবের সংসারে তাঁকে সার্বক্ষণিক মানসিক পীড়া দিত বাড়ির সামনে বিশাল ময়লার ভাগাড়। বাজারের টনকে টন ময়লা প্রতিদিন এই ভাগাড়ে ফেলা হয়। যা পরিবেশ ও অনাগত শিশুদের জন্য চরম বিপদজনক। সেই পরিবেশ ও সন্তানদের রক্ষার কথা ভেবে সুজন পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানী তেল উৎপাদনের পদক্ষেপ নেন। সামান্য জুতা-স্যান্ডেল সেলাইয়ের আয়ের টাকা দিয়ে তিনি সংসার চালানোর পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানী তেল উৎপাদনের কারখানা। তাঁর উৎপাদিত ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন দিয়ে চলছে স্যালোইঞ্জিন ও মোটরসাইকেল।

সুজন বিশ্বাস বলেন, ‘উপজেলার পুরো বাজারের ময়লা আবর্জনা আমাদের বাড়ির সামনে ফেলে রাখে। খোলা বাতাসে ওরা পলিথিনে আগুন ধরিয়ে দেয়। ধোঁয়ায় শিশু ও বৃদ্ধদের দম আটকে আসে। এ কারণে মাথায় আসে কিভাবে পরিবেশটা রক্ষা করা যায়। আমি ইউটিউব দেখে দেখ পরিবেশ রক্ষার জন্য এ ‘পলিথিন বার্ন ইউনিট’ তৈরি করেছি। এতে একদিকে পরিবেশ রক্ষা হচ্ছে এবং অন্য জ্বালানী তেল উৎপাদন হচ্ছে।’

সুজন আরও জানান, প্রতিদিন তিনি ৪০ কেজি পলিথিন বিশাল আটকা সিলিন্ডারে পোড়ান। ৪০ কেজি পলিথিন পোড়াতে তাঁর ৫ মন কাঠ ও ৬ ঘন্টা সময় লাগে। এ পলিথিন পুড়িয়ে তিনি ১৫ লিটার ডিজেল, ৪ লিটার পেট্রেল ও ১ লিটার অকটেন পান। এর মধ্যে ১৫ লিটার ডিজেল পরিশোধিত করতে হয়। তাঁর উৎপাদিত পেট্রোল ও ডিজেল দিয়ে বর্তমানে স্যালোইঞ্জিন ও মোটরসাইকেল চলছে। তিনি তাঁর বহু কষ্টে গড়া প্রকল্পটি সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারি অথবা বেসরকারি সহযোগিতা কামনা করেছেন।

সুজন বিশ্বাসের স্ত্রী বিউটি বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা গরীব মানুষ। পরিবেশ ও সন্তানদের রক্ষার জন্য আমার স্বামী বহু কষ্টে এটি তৈরি করেছেন। খেয়ে না খেয়ে আমরা এটার জন্য কাজ করছি। এখন টাকার অভাবে যেন আমাদের এই স্বপ্ন বন্ধ না হয়। সেজন্য সকলের সহযোগিতা চাচ্ছি।’

নসিমন চালক মোঃ রাসেল মোল্লা জানান, তিনি সুজনের কাছ থেকে ডিজেল কিনে স্যালোইঞ্জিনের নসিমন চালাচ্ছেন। তাতে এখন পর্যন্ত তার কোন অসুবিধা হয়নি।

সদর বাজারের ব্যবসায়ী সুবল কর্মকার জানান, সুজনের উৎপাদিত পেট্রোলে রীতিমত মোটরসাইকেল চলছে। এতে পরিবেশের উপকার হচ্ছে, অন্যদিকে আয়ও হচ্ছে।

চিতলমারী উপজেলা পরিবেশ আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক এ্যাডভোকেট ফজলুল হক বলেন, ‘পলিথিন পরিবেশের জন্য হুমকি। সুজন যে পদক্ষেপ নিয়েছে এটা প্রশংসার দাবী রাখে। আমাদের সকলের উচিত সুজনকে সহযোগিতা করা।’

চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা আক্তার জানান, পলিথিন পুড়িয়ে দেশের বিভিন্ন যায়গায় জ্বালানী তেল উৎপাদনের খবর আমরা পাচ্ছি। সুজন যে প্রক্রিয়ায় পলিথিন পুড়িয়ে ধংস করছে তাতে পরিবেশের উপকার হচ্ছে। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ