খুলনা | শুক্রবার | ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | ৭ কার্তিক ১৪৩৩

প্রথম প্রধানমন্ত্রীর ৫ ঘন্টার সফর

মোংলা বন্দর উন্নয়নের নতুন দিগন্ত, অর্থনৈতিক বিপ্লবের প্রহর গুনছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ

মাহমুদ হাসান, মোংলা |
১১:২০ পি.এম | ২২ অক্টোবর ২০২৬


খুলনার দাকোপের নলীয়ান, মোংলা বন্দরে জেটি ও ইকোনমিক জোন এলাকায় দিনভর ছিল উৎসবের রঙে রঙিন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক মোংলা সমুদ্র বন্দরের হিরোনপয়েন্টে এলএমজি ষ্টেশন ও ইকোনমিক জোন সফরকে কেন্দ্র করে বন্দরের পশুর নদী সুন্দরবন ঘেঁষা পুরো উপক‚লীয় অঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে এক অভ‚তপূর্ব জাগরণ। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দিনব্যাপী এই সফর এবং সরজমিন পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে মোংলা বন্দর, প্রস্তাবিত ইকোনমিক জোন ও উপক‚লীয় জনপদের দীর্ঘদিনের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হলো।

সকালে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারযোগে রওয়ানা হয়ে সুন্দরবন ও হিরণ পয়েন্টের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আকাশপথে পর্যবেক্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রাকৃতিক সম্পদের অপার সম্ভাবনা ও উপক‚লীয় সুরক্ষার দিকটি প্রত্যক্ষ করে তিনি অবলোকন করেন রূপসী বাংলার রূপ। এরপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। নলিয়ান এলাকা পরিদর্শন শেষে নলিয়ানঘাট থেকে নৌপথে মোংলার নৌবাহিনীর দ্বিগরাজ ঘাটিতে পৌছান প্রধানমন্ত্রী। দুপুরে নৌগাটির জেটি এলাকায় পৌঁছে নির্ধারিত কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং ওয়ার্করুমের সভাকক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনামূলক সভায় যোগ দেন তিনি। সেখানে বন্দরের সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। সভা শেষে সাড়ে ৩টার দিকে প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দরের জেটি, সার্বিক কার্যক্রম ও বিদ্যমান অবকাঠামো ঘুরে দেখেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাবিত মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রত্যক্ষ করেন তিনি। পরিদর্শন শেষে বিকেল পৌনে ৫টায় মোংলা ত্যাগ করে হেলিকপ্টারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে মোংলা বন্দর ও প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল রূপ নেয় হাজারো মানুষের জনসমুদ্রে। মোংলা পোর্ট পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বিএনপি মোংলা পৌর শাখার সভাপতি মোঃ জুলফিকার আলী এবং মোংলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান হাওলাদার, সাধারণ সম্পাদক আবু হোসেন পনি, মাহবুবুর রহমান মানিকের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ বন্দর এলাকায় সমবেত হন। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে পুরো এলাকা করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মেহনতি মানুষের উল্লাসে মোংলা বন্তদর ও ইকোনমিক জোন এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে, যা স্পষ্ট করে তোলে এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর আগমন নিয়ে কতটা উচ্ছ¡াসা উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল।

পরিবেশ বন জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, এ অঞ্চলের সার্বিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যক্রম এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত বিষয় ও পর্যটন সম্ভাবনার ওপর সরাসরি নজর দিতেই এখানে সফর করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, এই ঐতিহাসিক পরিদর্শনের ফলে মোংলা বন্দর, ইকোনমিক জোন, ইপিজেড এবং সমগ্র শিল্পাঞ্চলের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। বন্দরের অবকাঠামোগত আধুনিকায়ন ও পণ্য খালাস প্রক্রিয়া আরও দ্রæত ও গতিশীল হবে। মোংলা নদীর ওপর সেতু নির্মাণসহ স্থানীয় সড়ক ও আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দাবিগুলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনা সহজ হলো। সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে মোংলা বন্দরকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাব এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করার প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে স্থানীয় অবকাঠামোতে ত্বরান্বিত হয়েছে উন্নয়নের ছোঁয়া। দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ ও ভাঙাচোরা মোংলার দিগরাজ থেকে মোংলা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার সড়ক রেকর্ড সময়ে দৃষ্টিনন্দনভাবে সংস্কার করা হয়। এতে সড়কটিতে আসা-যাওয়াকারী লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটে তৈরি হয়েছে বড় স্বস্তি। এছাড়া মোংলা বন্দরের জেটি, নৌযান ও প্রধান প্রধান স্থাপনাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুসজ্জিত করে এক নতুন রূপ দেওয়া হয়, নতুন রুপে সাজিয়েছিল পুরো বন্দরটিকে।

একটি সুশৃঙ্খল ও নির্বিঘœ সফর উপহার দিতে মোংলা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ রেফাতুল ইসলাম-এর নেতৃত্বে পুলিশ, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয় এক কঠোর ও নিচ্ছিন্দ্র নিরাপত্তা বলয়। সকল গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও কেপিআই এলাকাগুলোতে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিবিড় সমন্বয় ও সতর্ক পাহারা সফরের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

মোংলা বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন। স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘ দিন ধরে যে অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বপ্ন দেখে আসছিলেন, আজকের এই সফর সেই স্বপ্ন পূরণে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। প্রধানমন্ত্রী এই সফরে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং চ্যানেল ড্রেজিং ও জেটি সুবিধার আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত হবে। বেজার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের দ্রæত বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বড় বড় বিনিয়োগের দ্বার খুলবে বন্দরকে ঘিরে। বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশী নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে উপক‚লের হাজার হাজার শিক্ষিত ও বেকার যুবকের নতুন কর্মসংস্থানের সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়াও এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের পাশাপাশি উপক‚লীয় ভাঙন রোধ ও দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে মিলবে কার্যকর টেকসই পদক্ষেপ।

মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং বন্দর ব্যবসায়ী মোঃ জুলফিকার আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রস্তাবিত নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চীনের সাথে চুক্তি হওয়া নতুন জেটি ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের স্থান পরিদর্শন মোংলা অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো তৈরি হলে তা সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতিতে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। মোংলা বন্দরের নাব্যতা বজায় রাখতে এবং বড় বড় আন্তর্জাতিক জাহাজ যেন নির্বিঘেœ জেটিতে প্রবেশ করতে পারে, সে জন্য পশুর চ্যানেলে নিয়মিত ও সঠিকভাবে খননকাজ (ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং) চালানোর জোর দাবি জানান। তিনি আশাপ্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীর এই সরাসরি পরিদর্শনের মাধ্যমে মোংলা বন্দরের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের নানা সংকট কাটিয়ে একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে।

সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক সফর শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক সফর ছিল না, এটি ছিল উপক‚লীয় মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার এক নতুন স্মারক। মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে যে বিশাল অর্থনৈতিক হাব গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে এক নতুন মাত্রা যোগ হলো। পশুর নদীর অববাহিকায় অবহেলিত জীবনের বদলে এক স্বাবলম্বী ও উন্নত ভবিষ্যতের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দিকেই এখন ব্যাকুল আগ্রহে তাকিয়ে আছে মোংলা ও উপক‚লের সর্বস্তরের জনগণ। 
 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ