খুলনা | সোমবার | ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১১ কার্তিক ১৪৩৩

খুলনার শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

দুদকের মামলা, বাদ পড়লেন অর্থ ছাড়ের নেপথ্যে ভূমিকা রাখা কেডিএ’র দুই চেয়ারম্যান, সচিব ও সদস্যরা

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:৪৮ এ.এম | ২৬ অক্টোবর ২০২৬


নগরীর শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে দুই ঠিকাদার ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ৬ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে পৃথক দু’টি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রোববার দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক আশিকুর রহমান বাদি হিয়ে খুলনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলা দু’টি দায়ের করেন। মামলা নম্বর হচ্ছে ১০ ও ১১, তাং-২৫/১০/২০২৬। একটি মামলায়, কাজ না করেই ঠিকাদারকে এক কোটি ৫৫ লাখ টাকা বিল প্রদান এবং আরেকটি মামলায় ঠিকাদারের অনুকূলে অর্থ ছাড় করে ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা রাজস্ব হিসেবে স্থানান্তরের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়ের নেপথ্যে ভূমিকা রাখা কেডিএ’র দুই চেয়ারম্যান, সচিব, সদস্য (উন্নয়ন) ও সদস্য (প্রশাসন)-কে কাউকেই দুদকের মামলায় আসামি করা হয়নি। তাছাড়া খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ১৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে সুপারিশ করা হলেও দুদকের মামলায় ত দের অনেকের নাম আসেনি। মূল অভিযুক্তদের মামলা থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা চলছে। এর আগে গত সোমবার কমিশন থেকে মামলা করার অনুমতি দেওয়া হয়। শুক্রবার এ তথ্য নিশ্চিত করেন খুলনা দুদকের উপ-পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী।
মামলার আসামিরা হলেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান খান লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোঃ আতাউর রহমান, ঠিকাদারি কোম্পানি মাহাবুব ব্রাদার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মাহাবুব রহমান, কেডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী সাবিরুল আলম, সাবেক তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী শামীম জেহাদ, প্রকল্প পরিচালক মোঃ আরমান হোসেন, নির্বাহী প্রকৌশলী মুনতাসির মামুন, সহকারী প্রকৌশলী বাসুদেব কুমার বিশ্বাস ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী শরীফ ওয়াহিদুজ্জামান। একই ঘটনায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির তিন সদস্যসহ মোট ১৪ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। কেডিএ’র সদস্য (উন্নয়ন) এস এম মাহমুদুর রহমান ও সদস্য (প্রশাসন) মোঃ ইকবাল হোসেন এবং সাবেক সাবেক সচিব মোঃ বদিউজ্জামানের বিরুদ্ধে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে এবং বাকি ১১জনের বিরুদ্ধে কেডিএতে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। কিন্তু একই ঘটনায় তদন্ত করে দুদক ওই তিন সদস্যকেও বাদ দিয়েছে। অবশ্য মন্ত্রণালয়ও চেয়ারম্যান পদে থাকা সামরিক কর্মকর্তাদের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে কিছু উল্লেখ করেনি।
কেডিএ’র কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা জানান, শিপইয়ার্ড সড়কের কাজ চলাকালে পুরো বিষয়টি দেখভাল করতেন চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় ঠিকাদার মাহবুবুর রহমান প্রকল্পের প্রকৌশলীদের পাত্তা দিতেন না। কাজে কোন ভুল হয়েছে, এটা সংশোধন বা চিঠি দিতেও ভয়ে থাকতেন দায়িত্বরত প্রকৌশলীরা। বিল থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বেশির ভাগই তারা নিতেন। ২০২৪ সালের জুন মাসে প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ থাকা ১৩ কোটি টাকার বিল তৈরির নির্দেশ দেন তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সচিব। তাদের নির্দেশে নিচের প্রকৌশলীরা বিল তৈরি করে।
কেডিএ’র একাধিক কর্মকর্তা জানান, ফাইলে চূড়ান্ত অনুমোদন, সময় বাড়ানো, অর্থ ছাড়ে জড়িতরা বাদ পড়লে মামলার তদন্ত ও অগ্রগতি নিয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে। কেননা তারা নগরীর বিশেষ বাড়ির নির্দেশে একাজ গুলো পরিচালনা করতো, সেখানে কর্মকর্তাদের মতামতকে উপেক্ষা করা হতো। উল্লেখ্য মাহবুব ব্রাদার্স নগরীর শেখ বাড়ির নির্দেশে বিভিন্ন টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতো তা ছিলো খুলনায়।  
কেডিএ’র নথি অনুমোদন ও বিল প্রদানের নির্দেশিকায় দেখা গেছে, নিম্নমান সহকারী থেকে প্রধান প্রকৌশলীর পরে বিলের নথিতে সদস্য (প্রকৌশল), সচিব, সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) ও চেয়ারম্যান অনুমোদন করেন। এরপর চেয়ারম্যান ও সচিব যৌথভাবে বিলে স্বাক্ষর করেন।
কেডিএ থেকে জানা গেছে, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি হলেন চেয়ারম্যান। সংস্থার প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী সমস্ত সিদ্ধান্ত তাঁর নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়। প্রকল্প চলাকালীন সেনাবাহিনীর দুইজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছেন সচিব ও সদস্যরা। রাজনৈতিক বিবেচনায় অরাজনৈতিক ব্যক্তি ও কর্মকর্তারা এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। প্রকল্প চলাকালে প্রায় ৩ জন সদস্য কেডিএ’র সদস্য দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্পটি দেখাশোনা করেছেন। তারা কাউকেই আসামি করেনি দুদক।
কেডিএ’র একাধিক কর্মকর্তা জানান, ফাইলে চূড়ান্ত অনুমোদন, সময় বাড়ানো, অর্থ ছাড়ে জড়িতরা বাদ পড়লে মামলার তদন্ত ও অগ্রগতি নিয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে। কেননা তারা নগরীর বিশেষ বাড়ির নির্দেশে একাজ গুলো পরিচালনা করতো, সেখানে কর্মকর্তাদের মতামত উপেক্ষা করা হতো। উল্লেখ্য মাহবুব ব্রাদার্স নগরীর শেখ বাড়ির নির্দেশে বিভিন্ন টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতো তা ছিলো খুলনায়।  
জানতে চাইলে দুদকের খুলনা জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে মামলা হয়েছে। মামলার তদন্তকালে যদি অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তাহলে তাদেরও আসামি করা হবে।
খুলনা মহানগর নাগরিক ফোরামের কো-চেয়ারম্যান সরদার আবু তাহের বলেন, পুরো বিষয়টি দুঃখজনক। দীর্ঘ ১৩ বছর তারা মানুষকে কষ্ট দিয়েছে। শিপইয়ার্ড সড়কের অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে দৃষ্টিমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে পুনঃতদন্ত করতে হবে।
১৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ : খুলনার শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দীর্ঘ সূত্রিতার অভিযোগে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ১৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এরমধ্যে ১১ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কেডিএ’র তৎকালীন চেয়ারম্যান দ্বয়কে এবং সংস্থাটিতে প্রেষণে আসা তিন উপ-সচিবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি দেয়া হয়। একইসঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান এ্যান্ড মাহাবুব ব্রাদার্সকে কালো তালিকাভুক্তির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। 
অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তারা হলেন কেডিএ’র সদস্য (উন্নয়ন) এস এম মাহমুদুর রহমান, সাবেক সচিব মোঃ বদিউজ্জামান ও বর্তমান সদস্য (প্রশাসন) মোঃ ইকবাল হোসেন।
কেডিএ’র কর্মকর্তারা হলেন তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী এ টি এম ওয়াহিদ আজহার, তৎকালীন তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী (বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলী) কাজী সাবিরুল আলম, তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রকল্প) মজিবুর রহমান, প্রকল্প পরিচালক মোঃ আরমান হোসেন, উপ-প্রকল্প পরিচালক মুনতাসির মামুন, সাবেক তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী শামীম জেহাদ, ক্যাশিয়ার মেহেদী হাসান, সহকারী হিসাবরক্ষক পলাশ কুমার ঘোষ, হিসাবরক্ষক (পূর্ত) শাহানা আক্তার, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সাইদুল হক এবং অর্থ ও হিসাব রক্ষণ অফিসার এম এম হোসেন আলী।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কেডিএ’র বাস্তবায়নাধীন শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার কারণ এবং অনিয়ম খুঁজে বের করতে গত ৯ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশ দেন। একই মাসে এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত দল খুলনায় সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ে ডেকে নিয়ে কেডিএ চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। তদন্ত শেষে গত ৩১ আগস্ট গৃহায়ণ সচিবের কাছে ৪০৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কমিটি। ওই প্রতিবেদনে কেডিএর ১৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, আর্থিক অনিয়ম এবং সমীক্ষা ছাড়াই ডিপিপি প্রণয়নের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পে বরাদ্দ হওয়া ১৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা প্রায় দুই বছর কেডিএর নিজস্ব তহবিলে স্থানান্তর করে রাখা হয়েছিল, যা আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। তবে সেখানেও পর্দার অন্তরালে থেকে যান দুই চেয়ারম্যান, সদস্য (প্রকৌশল), সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) ও সংস্থার সচিব।
প্রসঙ্গত, শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায় ২০১৩ সালের ৭ মে। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ছিল ৯৮ কোটি টাকা। দীর্ঘ ১৩ বছরেও সড়কটির কাজ শেষ হয়নি। উল্টো ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ওই সড়কে অভিযান চালায় দুদক। সড়কে কাজের ধীরগতি দেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তদন্তের নির্দেশ দেন। পৃথক দু’টি তদন্ত গত সেপ্টেম্বর মাসে শেষ হয়।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়, স্থানীয় ঠিকাদার ‘মাহাবুব ব্রাদার্স লিমিটেডকে’ খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী সড়কটি নির্মাণ না করে সরকারের কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে-যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স¤প্রতি একনেকের সভায় ওই সড়ক নির্মাণে দীর্ঘ ১৩ বছরের নজিরবিহীন বিলম্বের কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে তিনি এর সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। 
নাগরিক নেতারা বলছেন, তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পরও যদি দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কেডিএর প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করা কঠিন হবে। তাদের মতে, এখন তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কেডিএ চেয়ারম্যান কী পদক্ষেপ নেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ