খুলনা | সোমবার | ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১১ কার্তিক ১৪৩৩

খুলনা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহাবুব ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের পৃথক দু’টি মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:৪৯ এ.এম | ২৬ অক্টোবর ২০২৬


জ্ঞাতআয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ২ কোটি ৫১ লাখ ৭৩ হাজার ২০০ টাকার সম্পদ অর্জন এবং সম্পদ বিবরণীতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে খুলনা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস এম মাহাবুবুর রহমান ও তার স্ত্রী  জাকিয়া মাহবুবের বিরুদ্ধে পৃথক দু’টি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলা দু’টির নম্বর হছে ১২ ও ১৩, তাং- ২৫/১০/২০২৬। বর্তমানে তিনি নেত্রকোনা জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। রোববার দুদকের খুলনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সংস্থার সহকারী পরিচালক মোঃ জাহিদ ফজল মামলাটি করেন। এতে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। 
দুদকের মামলার বিবরণ, দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে ৭৬,৭৭,২০০/- টাকার স্থাবর এবং ১,৭১,৮৭,৭৫১/- টাকার অস্থাবর মোট ২,৪৮,৬৪,৯৫১/- টাকা মূল্যের সম্পদ অর্জন করেন মর্মে ঘোষণা প্রদান করেন খুলনা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস এম মাহাবুবুর রহমান। যাচাই/অনুসন্ধানকালে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় তার নামে ২,২৯,২২,২৮৮/- টাকার স্থাবর এবং ১,৯১,১৪,৪০৮/- টাকা অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ তার নামে অর্জিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য (স্থাবর + অস্থাবর) = (২,২৯,২২,২৮৮ + ১,৯১,১৪,৪০৮) = ৪,২০,৩৬,৬৯৬/- টাকা। একই সময়ে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি, বড় বাজার শাখা, খুলনা এবং সোনালী ব্যাংক পিএলসি, স্যার ইকবাল রোড শাখা, খুলনায় তার দায় রয়েছে ১৪,৯৬,৭৪১/- টাকার, বিধায় দায় বাদে তার নামে অর্জিত স্থাবর- অস্থাবর সম্পদের মূল্যের পরিমাণ (৪,২০,৩৬,৬৯৬-১৪,৯৬,৭৪১)= ৪,০৫,৩৯,৯৫৫/- টাকা। উক্ত সম্পদের বিপরীতে এস এম মাহাবুবুর রহমানের গ্রহণযোগ্য আয়ের পরিমাণ ২,৩১,৬০,৪১৩/- টাকা এবং তার পারিবারিক ব্যয় মোট ৭৭,৯৩,৬৫৮/- টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বাদে জনাব এস, এম মাহাবুবুর রহমানের নীট সঞ্চয়/সম্পদের পরিমাণ (আয়-ব্যয়) = (২,৩১,৬০,৪১৩-৭৭,৯৩,৬৫৮) = ১,৫৩,৬৬,৭৫৫/- টাকা। সুতরাং এস এম মাহাবুবুর রহমানের জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসংগতিপূর্ণ অবৈধ সম্পদের মূল্যের পরিমাণ (স্থাবর-অস্থাবর-নীট আয়/সঞ্চয়)=(৪,০৫,৩৯,৯৫৫-১,৫৩,৬৬,৭৫৫) = ২,৫১,৭৩,২০০/- টাকা। আসামি এস এম মাহাবুবুর রহমান, সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ, খুলনা (বর্তমানে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ, নেত্রকোনা) তার অসাধু উপায়ে অর্জিত ও জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসংগতিপূর্ণ ২,৫১,৭৩,২০০/- (দুই কোটি একান্ন লক্ষ তিয়াত্তর হাজার দুইশত) টাকার সম্পদ নিজ মালিকানা ও ভোগদখলে রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭ (১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। একইসাথে এস এম মাহাবুবুর রহমান দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে ৩০,৫৬,৫৬৩/- টাকার স্থাবর এবং ১৯,২৬,৫৫৭/- টাকার অস্থাবর মোট ৪৯,৮৩,১২০/- (ঊনপঞ্চাশ লক্ষ তিরাশি হাজার একশত বিশ) টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য গোপনপূর্বক মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য প্রদান করে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬ (২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। বিধায় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭ (১) ও ২৬ (২) ধারায় একটি মামলা রুজু করা হয়েছে।  
মামলার বর্ণনা  আসামিদ্বয় ০১) এস, এম মাহাবুবুর রহমান (বয়স- ৫৬, এনআইডি নং-১৯৬৯৮৭২৮২০১১৪৮৯৯৮), সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ, খুলনা (বর্তমানে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ, নেত্রকোনা), পিতা-মৃত এস এম আব্দুর রউফ, উত্তর কাটিয়া, নিরালা আবাসিক এলাকা দালাল সড়ক, সাতক্ষীরা পৌরসভা, সাতক্ষীরা সরকারি পদে কর্মরত থেকে অবৈধ পন্থায় অসাধু উপায়ে অর্থ উপার্জন করত: স্ত্রীর নামে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে এবং ০২) মিসেস জাকিয়া মাহাবুব (বয়স- ৫৪, এনআইডি নং-৪১৭৭২৭৮৭৩৮), স্বামী-এস এম মাহাবুবুর রহমান, উত্তর কাটিয়া, নিরালা আবাসিক এলাকা দালাল সড়ক, সাতক্ষীরা পৌরসভা, সাতক্ষীরা তার স্বামীর সহায়তায় অসাধু উপায়ে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ ৭৫,৩৪,৪৬১/- (পঁচাত্তর লক্ষ চৌত্রিশ হাজার চারশত একষট্টি) টাকার সম্পদ অর্জনপূর্বক নিজ মালিকানা ও ভোগ দখলে রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা এবং দন্ডবিধি, ১৮৬০ এর ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।  
দুদকের মামলার বিবরণ, এস এম মাহাবুবুর রহমানের স্ত্রী মিসেস জাকিয়া মাহাবুব তার দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে ১,৪০,৬০,২০০/- টাকার স্থাবর এবং ১,১২,৩৯,২১৫/- টাকার অস্থাবর মোট ২,৫২,৯৯,৪১৫/- টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন মর্মে ঘোষণা প্রদান করেন। যাচাই/অনুসন্ধানকালে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় মিসেস জাকিয়া মাহাবুবের নামে মোট ১,৮২,৮৭,০৯৭/- টাকার স্থাবর এবং ১,১২,৩৯,২১৫/- টাকা অস্থাবর সম্পদ মোট (১,৮২,৮৭,০৯৭ + ১,১২,৩৯,২১৫)=২,৯৫,২৬,৩১২/- টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। উক্ত সম্পদের বিপরীতে মিসেস জাকিয়া মাহাবুবের বৈধ আয়ের পরিমাণ ২,৪৫,১৭,৮৫২/- টাকা এবং একই সময়ে তার পারিবারিক ব্যয় মোট ২৫,২৬,০০১/- টাকা। ব্যয় বাদে মিসেস জাকিয়া মাহাবুবের নীট সঞ্চয়/সম্পদের পরিমাণ (আয় - ব্যয়)= (২,৪৫,১৭,৮৫২ - ২৫,২৬,০০১) = ২,১৯,৯১,৮৫১/- টাকা। মিসেস জাকিয়া মাহাবুবের নামে অর্জিত জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের মূল্যের পরিমাণ (স্থাবর-অস্থাবর - নীট আয়/সঞ্চয়) = (২,৯৫,২৬,৩১২ - ২,১৯,৯১,৮৫১) = ৭৫,৩৪,৪৬১/- টাকা। 
মামলায় বলা হয় আসামি মিসেস জাকিয়া মাহাবুব পেশায় একজন গৃহিণী এবং তার অন্যকোন বৈধ আয়ের উৎস না থাকা সত্তে¡ও স্বামী এস এম মাহাবুবুর রহমানের সহযোগিতায় ৭৫,৩৪,৪৬১.০০ টাকার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসংগতিপূর্ণ অবৈধ সম্পদ অর্জনপূর্বক নিজ মালিকানা ও ভোগ দখলে রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭ (১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। আসামি মিসেস জাকিয়া মাহাবুবের স্বামী এস এম মাহাবুবুর রহমান সরকারি পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় অবৈধ পন্থায় অসাধু উপায়ে অর্থ উপার্জন করত: স্ত্রীর নামে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। বিধায় তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭ (১) ও দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ১০৯ ধারায়  পৃথক মামলা রুজু করা হয়েছে।  
এদিকে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এস এম মাহবুবুর রহমান। তার দাবি, আয়কর বিবরণীতে তার আয়-সম্পদের হিসাব রয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে তার বাবার নামে থাকা জমির ওপর নির্মিত একটি বাড়ির সম্পদও তার হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেখানে দুই কক্ষের একটি অতিথিশালা রয়েছে, যেখানে তার আত্মীয়স্বজন থাকেন বলে তিনি জানান।
মাহবুবুর রহমান বলেন, এর আগেও ২০১৫ সাল পর্যন্ত তার সম্পদ নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান হয়েছিল। সে সময় কিছু বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। বর্তমান অনুসন্ধানেও চাওয়া তথ্য দিয়েছেন এবং আগের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত সম্পদ বাদ দিয়ে হিসাব জমা দিয়েছেন বলেও জানান মাহবুবুর। তিনি বলেন, ‘এগুলো কোর্টে টিকবে না।’

প্রিন্ট

আরও সংবাদ