খুলনা | বুধবার | ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রমাণিত, ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ কমিটির

প্রকৌশলী সালেহ পার্টওয়ারীর বিরুদ্ধে ওয়ার্ড অফিস সংস্কারে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:৫৬ এ.এম | ২৭ অক্টোবর ২০২৬


নগরীর কেসিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও ১নং ওয়ার্ডের সাবেক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আবু সালেহ পার্টওয়ারীর বিরুদ্ধে অফিস সংস্কারের নামে ২ লক্ষ হাজার ৯০ টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাত করেছেন বলে অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছেন। ভুয়া ভাউচার ও স্বাক্ষরের মাধ্যমে এ অর্থ উত্তোলন করেছেন বলে তদন্ত কমিটির কাছে এসব তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
এর আগে অভিযোগের ভিত্তিতে ১৭ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটি গঠণ সংস্থাটি। কেসিসির ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল­া আল ইমরান প্রধান করে দুই সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন হয়। কমিটির অন্য সদস্য হচ্ছেন নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মোঃ মাসুদ করিম। কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন ২৮ সেপ্টেম্বর।
প্রতিবেদনে বলা হয়,  অফিস সংস্কারের নামে অর্থ উত্তোলন করা হলেও কোন প্রকার কাজ হয়নি বরং আত্মসাতের বিষয়টি জানাজানি হলে কেসিসির প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন উক্ত ওয়ার্ডের সাবেক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মহিউদ্দিন হোসেন। 
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭ অক্টোবর সরেজমিনে তদন্তকালীন ওয়ার্ড সচিব পরিমল চন্দ্র বিশ্বাস জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন সহকারী মোঃ জুয়েল হোসেন, অফিস সহায়ক (এমএলএসএস) সাইদুজ্জামান জানান মোঃ আবু সালেহ পার্টওয়ারী দায়িত্বে থাকাকালীন দু’টি প্রকল্পে অফিস সংস্কারের নামে ২ লক্ষ ৯০ হাজার এসেছিল। তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকাকালীন অফিস কক্ষের ভিতর বাহিরে চুনকাম করেছেন, ছাদের নিয়ে ভিমে মেরামত/প্লাস্টার/ সংস্কার করেছেন। মেরামতকালীন শ্রমিকের সংখ্যা ৩জন ছিল এবং তারা আনুমানিক ৭/৬ দিন কাজ করেছেন। 
প্রতিবেদনে আরও বলা হয় ১ম ধাপে চুনকাম করার সময় কোন রং-এর পাত্র আনেননি। পরবর্তীতে ২য় ধাপে দক্ষিণ পাশে ২টি বুম চুনকাম এবং ১টি গ্রিলে রং করেন। ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেষ মহিউদ্দিন হোসেন প্রশাসক বরাবর অভিযোগের প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ও ৪ অক্টোবরে উপযুক্ত মালামাল সরবরাহ করেন (কপি সংযুক্ত)। তারা জানান, আবেদনের সময় কমিটির সকলে স্বাক্ষর করেন, পরবর্তীতে আর কোন স্বাক্ষর নেয়া হয়নি। ২৭ অক্টোবর মালামাল ক্রয়ের সময় ওয়ার্ড সচিব পরিমল চন্দ্র বিশ্বাস ও মো জুয়েল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। তবে মালামাল ক্রয়ের সময় দরদাম তাদের সামনে হয়নি। আইপিএস সেটটি পুরাতন মনে হওয়ায় পরিবর্তন করা হয়। শুধু নতুন আইপিএস ১০ হাজার ৮শত টাকায় ক্রয় করা হয়। 
তদন্ত প্রতিবেদনে উলে­খ করা হয় সাবেক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মহিউদ্দিন হোসেন অফিস কক্ষে ফার্ণিচার দেখতে না পেয়ে আবেদন করেন। আবেদনের পরে মালামাল সরবরাহ করেন। শুনানিকালে তারা জানান, দোকানদারের নিকটে দরদামের বিষয়ে জানতে চাইলে দোকানদার তাদের বলেছেন এ বিষয়ে আবু সালেহ পাটওয়ারী তার কথা বলে নেবেন।
প্রতিবেদনে বলা হয় মোঃ আবু সালেহ পার্টওয়ারী কর্তৃক দাখিলকৃত আইপিএস সেটের ক্যাশ মেমোতে দেখা যায় সেটি ২০২৫ সালের ২ মে ক্রয় করা হয়েছে। কিন্তু স্টক রেজিস্ট্রার, বর্তমান ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম ও সচিবসহ অন্যান্য কর্মচারীদের জানান, ২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর আইপিএস অফিসে সরবরাহ করা হয়েছে। শুনানিকালে ক্রয়কৃত আইপিএসটি ক্রয়ের ১ বছর ৫ মাস পরে কেন অফিসে সরবরাহ করা হয়েছে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মোঃ আবু সালেহ পাটওয়ারী জানান, তিনি আইপিএসটি ক্রয় করে নিচের হল রুমে রেখেছিলেন। একইভাবে অন্যান্য মালামালসমূহ ক্রয়ের তারিখ এবং স্টক রেজিস্ট্রার অনুসারে সরবরাহের তারিখ ব্যাপক গড়মিল থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। 
তদন্তে শুনানিকালে ক্রয়কৃত মালামাল ক্রয় পরবর্তী দীর্ঘ সময়ে তার বাড়িতে ব্যবহৃত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, উক্ত মালামালসমূহ ক্রয় করে সংশ্লিষ্ট দোকানে সংরক্ষিত ছিল। প্রাথমিকভাবে সরবরাহকৃত আইপিএসটি পুরাতন মনে হওয়ায় পরবর্তীতে সেটি পরিবর্তন করে দেয়া হয়। পরিবর্তনকালে নতুন আইপিএস ক্রয়ের সময় জন্ম মৃত্যু নিবন্ধন সহকারী মোঃ জুয়েল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। 
তদন্ত প্রতিবেদন বলা হয় মোঃ জুয়েল হোসেন জানান আইপিএসটি ১০হাজার ৮শ’ টাকায় ক্রয় করা হয়। কিন্তু ক্যাশ মেমোতে তার মূল্যমান ২০ হাজার টাকা উলে­¬খ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোঃ আবু সালেহ পাটওয়ারী কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। এছাড়াও সরবরাহকৃত জানালার পর্দার মান ও মূল্য নিয়ে জানতে চাইলে তার কোন সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। 
প্রতিবেদনে বলা হয় সরেজমিনে বিগত ৭ অক্টোবর পরিদর্শনকালে জানা যায়, ওয়ার্ড অফিস সংস্কারের সময় রং-এর পরিবর্তে হোয়াইট সিমেন্ট ও চুনকাম ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোন রং-এর পাত্র ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু দাখিলকৃত ব্যয় বিবরণী/ক্যাশ মেমো/ভাউচারে রং ক্রয় করা হয়েছে দেখানো হয়েছে। এ অসঙ্গতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দিতে পারেননি। 
দাখিলকৃত ক্যাশ মেমোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দোকানসমূহের ক্যাশ মেমোর/ভাউচার বহি তারিখের মধ্যে দীর্ঘ সময়ে গড়মিল সম্পর্কে জানতে চাইলে মোঃ আবু সালেহ পার্টওয়ারীর কোন উত্তর দিতে পারেননি। মালামাল ক্রয় ও যাচাই বাছাইয়ের জন্য কমিটির সকল সদস্যকে মালামাল ক্রয়ের সময় সংযুক্ত করা হয়নি মর্মে জানতে চাইলে তিনি জানান টেবিল/আসবাবপত্র ক্রয়ের সময় কমিটির সদস্যদের সঙ্গে রাখা হয়েছিল। 
সরেজমিনে তদন্তকালে ওয়ার্ড সচিবসহ অন্যান্যরা কর্মচারীরা জানান ২৭ সেপ্টেম্বর মালামাল ক্রয়ের সময় তার সঙ্গে ছিলেন। বাস্তবে মালামাল ক্রয় ২৭ সেপ্টেম্বর-এর সাথে দাখিলকৃত ক্যাশ মেমোর তারিখের সাথে মিল না থাকার কারণ সম্পর্কেও তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।
তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কেসিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও ১নং ওয়ার্ডের সাবেক সাবেক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আবু সালেহ পাটওয়ারী বরাদ্দকৃত অর্থ ভুয়া বিল/ভাউচার দাখিল করে আত্মসাৎ, নিম্নমানের মালামাল ক্রয়, সকল মালামাল ক্রয়ে নির্ধারিত কমিটিকে অবহিত না করে ক্রয়, ভুয়া বিল/ভাউচার দাখিল ও তদন্তে মিথ্যা তথ্য প্রদান করে তদন্ত কমিটিকে বিভ্রান্ত করা সুস্পষ্টভাবে প্রমানিত হয়েছে যা খুলনা সিটি কর্পোরেশন কর্মকর্তা ও কর্মচারী চাকুরি বিধিমালা, ১৯৯৩ এর সপ্তম অধ্যায়ের ৩৮(চ) বিধি মোতাবেক দণ্ডনীয় অপরাধ। 
কেসিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও ১নং ওয়ার্ডের সাবেক সাবেক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আবু সালেহ পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর সুপারিশ করেন তদন্ত কমিটি।
কেসিসির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী সংস্থার প্রশাসক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছেন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ