খুলনা | বুধবার | ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর সম্পর্কে নতুন গতি আসুক

|
১২:০০ এ.এম | ২৮ অক্টোবর ২০২৬


প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চার দিনের সফরে জাপান গেছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন গতি সঞ্চার করা। আশা করা হচ্ছে, এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কে শুধু ‘ঋণনির্ভর উন্নয়ন সহায়তার’ গণ্ডি থেকে বের হয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি, যৌথ বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের দিগন্ত উন্মোচিত হবে। 
খবরে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফর করবেন। এই সফরে তিনি জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন এবং চিবার ফুতসুতে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে ২৭ অক্টোবর।
এই সফরটি এমন সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক পরিবর্তনের ডামাডোলের মধ্যে এশিয়া হয়ে উঠছে বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র। এই অঞ্চলের বৃহৎ অর্থনীতি; যেমনঃ চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো ঘিরে বাড়ছে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির আদান-প্রদান। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শিল্পোৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সংযোগও গভীর হচ্ছে।
কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, আঞ্চলিক বাজারে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়নি। এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক ঘাটতিও অনেক বড়। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, তৈরি পোশাকের ওপর অতিনির্ভরতা এবং আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে দুর্বল সংযোগের কারণে অনেক সুযোগ হারাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে আশার কথা হলো, এই সুযোগ এখনো হাতছাড়া হয়ে যায়নি। 
অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান মনে করেন, এই অঞ্চলের রপ্তানি সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক শক্তি বেড়েছে।
ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো বৈদেশিক সাহায্য, বিনিয়োগ ও মূলধনের জন্য আগের মতো পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভরশীল নয়। বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন সম্মেলনে তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র এশিয়ার দিকে সরে আসার প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে এশিয়ার আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশকে আরো নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে হবে। এক্ষেত্রে জাপান হতে পারে আমাদের অন্যতম সহায়ক শক্তি।
এদিকে জাপানের গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের রূপরেখা তৈরি করেছে জাপানের বেসরকারি খাত। জাপানি গাড়ি নির্মাতা টয়োটা প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগে বাংলাদেশে অ্যাসেম্বলি প্লান্ট করার পরিকল্পনা করছে। দেশের গ্যাসসংকট কাটাতে জাপানের বৃহত্তম জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জেরা মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকায় এলএনজি টার্মিনালসহ প্রয়োজনীয় বৃহত্তর অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। ২০১৪ সালের ‘বিগ-বি’ পরিকল্পনায় মূলত মাতারবাড়ী ঘিরে শিল্প ও বন্দর ছিল, কিন্তু বর্তমানে বঙ্গোপসাগরের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় সেটি আরো বৃহত্তর পর্যায়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে জাপানি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৩৮; ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৫০০-তে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এদিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ২০২৬ থেকে ২০৩১ মেয়াদে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের কৌশলগত বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজের প্রস্তাব তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। 
বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক অনেক পুরনো ও সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে দেশটি পাশে থেকেছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঢাকা মেট্রো রেল এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল জাপানের সহায়তায় করা মেগাপ্রকল্পগুলো উল্লেখযোগ্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হোক, নতুন গতি সঞ্চার হোক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ