খুলনা | সোমবার | ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

খুলনায় একের পর এক খুন : আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি করুন

|
১১:৫০ পি.এম | ০১ নভেম্বর ২০২৬


শিল্পনগরী খুলনায় খুনোখুনি যেন থামছেই না। চলতি বছরের জুন মাসে সংবাদপত্রে দুই পর্বে খুলনার অপরাধজগতের অন্দরমহল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে উঠে এসেছিল প্রকাশ্যে খুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে উল্লাসের সংবাদও। আমরা আশা করেছিলাম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খুলনার এই আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। উল্টো দেখা যাচ্ছে, পুলিশের সদস্যদের সুরক্ষার জন্য রাতে একাকী চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়েছে খুলনায়। 
খুলনার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আমরা নিশ্চিত যে পরিস্থিতির উন্নতি তো হয়নি, উল্টো অবনতি হচ্ছে। প্রকাশ্যে গুলি, কুপিয়ে হত্যা, রাজনৈতিক আশ্রয়ে ভূমি দখল এবং লাগামহীন চাঁদাবাজি শহরটির সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম আতঙ্কের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ১০ মাসে খুলনা জেলা ও মহানগরে ৭১ জন খুন হয়েছেন, ৬৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। খুলনায় গড়ে প্রতি চার দিনে একটি করে হত্যা মামলা দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ ভঙ্গুরতাকেই প্রকাশ করছে।
প্রতিবেদনে খুলনার অপরাধজগতের এক বহুমাত্রিক সিন্ডিকেটের সংবাদ উঠে এসেছে। অন্তত ৯টি চিহ্নিত সন্ত্রাসী দল এখন গোটা শহর ও আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণে বেপরোয়া প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে। খুলনায় মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সীমান্ত পথে আসছে অবৈধ অস্ত্র। এসব হত্যাকান্ডের সঙ্গে মাদকের কারবার ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ জড়িত বলে মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর একশ্রেণির প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ছায়াতলে নতুন করে আবারও সক্রিয় হয়েছে এই গোষ্ঠীগুলো। এই চক্রগুলো তাদের রাজনৈতিক শক্তি বিদ্যমান প্রশাসনিক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে পুরো জেলাকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রেখেছে। সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্কুলছাত্রী বা পথচারী কেউই আজ নিরাপদ নন।
খুলনার এই সংকটকে দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির একটি নমুনা বলে মনে করি। কিন্তু গণমাধ্যমে এত অনুসন্ধানীমূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া সত্তে¡ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ ও তার বাস্তবায়ন দেখতে না পাওয়া হতাশাজনক। আমরা মনে করি, দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়াকে তোয়াক্কা না করে অবিলম্বে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অপরাধী গ্র“পগুলোর সদস্যদের গ্রেফতার করতে হবে। সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ অস্ত্রের রুট বন্ধ করা এবং খুলনায় ছড়িয়ে থাকা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদকের অবৈধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করতে হবে। প্রতিটি হত্যাকান্ডের নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যেন পেশাদার অপরাধীরা বিচারব্যবস্থার ফাঁক গলে বেরিয়ে আসার সুযোগ না পায়।
যদি কোনো রাজনৈতিক নেতার ছত্রচ্ছায়ায় এই গ্র“পগুলো থাকে, তাহলে তাঁকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। সর্বোপরি পুলিশ বাহিনীকে সক্রিয় ও কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই। দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশকেও আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। পুলিশের মনোবল বৃদ্ধি ও জনগণের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের কথাও ভাবতে হবে।
নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। একটা রাষ্ট্রে একটা শহর এভাবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অভয়ারণ্য হয়ে থাকবে, যেখানে প্রকাশ্যেই সন্ত্রাসীরা প্রচারণাও চালাবে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অবিলম্বে উপযুক্ত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে খুলনার শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হবে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ