খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ২১ কার্তিক ১৪৩৩

মোংলা বন্দরের ঐতিহাসিক রূপান্তর: ৪ হাজার কোটির মেগা প্রকল্প উদ্বোধন

মাহমুদ হাসান, মোংলা |
০৩:৪১ পি.এম | ০৫ নভেম্বর ২০২৬


মোংলা সমুদ্র বন্দর থেকে দেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল ও বেগবান করতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুব অল্প দিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ সুবিধার পাশাপাশি মোংলা বন্দরের শিল্প-কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। মোংলা বন্দরের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার একটি বড় মেগা প্রকল্পের ভিক্তিপ্রস্তুর স্থাপন জেটি নির্মান কাজের উদ্বোধন করা হলো। বন্দর, ইকোনমিক জোন, ইপিজেড আর শিল্প কলকারকানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ করতে পারলেই পাল্টে যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্র।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে আজ এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের সূচনা হলো। উপকূলীয় ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিপ্রবাহকে দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ নামের মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বন্দরভিত্তিক শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দৃঢ় ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই অঞ্চলের প্রতিটি কলকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা হবে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল ১০টায় হেলিকপ্টারযোগে মোংলা বন্দর এলাকায় পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী এক ব্যস্ততম ও প্রাণবন্ত কর্মদিবসের সূচনা করেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের ৯ নম্বর জেটিতে আয়োজিত এই সুধী সমাবেশ ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরে পুরো উপকূলীয় অঞ্চলে এক অভূতপূর্ব উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীকে এক নজর দেখার জন্য সেই সকাল থেকে মোংলা-খুলনা মহাসড়কে ভিড় করে। সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে প্রমানমন্ত্রীকে স্বাগত জানায় মোংলা-রামপালের লাখো নারী-পুরুষ।

প্রধানমন্ত্রী প্রথমে বন্দরের আধুনিকায়নের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ কর্তৃপক্ষ এবং বৈশ্বিক অবকাঠামো জায়ান্ট চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) চেয়ারম্যানের মধ্যে এই সমোজতা স্বারক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, মানসম্মত নির্মাণশৈলী এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার নিশ্চয়তা মিলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন বন্দরের ব্যাবসায়ী, আমদানি-রফতানিকারক সহ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা।

চার বছর মেয়াদি এই বড় মেগা প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পের অধীনে বাস্তবায়িত মূল অবকাঠামোগত উপাদানগুলো হলো-দুটি আধুনিক জেটি নির্মাণ। আন্তর্জাতিক মানের কন্টেইনারবাহী জলযান ভেড়ানোর উপযোগী দুটি দীর্ঘ জেটি নির্মান হলে বিদেশ থেকে আসা পন্যবাহী কন্টেইনার খালাস ও সংরক্ষন করা হবে নির্মানাধীন এই নতুন জেটিতে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মান করা হবে প্রশস্ত কন্টেইনার ইয়ার্ড, দ্রুত পণ্য খালাস ও ট্রানজিট নিশ্চিত করতে আধুনিক ইয়ার্ড নির্মান করা হলে সেই ইয়ার্ডে রক্ষণাবেক্ষন করা হবে দীর্ঘ মেয়াদি পন্য বোঝাই কন্টেইনার। এছাড়াও করা হবে বিপদপ্রবণ পণ্য সংরক্ষণ জোন, কেমিক্যাল বা বিপজ্জনক পণ্য সম্পূর্ণ নিরাপদে ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা ও সুরক্ষিত পৃথক ইয়ার্ড নির্মান করা হবে। বন্দরের কার্যক্রমের সুবিধার্থে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হবে। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়াতে ক্রেন সহ মোট ৪৯টি ভারী ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন ও সংরক্ষন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্রিুতি অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে মোংলা বন্দর ও এর আশেপাশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে গ্যাসের অনুপস্থিতি শিল্পায়নের গতি কিছুটা মন্থর করে রেখেছিল। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে এই সংকট নিরসনে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানান, মোংলা থেকে দেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত করিডোরভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে টিকিয়ে রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। মোংলা বন্দরের শিল্প কলকারখানায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্যাস সংযোগ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে অবকাঠামোগত কাজের নকশা চূড়ান্ত করেছে। এর ফলে ভারী শিল্প, হিমায়িত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট, এবং নবনির্মিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ব্যাবসায়ীদের উৎপাদন ব্যয় অনেকাংশে কমে আসবে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বন্দরটির অপারেশনাল সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। বন্দরের জন্য কন্টেইনার খালাসও বোঝাইয়ের জন্য অত্যাধুনিক ক্রেন ক্রয় করা হলে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৩০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। যাতে আমরা বছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা উন্নীত হবে ৪ লাখ টিইইউজে। এছাড়া ব্যাবসাযীদের বন্দরের পণ্য পরিবহন, খালাস ও সংরক্ষণ ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসবে। এর ফলে এখানকার আমদানি-রফতানিকৃত পন্য মোংলা বন্দর থেকে সরাসরি পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন প্রতিষ্ঠিত হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও সরকারের নীতি ও প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন। অন্যান্যের মধ্যে অংশ নেন-নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মোঃ রাজিব আহসান, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বক্তব্য রাখেন। এছাড়া সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন ফারুক, বাগেরহাট সদর আসনের সংসদ সদস্য শেখ মনজুরুল হক রাহাদ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ মশিউর রহমান খান, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সহ এছাড়াও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধি, শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা এবং সামরিক-বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মোংলা বন্দরের এই আধুনিকায়ন এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিতকরণ কেবল বাগেরহাট বা খুলনা অঞ্চলের জন্য নয়, বরং গোটা জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি গেম-চেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এই অঞ্চলে। বিশেষ করে শিপিং ইন্ডাস্ট্রি, সিএন্ডএফ এজেন্ট, পরিবহণ খাত (মাহিন্দ্র, ইজিবাইক ও ভারী ট্রাক অ্যাসোসিয়েশন) এবং স্থানীয় আবাসন ও বাণিজ্যিক খাত চাঙ্গা হয়ে উঠবে।
মোংলা বন্দরের ঐতিহাসিক এই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও সুধী সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার কাটাখালী মোড় এলাকায় একটি সংক্ষিপ্ত পথসভায় যোগ দেয়ার কথা রয়েছে। সফরসূচি অনুযায়ী, দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর বাগেরহাট খানজাহান আলী মাজারে পৌঁছান। খানজাহান আলী মাজারেজিয়ারত শেষে দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে সড়কপথে খুলনার উদ্দেশে রওনা হয়ে বিকালে তিনি খুলনার শিশু কিশোরদের এক অনুষ্ঠানের যোগ দিবেন কলে জানিয়েছে তার সফর সঙ্গীরা। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ