খুলনা | শনিবার | ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

জিয়া তুমি মিশে আছো ধানের শীষে, কোটি হৃদয়ের বিশ্বাসে!

অ্যাড. এম. মাফতুন আহমেদ |
১২:০০ এ.এম | ০৭ নভেম্বর ২০২৬


৭ নভেম্বর ইংরেজি ১৯৭৫ সাল। রাজধানী ঢাকার আকাশে হঠাৎ কালো মেঘ। জনমনে আতঙ্ক। গোটা দেশ যেন শকুনের ছায়ায় আচ্ছাদিত। আবার কী হতে যাচ্ছে? রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা সত্যিই কী বিপন্ন হবে? ’৭১-এর দেশ স্বাধীন হয়েছিল বটে; আবার কী পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে। শেষমেষ এদেশ কী সিকিম হবে? সর্বত্রই আধিপত্যবাদের পদধ্বনী।
এগিয়ে এলেন একদল সিপাহী-জনতা। জনতার অগ্র সারিতে শহিদ  প্রেসিডেন্ট জিয়া। হঠাৎ আকাশে-বাতাসে এক গগণ বিদারী শ্লোগান। “নারায়ে তকবির আল্লাহ আকবর। জিয়া তুমি এগিয়ে চলো আমরা আছি তোমার সাথে”। স্বাধীনতা সুরক্ষায়, সর্বোপরি বিদেশী আগ্রাসন মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে দেশপ্রেমিক জনতা জিয়ার নেতৃত্বে সেদিন ঝাপিয়ে পড়েছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এ দেশের জাতীয় স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেদিন ছিল শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার আপোষহীন ভূমিকা। যা ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয়। আজকের এই প্রজন্মের কাছে এ এসব অজানা ইতিহাস। জাতিকে জানান দেব অন্য একদিন। ফিরে আসি সংক্ষিপ্ত প্রতিপাদ্য বিষয়ে।
বাংলাদেশের পঁচাত্তর-পরবর্তী জাতীয় ইতিহাসে ৭ নভেম্বর কেবল একটি কালপঞ্জির তারিখ নয়, এটি ছিল সংঘাত, অনিশ্চয়তা এবং অরাজকতার অন্ধকার থেকে বের হয়ে স্বকীয়তা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব পুনরুজ্জীবনের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা একটি জাতির গতিপথ বদলে দেয়; ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের “সিপাহী-জনতার বিপ্লব” ঠিক তেমনি এক মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা।
আর এই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রাণকেন্দ্রে এবং পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক পূনর্গঠনের শীর্ষে যিনি আত্মপ্রকাশ করেছিলেন, তিনি হলেন দূরদর্শী সেনাপতি ও রাষ্ট্রনায়ক শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
সংকটময় পটভূমি ও সিপাহী-জনতার ঐক্য : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবং বিশেষ করে ৩রা নভেম্বরের ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানের ফলে দেশে এক চরম অস্থিতিশীল ও সার্বভৌমত্ব-সংকটের আবহাওয়া তৈরি হয়। রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে চরম  সেনাবিদ্রোহ, নেতৃত্বের শূন্যতা এবং সাধারণ মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছিল। সেনাপ্রধান হিসেবে তৎকালীন মেজর  জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়।
এমন এক চরম সংকটময় মুহূর্তে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে সাধারণ সিপাহী ও রাজপথের মানুষের ঐক্যবদ্ধ গণজাগরণ ঘটে। ক্যান্টনমেন্টের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে জিয়াউর রহমানকে সাধারণ জওয়ানরা কাঁধে তুলে নেন। স্বরচিত সংক্ষিপ্ত একটি কবিতা আলোচ্য কলমে না লিখলে নয়।
৭ নভেম্বর: শহিদ জিয়ার ডাক : ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবে জেগেছিল দেশ, স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া আনলো নতুন বাংলাদেশ।
বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফুটলো মুক্তির ফুল, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে ভাঙলো পরাধীনতার ভুল। কৃষি-শিল্পে জাগলো স্বপ্ন, গ্রাম সরকারের গান, যুব সমাজে জিয়ার আদর্শ আজও অম্লান। স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়বো জিয়ার চেতনায়, ৭ নভেম্বর বাঁচবে চিরদিন বীরের প্রেরণায়।
তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সাধারণ মানুষের দেশপ্রেমিক আকুলতা এক বিন্দুতে মিলে গিয়েছিল সেদিন। সিপাহী ও জনগণনের সেই স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান কেবল একজন বীর সিপাহসালারকে বন্দীকে মুক্ত করেনি, বরং বহিরাগত প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ নৈরাজ্য থেকে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে রক্ষা করেছিল।
বন্দিদশা থেকে রাষ্ট্রনায়ক: জাতীয় সংহতির উত্থান : ৭ই নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান যখন দেশের হাল ধরেন, তখন তার সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল দু’টি: ভাঙাচোরা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রযন্ত্রের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং একটি অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতিকে নতুন আশা  দেখানো।
তিনি দ্রুতই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, একটি বিভক্ত জাতি কখনো উন্নতি করতে পারে না। ফলে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন দূর করতে “জাতীয় সংহতি” ও “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”-এর কালজয়ী দর্শন প্রদান করেন। বাংলাদেশের  ভৌগোলিক পরিচয়, নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃৃতির ওপর ভিত্তি করে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠী নির্বিশেষে এক ছাতার নিচে আনার এই রাষ্ট্রচিন্তা ছিল অত্যন্ত যুগোপযোগী।
দূরদর্শী দেশপ্রেম ও আত্মনির্ভরশীলতার বিল্পব : একজন খাঁটি দেশপ্রেমিকের মূল পরিচয় মেলে তাঁর মেধা, কর্ম এবং দূরদর্শিতায়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যে বীরত্বের সূচনা করেছিলেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান দেখালেন তাঁর দূরদর্শী উন্নয়ন  কৌশল।
০১. উৎপাদন ও স্বনির্ভরতার রাজনীতি: তিনি অনুধাবন করেছিলেন, অন্যের অনুদানের ওপর নির্ভর করে কখনো জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা যায় না। তাই তিনি খাল খনন কর্মসূচি, কৃষি বিপ্লব, শিল্পকারখানা চালু এবং ‘১৯ দফা’ কর্মসূচির মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
০২. আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান: জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির কারণে বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্ব, এশীয় প্রতিবেশী এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও শান্তির প্রতীক হিসেবে ‘সার্ক’ (ঝঅঅজঈ) গঠনের যে অনন্য চিন্তাধারা তিনি প্রথম উত্থাপন করেছিলেন, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাংলাদেশকে এক নতুন মর্যাদায় ভূষিত করে।
০৩. বহুদলীয় গণতন্ত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্মেষ: একদলীয় শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ ঘটান তিনি। সকল মত ও পথের রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করে দিয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিকে প্রাণবন্ত করে  তোলেন।
৭ নভেম্বর ও জিয়াউর রহমান : আজকের বাংলাদেশ যখন আবারও বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নীতি-নৈতিকতার অভাব এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন ৭ নভেম্বরের মূল বার্তাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ৭ নভেম্বর আমাদের শেখায় ঐক্যবদ্ধ জনতাই একটি দেশের স্বাধীনতার রক্ষাকবচ।
আর জিয়াউর রহমানের জীবন ও কর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়  যে, সত্যিকারের দেশপ্রেম মানে কেবল পেন্টাগান বা ক্ষমতা নয়;  দেশপ্রেম হলো নিজের জীবনকে বাজি রেখে কঠিনতম মুহূর্তে দেশের পাশে দাঁড়ানো, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা অর্জন করা এবং জাতীয় পতাকাকে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে তুলে ধরা।
উপসংহার : ৭ নভেম্বর এবং বীর উত্তম জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যতদিন মানচিত্রে বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার এই দিনটি  প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। এক চরম সংকটে সিপাহী-জনতার ঐক্য থেকে উৎসারিত সেই রাষ্ট্রনায়কের দেশপ্রেমের শিক্ষা আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছেও এক আলোকবর্তিকা যা আমাদের প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয়: “আগে দেশ, পরে নীতি বা দল”। 
লেখক : আইনজীবী ও সম্পাদক আজাদ বার্তা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ