খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৩ এপ্রিল ২০২৫ | ১৯ চৈত্র ১৪৩১

শিশুর ঘুমের মধ্যে কোন আচরণগত সমস্যা, হতে পারে তা প্যারাসমনিয়া

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিজ্ঞানী |
০১:২১ এ.এম | ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২২


ঘটনা-১, শিরিণ (ছদ্ম নাম) বয়স ৭ বছর। ইদানিং তার নিদ্রা কালে আচরণে বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রায় রাতে সে ঘুমের মধ্যে বিছানায় স্বপ্ন দেখে প্রস্রাব করে ফেলে। ঘুমের মধ্যে সে জোরে জোরে দাঁত কিড়মিড় করে থাকে। ঘুমানো অবস্থায় কখনো কখনো সে দুঃস্বপ্ন দেখে কেঁদেও ফেলে।
ঘটনা-২, সাদমান (ছদ্ম নাম) বয়স ৮ বছর। তার নিদ্রাজনীত সমস্যা থাকার কারণে ঘুমের সময় আচরণে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। সে প্রায় ঘুমের মধ্যে চমকে উঠে। সে ঘুমের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে কথা বলতে থাকে। মাঝে মধ্যে রাত্রে ঘুমের মধ্যে তার পায়ে খিল ধরে যায়।
উপরের ঘটনা দু’টির বিশ্লেষণ ভিত্তিক বিবিরণ শিশুর ঘুমগত আচরণজনীত সমস্যাকে নির্দেশ করে- যাকে প্যারাসমনিয়া হিসেবে অভিহিত করা হয়। প্যারাসমনিয়া হলো শিশুর ঘুমের সময় আচরণগত সমস্যা যেখানে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র অনিয়ন্ত্রিত ভাবে কাজ করে। প্যারাসমনিয়ার কারণে শিশুর বাধাহীন রূপে ঘুমাতে সমস্যা হয়। আর নিরবিচ্ছিন্ন ঘুমের অভাবে শিশুর মধ্যে মানসিক বিকাশ ও আচরণগত ভাব ধারায় নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়।
প্যারাসমনিয়ার লক্ষণ সমূহ : (১) শিশু ঘুমের মধ্যে চমকে উঠতে পারে। (২) ঘুমের মধ্যে সে প্রায় সময় কথা বলতে পারে। (৩) ঘুমের মধ্যে শিশুর পায়ে খিল ধরে যেতে পারে। (৪) শিশুর মধ্যে ছন্দোবদ্ধ অঙ্গ সঞ্চালনমূলক বিকৃতি [যেমন- ঘুমের মধ্যে মাথা ক‚টা, শরীর দোলানো।] দেখা দিতে পারে। (৫) অনেক সময় শিশু নিদ্রাকালীন আতঙ্কগ্রস্ত হয় এবং বাবা মাকে চিনতে সমস্যা হয়। (৬) শিশু ঘুমের ঘোরে হাটতে পারে। (৭) কখনো কখনো শিশু ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখে এবং কেঁদে ফেলতে পারে। (৮) শিশুর মধ্যে চক্ষু সঞ্চালনমূলক আচরণ বিকৃতি দেখা দিতে পারে। (৯) ঘুমের মধ্যে কখনো কখনো দাঁত কিড়মিড় করতে পারে। (১০) অনেক সময় শিশু রাত্রে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে বিছানায় প্রস্রাব করে ফেলতে পারে। কোন কোন শিশুর মধ্যে উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য সমূহের একটি একক ভাবে বা একাধিক সমন্বিত ভাবে উপস্থিত থাকতে পারে।
প্যারাসমনিয়ার কারণ সমূহ : (১) বিভিন্ন মানসিক সমস্যাজনীত কারণ : শিশুর মধ্যে সীমিত পরিসরে বিষণœতা, পারিবরিক বা সামাজিক অথবা বিদ্যালয় সংক্রান্ত বিভিন্ন মানসিক চাপের কারণে অথবা কোন মানসিক ট্রমার কারণেও অনেক সময় নিদ্রাকালীন আচরণে অস¦ভাবিকতা দেখা দেয়। (২) ঘুমের অসম্পূর্ণতাজনীত কারণ : অপরিপূর্ণ ঘুমের কারণে অনেক সময় শিশুর মধ্যে প্যারাসমনিয়াজনীত আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। (৩) ঔষধ ব্যবহারজনীত কারণ : অনেক সময়ে শিশুর উপর বিভিন্ন গ্র“পের ঔষধ ব্যবহারজনীত কারণে অস্থায়ীভাবে ঘুমের মধ্যে আচরণগত সমস্যা হিসেবে প্যারাসমনিয়া দেখা দিতে পারে। (৪) স্বাস্থ্যগত কারণ : বিভিন্ন প্রকার স্বাস্থ্যগত সমস্যা যেমন- জ্বর, শারীরিক দুর্বলতা জনীত কারণে অনেক সময়ে শিশুর মধ্যে প্যারাসমনিয়াজনীত সমস্যা দেখা দিতে পারে। (৫) ভাইরাসজনীত রোগ : ভাইরাসজনীত রোগ যেমন- এনসেফালাইটিস, মেনিনজাইটিস ইত্যাদির কারণে অনেক সময় এ প্রকার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
প্যারাসমনিয়ার চিকিৎসা : (১) নির্ভেজাল ঘুমের সিডিউল অনুসরণ করা : যেহেতু ঘুমের সাথে প্যারাসমনিয়া ওৎপ্রতো ভাবে জড়িত, সে জন্য শিশুর প্রতিদিন রুটিন করে কমপক্ষে ৭ থেকে ৮ ঘন্টা ঘুমানোর প্রয়োজন। এ জন্য প্রয়োজনে টিভি এবং অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রের ব্যবহার কমানো, ঘুমের কক্ষটিকে পর্যাপ্ত ঠান্ডা রাখা, ক্যাফেইন কে বর্জন করা, ঘুমের কক্ষটিকে প্রয়োজনে কোলাহলমুক্ত রাখা যেতে পারে এবং প্রতিদিন নিয়ম করে ঘুম এবং জাগরণের সময়কে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। (২) জ্ঞানীয় আচরণগত কৌশলের ব্যবহার : প্যারাসমনিয়ার অতি সাধারণ এবং জরুরি চিকিৎসা পদ্ধতি হলো জ্ঞানীয় আচরণগত কৌশলের ব্যবহার। যেহেতু প্যারাসমনিয়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুর মানসিক অসুস্থতাজনীত আচরণ জড়িত থাকে, সে কারণে জ্ঞানীয় আচরণগত কৌশলের ব্যবহারের মাধ্যমে প্যারাসমনিয়ার চিকিৎসা করা সম্ভব।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ , খুলনা।

্রিন্ট

আরও সংবদ

অন্যান্য

প্রায় ৩ মাস আগে