খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৬ মে ২০২২ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

ডাক্তারদের ‘কসাই’ দুর্নাম ঘোচাতে দৃঢ় সংকল্প

মায়ের স্বপ্নকে প্রাধান্য দিয়ে তিন মাস অক্লান্ত পরিশ্রমে মেডিকেলে দেশসেরা খুলনার মীম

মোহাম্মদ মিলন |
১২:৫৮ এ.এম | ০৬ এপ্রিল ২০২২


ছোট থেকে ভালো ছাত্রী ছিল। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত একাই লেখাপড়া করেছে। মাঝে মধ্যে মায়ের সহযোগিতা নিয়েছেন। পঞ্চম শ্রেণি ও ৮ম শ্রেণিতে উপজেলায় প্রথম হয়েছে। এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। স্বপ্ন ছিল ইঞ্জিনিয়ার হবে। তবে মায়ের স্বপ্ন ছিল ভিন্ন। মায়ের ইচ্ছা ছিল তার  মেয়ে একদিন ভালো চিকিৎসক হবে। মায়ের স্বপ্নকে প্রাধান্য দিয়ে তিন মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। নিজের প্রচেষ্টা, মা-বাবা দোয়া ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় খুলনার সুমাইয়া মোসলেম মীম এখন মেডিকেল পরীক্ষায় দেশসেরা। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে এমনটাই জানালেন সুমাইয়া মোসলেম মীম, তার মা খাদেজা খাতুন ও বাবা মোসলেম উদ্দিন সরদার।  
মঙ্গলবার দুপুরে প্রকাশিত ফলাফল ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে,  সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের এমবিবিএস প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন খুলনার সুমাইয়া  মোসলেম মীম (১৮)। তিনি খুলনা মেডিকেল কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়েছেন। লিখিত পরীক্ষায় ৯২ দশমিক ৫ নম্বর পেয়েছেন মীম। সব মিলিয়ে তার মোট প্রাপ্ত নম্বর ২৯২ দশমিক ৫। দুই বোনের মধ্যে মীম ছোট। বাবা মোসলেম উদ্দিন সরদার ডুমুরিয়া কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সরকারি অধ্যাপক এবং মা খাদেজা খাতুন যশোরের কেশবপুর পাজিয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ফার্মাসিস্ট পদে কর্মরত। বড় বোন সাবিহা মোসলেম বৃষ্টি। মীমের লেখাপড়ার জন্য দুই বছর তারা খুলনার মৌলভীপাড়ায় ১৪ টিবি বাউন্ডারি রোডে বসবাস করছেন।
মেডিকেল পরীক্ষায় দেশসেরা সুমাইয়া মোসলেম মীম বলেন, আলহামদুলিল­াহ আল­াহতালার রহমত ও কৃপার কারণে আজ আমার এই অবস্থান। অবশ্য এতো বেশি প্রত্যাশা আমার ছিল না। তারপরও আল­াহ আমাকে দিয়েছেন। এই সফলতার পিছনে প্রথমেই আমার আব্বু-আম্মুর অবদান রয়েছে। আমাদের গ্রামের বাড়ি ডুমুরিয়া। খুলনা শহরে এসে থাকি। তারা আব্বু-আম্মু দু’জনে চাকুরি করে। এখান থেকে যেয়ে কাজ করতে হয়েছে। আমার জন্য দুইটা বছর প্রচুর কষ্ট করতে হয়েছে তাদের। বিশেষ করে আমার আম্মুর কথা বলবো। তাকে অনেক কষ্ট করে যশোরের কেশবপুরে যেতে হয় চাকরী করতে। আমার জন্য আম্মু হাসিমুখে সব কষ্ট সহ্য করেছেন। যাতে আমি একটু ভালো করি। আজ তাদের মুখে হাসি দেখতে পারছি এটা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রাপ্তি। 
নিজের স্বপ্নের বিষয়ে মীম বলেন, ছোট বেলা থেকে ডাক্তার হবো এমন কোন আশা আমার ছিল না। শুধুমাত্র আম্মুর জন্য ডাক্তারী পেশায় আসা। আর যেহেতু এতো ভালোভাবে এই জায়গাতে আসতে পেরেছি, সেটা অনেক বেশি ভালো লাগার একটা বিষয়। আমার সাফল্যের জন্য আম্মুর অবদান সবচেয়ে বেশি। পরীক্ষার পর থেকে এখন পর্যন্ত টেনশনে তার মুখে আমি হাসি দেখিনি। যেহেতু আমি পরীক্ষা দিয়ে বলেছিলাম আমার পরীক্ষা ভালো হয়নি। 
মীম বলেন, ডাক্তার সিয়াম ভাইয়া আমাকে লেখাপড়ার বিষয়ে গাইড করেছেন। ছোট বেলা থেকে শিক্ষকদের অবদান অনেক বেশি ছিল। শিক্ষকরা আমাকে অনেক বেশি সাপোর্ট করেছেন। সকলের দোয়ায় আজকে আমার এই অবস্থান। ৫ম শ্রেণিতে আমার প্রথম শিক্ষক সামছুর রহমান বলতেন আমি ভালো কিছু করতে পারবো। তার কথা ও মর্যাদা রাখতে পেরেছি সেটা আমার ভালো লাগার একটা জায়গা। 
তিনি বলেন, আমি ডুমুরিয়ার মেয়ে। ডুমুরিয়া গলফ গার্লস মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং খুলনা নগরীর সরকারি এম এম সিটি কলেজে আমি লেখাপগা করেছি। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছি। 
মেডিকেল ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বুঝে পড়তে হবে। যেটাই পড়তে হবে কনসেপ্টটা ক্লিয়ার করে পড়তে হবে। যেটা আমি করেছি। মেডিকেলে সবাই ভাবে যে মুখস্ত করতে হবে। কিন্তু মুখস্ত করার চেয়ে জরুরি বুঝে পড়া। আজকে মুখস্ত করছি, কাল আর মনে থাকছে না। এমন হতে পারে। কিন্তু বুঝে পড়লে সফলতা পাওয়া যায়। আমার অনুজদের প্রতি পরামর্শ থাকবে তোমরা যেটুকু পড়বা বুঝে পড়বা, কেন পড়ছো কি পড়তেছো সেটা বুঝতে হবে। 
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে মীম বলেন, একজন ভালো ডাক্তার হওয়া, সবার প্রথম ভালো মানুষ হওয়া। যাতে মানুষের সেবা করতে পারি। যেহেতু সেবামূলক পেশায় যাচ্ছি, সেই সেবাটা যেন করতে পারি। তিনি বলেন, আমাদের দেশে একটা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে ডাক্তাররা কসাই, সেই ব্যাপারটা থেকে যেন একটু বের করে আনা যায়। সেটাই চেষ্টা করবো। 
মীম বলেন, আমার আব্বু কলেজের শিক্ষক এবং আম্মু স্বাস্থ্যবিভাগে চাকুরি করেন। আমরা দুই বোন। আমার আম্মুর ইচ্ছা ছিল দুই বোনের মধ্যে একজন ডাক্তার হবে। কিন্তু আপুর ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। ফলে আমার প্রতি তার ইচ্ছা ছিল যে ডাক্তার বানাতেই হবে। তার স্বপ্ন পূরণে আমি ডাক্তারী পেশাকে স্বপ্ন হিসেবে বেছে নিয়েছি।     
মীমের বাবা মোসলেম উদ্দিন সরদার বলেন, আল­াহর অশেষ রহমতে গ্রাম থেকে উঠে আসা আমার মেয়ে আজ দেশসেরা হয়েছে। ডুমুরিয়ায় আমার গ্রাম। সেখান থেকে নগরীতে এসে কোচিং করিয়েছি। ডিএমসি স্কলার কোচিংয়ে ডাক্তার সিয়ামের তত্ত¡াবধায়নে সে লেখাপড়া করে। এছাড়া দু-একটি কোচিংয়ে সে পরীক্ষা দিয়েছে। একমাত্র ডিএমসি স্কলার কোচিংয়ের শিক্ষকদের প্রচেষ্টায় ভালো ফলাফল করেছে। 
তিনি বলেন, ছোট্টগ্রাম থেকে এসে শহরে থেকে মেয়ে এতো সুন্দর রেজাল্ট করেছে এ জন্য আল­াহর অশেষ রহমত। আমি জানতাম ভালো করবে, তবে এতো ভালো ফলাফল করবে সেই প্রত্যাশা করিনি। সে প্রথম থেকেই ভালো রেজাল্ট করেছে। এই সফলতার পিছনে তার মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। তার মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল আজ আমার মেয়ে মেডিকেল পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে। 
কেশবপুর পাজিয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ফার্মাসিস্ট মোসা. খাদেজা খাতুন বলেন, আমার স্বপ্ন ছিল দুই মেয়ের একজন ডাক্তার হবে। বড় মেয়ে হতে পারেনি। ছোট মেয়ে মীম ম্যাথ এবং ফিজিক্সে অনেক ভালো। তার স্বপ্ন ছিল ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু আমার ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হোক। আমি মোডিফাই করার চেষ্টা করি। কিন্তু তখনও হয়নি। তবে আমার মেডিকেল অফিসার বলতেন ইঞ্জিনিয়ারিং করে কি করবে। তার এবং ডা. সিয়াম স্যারের পরামর্শে তাকে কোচিং করানো হয়। তিন মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে আজ সে প্রথম হয়েছে।  
মীমে মা আরও বলেন, আমার প্রত্যাশা মেয়ে ভালো মানুষ হবে। ডাক্তার হয়ে অসহায় মানুষের পাশে থাকা। কয়েকদিন ধরে রাতে ঘুমাতে পারিনি। আল­াহর কাছে প্রার্থনা করেছি যেন ভালো ফলাফল করে। সকলের আশা মীম ভালো করবে। ভয় করতো যদি পিছলে যায়। আল­াহ আমার ডাক শুনেছে। আমার মেয়ে যেন অনেকভালো মানুষ হতে পারে, সমাজের গরীব-দুঃখীর পাশে দাঁড়াতে পারে। 
ডিএমসি স্কলার কোচিংয়ের পরিচালক ডাঃ সিয়াম বলেন, একজন শিক্ষার্থী যদি ভালো ফলাফল করে সেটি আমাদের গর্বের বিষয়। আর যদি সেটা দেশে প্রথম হয়। এর আগেও ২০১৮ সালে আমাদের শিক্ষার্থী প্রথম হয়েছিল। ২০১৭ সালে লিখিত পরীক্ষায় আমাদের প্রথম হয়েছিল। গত সাত বছরে আমাদের তিনবার প্রথম হয়েছে। এটা আমাদের কাছে গর্বের বিষয়।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ