খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৬ মে ২০২২ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

আধ্যাত্মিক সাধক পরিবারের কন্যা আসমা আক্তার এখন ম্যাজিস্ট্রেট

তালা (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি |
১২:৪৭ এ.এম | ১১ মে ২০২২


৪০তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন আসমা। অভাবী বাবা লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে না পারলেও থেমে যাননি তিনি। টিউশনি করে লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন। দীর্ঘ পরিশ্রমের ফল পেয়ে পরিবারে এখন বইছে আনন্দের বন্যা। এলাকার মানুষ আসমাকে দেখতে ভীড় করছেন তা বাড়িতে।
কলারোয়া আধ্যাত্মিক সাধক পরিবারের কন্যা মোছাঃ আসমা আক্তার মিতা সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার কেরালকাতা ইউনিয়নের কিসতম ইলিশপুর গ্রামের প্রায়াত আধ্যাত্মিক সাধক শাহ সুফি মারফতি ফকির ফজলুল হকের পুতনি প্রতিষ্ঠিত আ’লীগ ও শহিদ পরিবারের সদস্য, আধ্যাত্মিক সাধক দরবেশ মুহাঃ মোতাহার হোসেন মন্ডল ও মোছাঃ ঝর্না খাতুন-এর ১ ছেলে ও ৩ মেয়ের মধ্য আসমা আক্তার মিতা দ্বিতীয় কন্যা। বড় ছেলে মোঃ ফয়সাল হোসেন দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করে এখন বাসের হেলপারি করেন। বড় মেয়ে রেশমা আক্তার লতা ঢাকা বিশ^াবিদ্যালয় বাংলা অনার্স শেষ ১৫ সালে মাস্টার্স পাস করে চাকুরি প্রতাশী আছেন। ছোট মেয়ে শামিমা আক্তার নিপা দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। আর মেঝে মেয়ে  আসমা আক্তার নিপা ৪০ তম বিসিএস এ প্রশাসন বিভাগ মেধা ক্রমে ৬০ উত্তীর্ণ হয়ে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছেন। 
মোছাঃ আসমা আক্তার মিতা স্থানীয় ২৩নং ইলিশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করে, কে কে ই পি সম্মিলিত মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে জিপিএ-৫ পেয়ে এস এস সি পাস করেন। ২০১২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) কলারোয়া কাজীর হাট কলেজ থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত হন। এর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৩.৫৯ এ অনার্স এবং একই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিপিএ- ৩.৬০ মাস্টার্স পাস করেন। তিনি এ বছর ৪০তম বিসিএস প্রশাসন বিভাগে মেধাক্রম ৬০ এ সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছেন।
মোছাঃ আসমা আক্তার মিতা সাধক পরিবারের সন্তান। পারিবারিক অসচ্ছলতা কে হার মানিয়ে এই সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। যেহেতু মারফতি সাধক অর্থ উপার্জনের পেছনে না ছুটে, ধর্ম প্রচারের কাজে সারাটা জীবন অতিবাহিত করে চলেছেন, যার জন্যই পারিবারিক অর্থনৈদিতক অসচ্ছলতা ছিল। অর্থ অভাবে টিউশনি পড়তে না পারলেও তার চাচা গোলাম হোসেন মাস্টার-এর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তার অদম্য ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। তাঁর জীবনে চাওয়া ছিল মানুষের মতো মানুষ হয়ে দেশ ও জাতির স্বার্থে মানবতার কল্যানে নিবেদিত হয়ে কাজ করার। তাই তো আল­াহর রহমতে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে তার। 
একান্ত সাক্ষাৎকারে আসমা আক্তার মিতার জীবনের গল্পের সময় বেরিয়েছে তার অনুভ‚তি ও ইচ্ছা গুলো, তার প্রিয় রং কালো, প্রিয় খাবার গরুর মাংস, অবসর সময়ে বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে ভালোবাসেন তিনি। তার এই সফলতার পিছনে পিতা-মাতা, চাচা, শিক্ষক, প্রতিবেশী, আত্মীয়রা অসাধারণ ভ‚মিকা পালন করছেন। কিন্তু সবচেয়ে অবদান রেখেছেন তার মরহুমা নানী জয়নুল বিবি। এই পরিবারটি সাধক পরিবার। কিন্তু বংশানুক্রমে আ’লীগ পরিবার। আসমা আক্তার এর বড় চাচা মরহুম মোঃ খাইবার হোসেন মাস্টার কলারোয়া উপজেলা আ’লীগের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন। এছাড়া তার চাচাতো ভাই শহিদ তোফায়েল হোসেন তুহিন ২০০২ সালে ২৬ জানুয়ারি বিএনপি’র বোমা হামলায় শহিদ হন। 
আসমা আক্তার মিতার এর প্রতিবেশী রুমা খাতুনসহ একাধিক ব্যক্তি জানান. আসমা আক্তার তাদের চোখের সামনে বড় হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই আসমা খুব মেধাবী ছিল, আসমার এমন সফলতায় এলাকায় মানুষ গর্বিত। আসমা আক্তার এর ১০৫ বছর বয়সী দাদী পরিষ্কার করে কথা বলতে না পারলেও তিনি ফিসফিস করে বলেন মিতা খুব ভালো করেছে সকলে দোয়া করবেন। 
আসমা আক্তার এর চাচা সাধক মোঃ জাকির হোসেন জানান, তাদের মেয়ে এলাকার সুনাম অর্জন করেছে। তারা সাধক পরিবার তাদের অর্থের প্রতি কোন মোহ নেই তাই মহান আল­াহর রহমতে তাদের মেয়ে আজ ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছে। তিনি সকলের নিকট দোয়া প্রার্থনা করেন।
ম্যাজিস্ট্রেট আসমা আক্তার মিতার পিতা সুফিবাদ তরিকার সাধক দরবেশ মুহাঃ মোতাহার হোসেন জানান, তারা ৬ ভাই এবং ২ বোন। বড় ভাই প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। মেঝ ভাই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পরিবারের ভাই, বোন, ভাইপো, বৌমা অধিকাংশ সবাই এমএ পাস। পরিবারের অন্যান্য ভাইদের আর্থিক ভাবে সচ্ছল থাকলেও আমি কখনও দুনিয়ার অর্থ সম্পদের দিকে ফিরে দেখেনি। তার পিতা ছিলেন প্রয়াত আধ্যাত্মিক সাধক। তিনি তার পিতার আদর্শ  অনুসরণ করে সারাটা জীবন মানব ধর্ম শ্রেষ্ঠ ধর্ম, আল­াহকে পেতে হলে আল­াহর সৃষ্টি জীবকে ভালোবাসতে হবে এই প্রচারে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছেন। কিন্তু আল­াহ তাআলা তার সন্তানকে ম্যাজিস্ট্রেট বানিয়ে যে সম্পদ দান করেছেন এটি একটি অমূল্য সম্পদ পেয়েছেন বলে দাবি করেন। 
তিনি আরও বলেন,তার পিতা এবং তিনি সারাজীবন মানবের কল্যাণ কামনা করেন তেমনি তার কন্যাও যেন দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত হয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারেন তার জন্য সকলের কাছে দোয়া কামনা করেন।
ম্যাজিস্ট্রেট আসমা আক্তার মিতা জানান, পিতা-মাতা, কাকা ও শিক্ষকদের অবদান স্বীকার করে বলেন, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিদিন ১৫-১৬ ঘন্টা লেখাপড়া করেছেন। পিতার অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল থাকলেও তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাইভেট পড়িয়ে উপার্জিত অর্থে নিজে লেখাপড়া করেছেন এবং মহান আল­াহ তায়ালার অশেষ রহমতে এই সফলতা অর্জন করেছেন। তিনি যেন কর্ম জীবনে নিজেকে সততার সাথে উৎসর্গ করে দেশের জন্য ও জনগনের কল্যানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন তার জন্য সকলের কাছে দোয়া কামনা করেন।
কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুলী বিশ^াস জানান, কলারোয়া উপজেলার ইলিশপুর গ্রামের মেধাবী ছাত্রী আসমা আক্তার ৪০তম বিসিএস এডমিন ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছেন তার প্রতি রইল উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুভ কামনা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ