খুলনা | শুক্রবার | ০১ জুলাই ২০২২ | ১৭ আষাঢ় ১৪২৯

অটিজম/ স্বতঃচিন্তনমূলক বিকৃতি!

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিজ্ঞানী |
০১:৫১ এ.এম | ২১ মে ২০২২


জেমস (ছদ্ম নাম) বয়স- ৩ বছর । সে মায়ের চোখের দিকে চোখ রেখে তাকায় না। মায়ের কোলে উঠার জন্য হাত বাড়ায় না। মা যখন জেমসকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে চায়, জেমস তাতে সাড়া দেয় না। মায়ের স্নেহ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারলে জেমস স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
তৃণা (ছদ্ম নাম) বয়স- ৫ বছর। সে আচরণে বেশ অনড়, অনমনীয়। নিয়ম মাফিক ও ধারাবাহিক কাজ করতে সে বেশ পছন্দ করে। পরিবেশ পরিবর্তন হলে সে নিজেকে মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত নয়। সে সীমিত কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কোন বিষয় বার বার প্রশ্ন করা তার স্বভাব।
উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য সমূহ স্বতঃচিন্তনমূলক (অটিজম) বিকৃতির লক্ষণ সমূহকে স্বাভাবিক ভাবে নির্দেশ করে থাকে। স্বতঃচিন্তনমূলক (অটিজম) বিকৃতি অতি শৈশবে দেখা যায় এবং জীবনের কয়েক সপ্তাহ মধ্যে শনাক্ত করা সম্ভব। সাধারণতঃ শহরের তুলনায় গ্রামে এ রোগে আক্রান্ত হার কম। তবে আশার কথা হলো এ প্রকার বিকৃতিতে অলিক প্রত্যক্ষণ ও ভ্রান্ত বিশ^াস থাকে না। কিছু একক ক্ষমতায় এরা বিরাট প্রতিভার স্বাক্ষরও রাখতে সক্ষম। সাধারণতঃ এরা বুদ্ধি অভীক্ষার কিছু কিছু ক্ষমতায় যেমন- বিমূর্ত চিন্তন, সাংকেতিক প্রক্রিয়া এবং যৌক্তিক পরম্পরায় খারাপ করে থাকে।
অটিজম চেনার উপায় : অটিস্টিক শিশু : (১) ছয় মাস বয়সে এরা মায়ের চোখের দিক তাকিয়ে হাসে না। (২) ১৬ মাস বয়সে একটি শব্দ দ্বারা বাক্য উচ্চারণ করতে পারে না। (৩) এরা সীমিত কাজ করতে আগ্রহী ও সীমিত কথা বলা এদের স্বভাব। (৫) এরা কোন কাজ পুনরাবৃত্তি করতে পছন্দ করে এবং ধারাবাহিক ভাবে কোন কাজ করতে ভুলে যায়। (৬) এরা কারোর চোখে চোখে রেখে তাকাতে পারে না। (৭) সামাজিক ভাবে এরা নিজেকে গুটায়ে বা লুুকিয়ে রাখতে পছন্দ করে। (৮) আদর করলে তার প্রতিদান দেয় না বা নিজেকে সরিয়ে নিতে পছন্দ করে। (৯) এরা অনড়, অনমনীয় এবং রুটিন মাফিক কাজ পছন্দ করে। (১০) এদের গড় বুদ্ধি তুলনামূলক কম এবং কারো কারোর মধ্যে মৃগী রোগের লক্ষণ দেখা যায়। (১১) এদের ভাষার বিকাশ ও তথ্য প্রক্রিয়া করণের গতি খুবই শ্লথ।
অটিস্টিক শিশুদের প্রচলিত সমস্যা সমূহ : এরা সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে এদের ভাষার বিকাশ দেরিতে হয়ে থাকে। আবার ভাষার অক্ষমতা এবং যোগাযোগ স্থাপনের অক্ষমতার কারণে তারা সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়ে। তাদের আচরণে বাধ্যতধর্মী চিন্তার অভ্যাস তথা নিয়ম মাফিক কাজের প্রবণতা বিদ্যমান। পরিবেশের কোন পরিবর্তন হলে অটিস্টিক শিশুরা মানুষিক ভাবে ভেঙে পড়ে। যেমন- যে পাত্রে প্রতিদিন দুধ খায়, তা বদলে অন্য কাপ দেওয়া হলে অথবা প্রতিদিন যে ভাবে জমা কাপড় সমূহ রাখে তার কোন পরিবর্তন হলে ভীষণ ভাবে রেগে যায় এবং মানুষিক ভাবে ভেঙে পড়ে।। এরা অপ্রাণীবাচক বস্তুর প্রতি সহজে বেশি আকৃষ্ট হয়। তাদের মধ্যে একই প্রকারের আচরণ সম্পাদনের প্রবণতা বিদ্যমান। তারা একই কাজে নিমগ্ন থাকার দরুণ বিভিন্ন উদ্দীপকের প্রতি মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হয়।
স্বতঃচিন্তনমূলক (অটিজম) বিকৃতির কারণ : (১) মানসিক কারণ : ব্রনোবেটেলহাইম (১৯৬৭০) তার এক গবেষণায় দেখতে পান যে, শৈশবের শিশুর প্রতি বাবা-মায়ের বঞ্ছনা অবহেলা অথবা উপহাসমূলক মনোভাব বা ক্ষেত্র বিশেষ নিগৃহীতমূলক চেতনা শিশুর মনের মধ্যে জগতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে। শিশু যখন লক্ষ্য করে যে, পিতা-মাতার প্রতিক্রিয়ার উপর শিশুর আচরণের কোন প্রভাব নেই। তখন শিশু সিদ্ধান্তে আসে যে পৃথিবী তার প্রতিক্রিয়ার উপর উদাসীন। সুতরাং তাকে একটা নিজস্ব জগৎ গড়ে তুলতে হবে এবং সেই মোতাবেক চিন্তার তথা কল্পনার রাজ্যে নিজস্ব একটি বলয় তৈরি করে। বঞ্চনার থেকে মুক্তি পেতে নিজস্ব জগতে বিচরণ করে শিশু আত্মকেন্দ্রীকতায় নিমগ্ন হয় এবং সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। (২) বংশগত উপাদান : গবেষণায় দেখা গেছে যে এরূপ বিকৃতির জন্য বংশগতির ভূমিকা অনন্য। গবেষণায় আরো দেখা গেছে যে, ভাই-বোনদের মধ্যে কোন একজনের এ বিকৃতি থাকলে আরেক জনের মধ্যে এটি হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণ লোকের তুলনায় ৭৫ গুণ বেশি। অভিন্ন যমজদের একজনের মধ্যে এ প্রকার বিকৃতি থাকলে অন্যজনের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা ৬০% হতে ৯১%। পক্ষান্তরে যমজ ভাই-বোনদের মধ্যে এই বিকৃতির সহগমিতার হার ২০%। (৩) স্নায়বিক শর্ত : বিভিন্ন গবেষষায় দেখা গেছে যে এসব বিকৃতকারীদের লঘু মস্তিষ্কের কোন কোন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। স্বতঃচিন্তন বিকৃতকারীদের অনুস্মরণ করে দেখা গেছে যে, এদের মধ্যে ৩০% ভাগ শিশুর কৈশরে পদার্পণে মূর্ছা রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তাহা ছাড়া শিশু মাতৃগর্ভে থাকাকালীন মায়ের রুবেলা, মেনিঞ্জাইটিস, এনসেফেলাইটিস ইত্যাদি রোগ হলে হলে গর্ভস্থ ভ্র“ণের বিকাশ ব্যাহত হয় এবং জন্মগত ভাবে ঐ সব শিশু স্বতঃচিন্তন বিকৃতিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।
স্বতঃচিন্তন বিকৃতির চিকিৎসা : তাদের মূল সমস্য হলো অপ্রত্যাশিত আচরণ সমূহ দূর করা, যোগাযোগ ক্ষমতা বা বাচনিক ক্ষমতার উন্নয়ন ঘটানো এবং সামাজিক দক্ষতার উন্নয়ন ঘটানো। কথা বলা শেখানোর জন্য অনুকরণ এবং করণ শিক্ষণমূলক কৌশল (সঠিক আচরণ করলে পুরস্কার) কার্যকরী হতে পারে। স্বতঃচিন্তন শিশুদের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য পরিবারে একটি উষ্ণ, স্নেহশীল সম্পর্কপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। মডেলিং বা ছবির মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বার বার প্রশ্ন করলে বিরক্ত না হয়ে উত্তর প্রদান করতে হবে। তাদের আত্মবিশ^াস বাড়াতে উৎসাহ প্রদান করতে হবে। যেহেতু তারা পরিবর্তন পছন্দ করে না, তাই পরিবেশ পরিবর্তন সম্পর্কে আগের থেকে অবহিত করতে হবে। প্রয়োজনে একজন দক্ষ মনোবিজ্ঞানীর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ