খুলনা | শুক্রবার | ০১ জুলাই ২০২২ | ১৭ আষাঢ় ১৪২৯

হযরতে উলামায়ে কেরামের মর্যাদা

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০১:৫১ এ.এম | ১৮ জুন ২০২২


উলামা শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। শাব্দিক অর্থ হল জ্ঞানী। উলামা বলতে এমন লোকদের বুঝানো হয়, যাঁরা মহান আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে সম্যকভাবে অবগত এবং যিনি শরয়ী বিধান জানার উদ্দেশ্যে চেষ্টা ও গবেষণা চালান এবং শরী’আর দলিল-প্রমাণ থেকে শরয়ী বিধান উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়। অন্য কথায় বলা যায়, যিনি কুরআন ও হাদীসের আলোকে হালাল-হারাম, ন্যায়-অন্যায় এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য সম্পর্কিত জ্ঞানের অধিকারী।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা হযরতে উলামায়ে কেরামকে সুমহান মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন আয়াতে ও হাদীসে উলামাদের উচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা কুরআনুল কারীমে বলেছেন, যারা জ্ঞানী এবং জ্ঞানহীন, তারা কি সমান হতে পারে? (সূরা জুমার : ৯) অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘অন্ধ আর চক্ষুস্মান কী সমান হতে পারে?’ (সূরা রাদ : ১৬)
একবার রাসূলে কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মুখে দুই ব্যক্তির আলোচনা করা হল। তন্মধ্যে একজন আবেদ ও অপরজন আলেম ছিল। রাসূলে কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করলেন, আলেমের ফযীলত আবেদের উপর এমন যেমন আমার ফযীলত তোমাদের মধ্য হতে একজন সাধারণ ব্যক্তির উপর। এরপর রাসূলে কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করলেন, যারা লোকদের ভাল কথা শিক্ষা দেয় তাদের উপর আল­াহ তা’য়ালা তাঁর ফেরেশতাগণ, আসমান জমিনের সমস্ত মাখলুক, এমনকি পিঁপড়া আপন গর্তে এবং মাছ রহমতের দোয়া করে। (তিরমিজী)
ইমাম গাযযালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর এহইয়াউ উলুমিদ্দীন কিতাবে উলামাদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে হাদীসের একাধিক বর্ণনা সংকলন করেছেন, যেমন- ‘জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ পয়গম্ব^রগণের উত্তরাধিকারী’। ‘আলেম ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব এবাদতকারীর উপর তেমনি, যেমন চতুর্দশীর চাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব তারকারাজির উপর হয়ে থাকে।’ ‘কেয়ামতের দিন তিন শ্রেণির লোক সুপারিশ করবে- পয়গম্বরগণ, অতঃপর জ্ঞানী লোকগণ, অতঃপর শহিদগণ।’ ‘কেয়ামতের দিন জ্ঞানীদের লেখার কালি শহিদদের রক্তের সাথে ওজন করা হবে।’  ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে ধর্মের প্রজ্ঞা দান করেন এবং তার অন্তরে সৎপথ ইলহাম করেন’। ‘আলেমের মৃত্যু এমন মুসীবত যার প্রতিকার হতে পারে না এবং এমন ক্ষতি যা পূরণ হতে পারে না। আর আলেম এমন এক তারকা যে (মৃত্যুর কারণে) আলোহীন হয়ে গেছে। একজন আলেমের মৃত্যু অপেক্ষা একটি গোত্রের মৃত্যু অতি নগন্য ব্যাপার।’ ‘আল­াহ তা’য়ালার এবাদত কোন কিছুর মাধ্যমে ততটুকু সমৃদ্ধ হয় না, যতটুকু দ্বীনের জ্ঞানের মাধ্যমে হয়। একজন দ্বীনের জ্ঞানী ব্যক্তি শয়তানের জন্যে হাজার এবাদতকারী অপেক্ষা কঠোর হয়ে থাকে। প্রত্যেক বস্তুর একটি স্তম্ভ আছে। এ দ্বীনের স্তম্ভ হচ্ছে ফেকাহ (দ্বীনি জ্ঞান)।’ ‘ঈমানদার আলেম ঈমানদার আবেদ অপেক্ষা সত্তর গুণ শ্রেষ্ঠ।’ (এহইয়াউ উলুমিদ্দীন)
উপরোক্ত আলোচনা হতে বোঝা যায় যে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উলামাদের কি সুমহান মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এই মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের দিকে লক্ষ্য রেখে আমাদের প্রত্যেকের উচিৎ তাঁদের হক ও আদবের দিকে যতœবান হওয়া। এজন্য হযরতে উলামায়ে কেরামকে সম্মান করা। তাদের জন্য দোয়া করা। তাদের প্রশংসা করা ও কল্যাণকামী হওয়া। সৎ ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতা করা। তাদের সহবতে যাওয়া। তাদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করা। তাদের সামনে উচ্চ আওয়াজে কথা না বলা। তাদের অপ্রয়োজনীয় ও অহেতুক প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকা। তাদের সমস্ত জরুরত পুরা করার চেষ্টা করা। তাদের প্রতি সকল প্রকার নিন্দা-সমালোচনা থেকে বিরত থাকা।
সায়েখুল ইসলাম আল্লামা মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম বলেন, সাবধান কোনও অবস্থায়ই ‘উলামায়ে কিরামের বদনাম করে বেড়ানো উচিত নয়। অনেকেই তাদেরকে কোনো মন্দ কাজে রত দেখলে বলে বেড়ায় যে, আরে ভাই, আজকালকার মৌলভী সাহেবরাও এরকমই। তারাও আধুনিক যুগের ফ্যাশনমতো চলে। বে-দ্বীন কিসিমের লোক তো এসব অপপ্রচারকে নিজেদের মিশনই বানিয়ে নিয়েছে। কারণ তাদের জানা আছে, ‘উলামায়ে কিরামকে নিন্দিত ও সমাজচ্যুত না করা পর্যন্ত মানুষকে গোমরাহ করা যাবেনা। যখন ‘উলামার সাথে মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে, তখন ‘আমলোক আমাদের দয়ার পাত্রে পরিণত হবে। আমরা যেভাবে চাব, চালাতে পারবো। তখন তাদেরকে গোমরাহ করার পথে কোনও বাধা থাকবে না।
আমার সম্মানিত পিতা মুফতি মুহাম্মদ শফী রহমাতুল­াহি আলাইহি বলতেন, যখন রাখালের সাথে মেষপালকের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল, তখন নেকড়েদের সুবিধা হয়ে গেল। স্বাধীনভাবে তারা যখন যেটাকে ইচ্ছা ছিঁড়েফেঁড়ে খেতে পারবে। তাই বে-দ্বীন শ্রেণীর কাজ হল ‘উলামায়ে কিরামের বদনাম করা। তবে আজকাল এক শ্রেণির দ্বীনদারদের মধ্যে এই ফ্যাশন চালু হচ্ছে যে, তারাও দিনরাত ‘উলামায়ে কিরামের মর্যাদাহানি করে বেড়াচ্ছে। সুযোগ পেলেই তাদের সম্পর্কে অশালীন-অনুচিত মন্তব্য করছে। অথচ তাতে কারও কেনও ফায়দা নেই। চিন্তা করছে না যে, মানুষকে ‘উলামার প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুললে শেষে তোমাদের উপর সওয়ার শরী’আতের বিধান কে শেখাবে? তখন তো শয়তানই তোমাদের উপর সওয়ার হবে এবং শরী’আতের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বলবে এটা হালাল আর ওটা হারাম। আর তোমারও তাদেরই সেই ফতোয়া অনুযায়ী চলে গোমরাহ হয়ে যাবে।
সুতরাং এ নীতি বাদ দাও। ‘উলামায়ে কিরামকে মন্দ কাজ করতে দেখলেও তাদের সমালোচনা করো না। তাদেরকে অসম্মান করো না। বরং তাদের জন্য দু’আ কর। দু’আ করতে থাকলে তার বরকতে ইনশাআল্লাহ এক সময়ে তারা সঠিক পথে ফিরে আসবে। সে আসাটা সহজ হবে, যেহেতু তাদের কাছে ‘ইলম আছে। (ইসলাম আওর হামারী জিন্দেগী)
হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহমাতুল­াহি আলাইহি বলেছেন, সাধারণ একজন মানুষ যদি আলেমদের ব্যাপারে আপত্তি করে এবং তার আপত্তি সঠিকও হয় তবুও আলেমদের পক্ষ অবলম্বন করতে মন চায়। ব্যহত এটি সা¤প্রদায়িকতা মনে হলেও আমার নিয়ত এই থাকে যে, সাধারণ জনগণ যেন আলেমদের প্রতি খারাপ ধারণা না করে। কেননা, এটি হলে তাদের দ্বীন ও ঈমানের অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে যাবে। কেননা সাধারণ জনগণের অন্তর থেকে আলেমদের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা উঠে গেলে দ্বীন ধ্বংস হযে যাবে। কারণ, তারা সবার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে আর কারো কোন কথায় মনোযোগ দেবেনা।(মাজালিসে হাকীমুল উম্মত)
শাইখ মুহাম্মদ ইবনে সালেহ আল উসাইমীন রহমাতুল­াহি আলাইহি বলেন, আলেম ও দাঈগণের নিন্দা-সমালোচনাকারী উম্মতকে আলেম ও দাঈদের প্রতি বিরুপ করে থাকে। উম্মত আলেম ও দাঈদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। তখন দ্বীন ও শরীয়তের প্রতিও তাদের আস্থা থাকে না। (উম্মার ঐক্য : পথ ও পন্থা)
তবে একজন আলেমের সুস্পষ্ট ভুল ও বিচ্ছিন্ন কথার অনুসরণ তার সম্মান প্রদর্শনের জন্য আবশ্যক নয়। কিন্তু এ ভুলের কারণে মানহানি করা যাবে না। তাকে গোপনে সদুপদেশ দিতে হবে। সব জ্ঞানীরই বিচ্যুতি রয়েছে। বুদ্ধিমান ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির গুণ হচ্ছে অন্যের ত্র“টি-বিচ্যুতি গোপন রাখা। মোটকথা উলামাদের মর্যাদা ও সম্মান আকাশতুল্য। তাদেরকে সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করা সকলের অবশ্য কর্তব্য। তাদের সাথে বেয়াদবি, তাদের কষ্ট দেয়া ও নির্যাতন করা অত্যন্ত গোনাহর কাজ। আর এ জন্যে দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন মুসিবতের সম্মুখীন হতে হবে।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা উলামাদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দানের মাধ্যমে আমাদেরকে তাঁর ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি লাভ করার তৌফিক দান করুন, অমিন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। 

সংকলকঃ লেখক ও গবেষক।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ