খুলনা | শনিবার | ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ১ ফাল্গুন ১৪৩২

করোনা হতে আমরা যা শিখলাম (পর্ব ১)

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০১:৩০ এ.এম | ১২ জুন ২০২১

অবিশ্বাসীদের একটা সাধারণ যুক্তি হল ‘যা দেখা যায়না তার অস্তিত্ব নেই’। যাকে অভিজ্ঞতাবাদ বলা হয়ে থাকে। যেখানে অভিজ্ঞতাই যাবতীয় জ্ঞানের উৎস অর্থাৎ আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয় তথা দেখা, শোনা, স্পর্শ, স্বাদ এবং গন্ধ এর বাইরে জ্ঞানের কোন উৎস নেই। কিন্তু আমাদের জীবনে অনেক কিছু আছে যা অভিজ্ঞতাবাদ দ্বারা প্রমাণ করা সম্ভব নয়। ধরুন আজ আপনি বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগে তাড়াহুড়োর কারণে সবকিছু এলোমেলো ভাবে রেখে গেছেন, কোন কিছু গুছিয়ে রেখে যেতে পারেন নি। কিন্তু আপনি দিন শেষে ঘরে ফিরে অবাক হয়ে দেখতে পেলেন আপনার ঘর খুব সুন্দর করে সাজানো গোছানো! কেউ এসে যে আপনার ঘরকে সাজিয়েছেন সেটা বিশ্বাস করার জন্য যিনি আপনার ঘরকে সাজিয়েছেন তাকে দেখাটা কি জরুরি? অবশ্যই না? অর্থাৎ না দেখেই সাজানো গোছানো ঘর থেকে আমরা যিনি ঘরকে সাজিয়াছেন তার অস্তিত্বের প্রমাণ পাই। সুতরাং ‘যা দেখা যায়না তার অস্তিত্ব নেই’ কথাটা যুক্তি সঙ্গত নয়।(আল­াহর অস্তিত্বের কিছু প্রমাণ)
আমরা যদি মানুষের রূহ বা জীবন নিয়ে চিন্তা করি, এই জিনিটাই বা কী আর এটি দেখতেই বা কেমন? কেউ কি কোন দিন তা দেখেছে?
নিশ্চয় উত্তর হবে, না।
মনে করুন, আমার ইন্তেকাল হয়ে গেছে। বাইরে এ্যানাউন্স হচ্ছে মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন ইন্তেকাল করেছেন। কাঁন্নাকাটি কারিণী মহিলারা কাঁন্নাকাটি করছে। আত্মীয় স্বজন আমার লাশ দেখতে আসছে।
প্রিয় পাঠক আমার হাত, আমার পা, আমার মাথা অর্থাৎ আমার শরীরের অঙ্গপ্রতঙ্গগুলী ঠিক ঠিক যথাস্থানে আছে। কোনটির কোন পরিবর্তন হয়নি, যেমন ডান হাতটি বাম হাতের স্থানে বা বাম হাতটি ডান হাতের স্থানে প্রতিস্থাপন হয়ে যায়নি বা হাতের স্থানে পা আর পায়ের স্থানে হাত। অর্থাৎ আমার সমস্ত শরীরের অঙ্গপ্রতঙ্গগুলী ঠিক ঠিক যথাস্থানেই আছে। তাহলে আমাকে মৃত ঘোষণা করা হলো কেন?
উত্তর হচ্ছে, আমার শরীরের ভিতর থেকে ‘রূহ বা জীবন’ কে বের করে নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞানিরা এই জীবনের সঙ্গা দিয়েছেন, ‘জীবন এক প্রকার শক্তি’
আর একটু এগিয়ে জীব বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ‘বৃদ্ধি, প্রজনন, পরিব্যপ্তি, অভিব্যপ্তি, অনুভূতিসম্পন্ন প্রেটোপ্লাজম নামক এক প্রকার জটিল জৈব বস্তুর বিকশিত শক্তিকে জীবন বলে’।
যদি প্রশ্ন করা হয় কেমন শক্তি? বা এই শক্তির রূপ কেমন বা দেখতে কেমন? তাহলে কোন উত্তর মেলেনা। ‘এক প্রকার শক্তি’ এতটুকুই।
প্রশ্নকারীরা রসূলে কারীম সল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­ামকে প্রশ্ন করেছিল যে ‘রূহ’ জিনিসটা আসলে কী বা কেমন?
পবিত্র কুরআনে কারীমায় মহান আল­াহ তা’য়ালা উত্তর দিয়ে বলেছেন, ‘এরা তোমাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করছে। বলে দাও, এ রূহ আমার রবের হুকুমে আসে কিন্তু তোমরা সামান্য জ্ঞানই লাভ করেছো।’ (সূরা বনী ইসরাইল : ৮৫)
অর্থাৎ ‘রূহ’ বস্তুগত কিংবা অনুভবগ্রাহ্য কোন জিনিস নয় যে তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারবে, বরং এর রূপ সম্পূর্ণ অবস্তুগত একটি জিনিস যা আল­াহ পাক সৃষ্টি করেছেন এবং রূহ কী বা কেমন তা তোমাদের উপলব্ধি ক্ষমতার বাইরে। এই বিশ্বভূবনের সত্যাসত্য সম্পর্কে তোমাদের জ্ঞান খুবই সীমিত এবং উপলব্ধি ক্ষমতাও যৎসামান্য। তোমরা ভেব না যে তোমরা সবকিছুই জানো কিংবা জানতে সক্ষম। অর্থাৎ ‘রূহ’ বা ‘জীবন’ কল্পনা ও ধারণার বাইরের বস্তু, এক অদৃশ্য শক্তি যা দেখা যায় না।
ইমাম গাযযালী রহমাতুল­াহি আলাইহি বলেছেন, অনেকে একথা ভেবে বিস্মিত হয় যে, যে বস্তুর আকার-আকৃতি নেই তা কিভাবে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে? তারা যদি নিজের রূহ সম্বন্ধে চিন্তা করে তাহলে স্পষ্টই বোঝা যায় যার কোন আকার-আকৃতি নেই। মানুষ নিজের মধ্যে অনুসন্ধান করলে হাজার রকমের আকার-আকৃতিবিহীন বস্তু দেখতে পাবে যেমন, বেদনা, ক্রোধ, প্রেম, আস্বাদ ইত্যাদি হাজার রকমের নিরাকার বস্তু তার মধ্যে আছে। অথচ এই এগুলো কি, কেমন, কত প্রকার, জানতে চেলে সে কখনও তা জানতে পারবে না। কারণ, এগুলোর বর্ণ বা আকার কিছুই নেই। যদি প্রশ্ন করা হয় বেদনার আকার কেমন? এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে না, অথচ তার অস্তিত্ব আছে। এছাড়া আরও এমন বহু বস্তু আছে যেখানে ‘কেমন?’ ও ‘কত প্রকার’? প্রশ্ন করা চলে না। শত চেষ্টা করলেও শব্দ, আস্বাদ বা গন্ধের মূলতত্ত¡ কেউই জানতে পারবে না। কারণ, ‘কেমন?’ ‘কি প্রকার?’ প্রশ্নগুলি খেয়ালের অধীন। দর্শনেন্দ্রিয়ের সাহায্য ছাড়া তা অবগত হওয়া যায় না। (কিমিয়ায়ে সা’দাত)
আমরা যদি বিদ্যুৎ শক্তি, চৌম্বুকত্ব, বাতাস, তাপ নিয়ে চিন্তা করি এগুলো কখনো দেখা যায় না। খুব বেশি হলে অনুভব বা অনুমান করা যায় মাত্র।
বিদ্যুৎ শক্তি কেউ কোনদিন দেখেনি কিন্তু এই বিদ্যুৎ শক্তির প্রভাবে যখন বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলে চারিদিক আলোকিত করে তখন এর উপস্থিতি অনুভব করা যায়, যখন বৈদ্যুতিক পাখা ঘোরে আর আমাদের গায়ে বাতাস লাগে তখন এর উপস্থিতি অনুভব করা যায়, যখন বিদ্যুৎ শক্তি কোন লৌহ দন্ডকে গরম করে তখন এর উপস্থিতি অনুভব করা যায়।
বাতাসের কথা চিন্তা করুন বাতাস কেউ কোনদিন দেখেনি কিন্তু অনুভব করা যায়। প্রচন্ড গরমে মৃদু বাতাস যখন আমাদের শরীর শীতল করে, সাইক্লোনে যখন বাড়ি ঘর চুরমার করে দেয় তখন বাতাসের উপস্থিতি অনুভব করা যায়। একটি লৌহ দন্ড ঠান্ডা না গরম তা দেখা যায় না কিন্তু হাত দিলেই তা অনুভব করা যায়।
আবার বস্তুজগতের অনেক কিছুরই যেমন- ইথার, কসমিক-রে, রেডিও ওয়েভ ইত্যাদির সঠিক বর্ণনা দেওয়া যায় না। তাই বলে সেসবের অস্তিত্ব আমরা অস্বীকার করতে পারি না।
আমরা দেখেছি, অদৃশ্য করোনার ভয়াল থাবায় বিশ্ব আজ লণ্ডভণ্ড। সারাবিশ্বে প্রায় চলি­াশ লাখের মতো মানুষ ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে। পৃথিবীর বড় বড় ক্ষমতাধর, প্রযুক্তিবিদ ও সম্পদশালীরা দিগবিদিক হারিয়ে হতবিহব্বল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির অবস্থা বেহাল। চাকুরি হারাতে হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে। অর্থাৎ চোখে দৃশ্যমান না এমন একটা ক্ষুদ্রতি ক্ষুদ্র অনুজীব দিয়ে মহান আল­াহ তা’য়ালা আমাদের অভিজ্ঞতাবাদকে ভুল প্রমানিত করে দেখালেন। যদি আমরা চিন্তাশীল হই। পবিত্র কুরআনে কারীমায় মহান আল­াহ তা’য়ালা বহু জায়গায় ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল স¤প্রদায়ের জন্যে নিদর্শন রয়েছে। অতএব করোনা হতে আমরা শিখলাম, কোন কিছুর দৃশ্যমান না হওয়াই তাঁর অস্তিত্বহীনতার প্রমাণ নয়।
আল­াহই সর্বজ্ঞ। মহান আল­াহ তা’য়ালা আমাদের সঠিকটা বুঝার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : বায়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রনালয়, খুলনা।
 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ