খুলনা | মঙ্গলবার | ০৪ অক্টোবর ২০২২ | ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

জ্ঞানীজনদের আত্মহত্যা ও কিছু মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা !

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিজ্ঞানী |
০১:৫২ এ.এম | ০৭ অগাস্ট ২০২২


শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে। জ্ঞান মানুষের মনের মাঝে উপবেশিত কালিমা সমূহ বিদূরীত করে মন চক্ষুকে উন্মোচিত করে। মানুষকে যদি একটি দোতলা ঘরের সাথে তুলনা করা হয়, তবে নিজ তলায় বাস করা জীবসত্তার সাথে উপর তলার মানবসত্তার সেতু বন্ধন তৈরিতে শিক্ষার আলো যোগাযোগ স্থাপনকারী নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সেই জ্ঞান কখনো কখনো আলো-আঁধারের দোলাচলে পরিব্যাপ্ত হয়। তখন সভ্যতা সত্যভ্রষ্ট হয়ে মনের কালিমার বিজয়ে অমানিশার আঁধারে পরাস্ত হয়। এমন পরিস্থিতিতে জ্ঞানী ব্যক্তিরা আত্মনীতির নিকট হেরে গিয়ে প্রকৃতির সাথে আত্মমিলনে উদ্বুদ্ধ হয়। তখন পরাজয় ঘটে জ্ঞানের, সমাপ্তি দিকে অগ্রসর হতে থাকে জীবনের। আর এরূপ পরাজয়ের করুণ পরিণতি হলো জ্ঞানীজনের আত্মহনন তথা আত্মহত্যা।

আত্মহত্যার সাধারণ কারণ: (১) ব্যক্তির ক্রোধ যখন বর্হিমুখী না হয়ে অন্তমুর্খী হয়, তখন আত্মহত্যা প্রবণতা বেড়ে যায়। (২) অতীতের অন্যায়ের প্রায়শ্চিত করার চিন্তা ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করে থাকে। (৩) মৃত প্রিয়জনের সাথে মিলিত হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে। (৪) পুনর্জন্ম লাভের চেষ্টা ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় প্রলুদ্ধ করতে পারে। (৫) কোন পীড়ন থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা বা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার মানসিকতা ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে। (৬) অন্যের মধ্যে অপরাধবোধ সঞ্চালিত করে প্রতিশোধ নেওয়া চেষ্টা ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ব করতে পারে। (৭) ব্যক্তি আবেগ শূন্য হলে অথবা ব্যক্তির প্রত্যক্ষণমূলক অবস্থা সংকুচিত হলে অনেক সময় আত্মহত্যা সমীচীন মনে করতে পারে। (৯) ব্যক্তি অসহায়ত্ববোধ করলে আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে।

জ্ঞানীজনদের আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণসমূহ: (১) জ্ঞানীজনরা স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক সচেতন ও সামাজিক মিথস্ত্রিয়ায় বেশি সম্পৃক্ত, পরিবেশ বিভিন্ন শর্তের সাথে অশিক্ষিত লোকের তুলনায় বেশি আষ্টে-পৃষ্টে মিশে থাকে।। কিন্তু কোন কারণে সামাজিক পরিস্থিতির হঠাৎ পরিবর্তন তথা অবনতি হলে তখন জ্ঞানী ব্যক্তির সাথে সমাজ সম্পর্কে তুলনামূলক প্রকট নেতিবাচক ধারা প্রাদুর্ভাব হয়। তখন ব্যক্তি বেশি নীতিহীনতায় ভোগে এবং আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ হয়। (২) শিক্ষিত ব্যক্তিরা স্বাভাবিক ভাবেই উচ্চ বিলাসী, কিন্তু বাস্তবতা এই যে ব্যক্তির উচ্চাকাক্সক্ষার সাথে বাস্তব প্রাপ্তির সমন্বয় সাধন অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়-যা ব্যক্তির ভিতর হতাশা, মানসিক চাপ তৈরি করে । এরূপ পরিস্থিতি জ্ঞানীজনদের বেশি আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে। (৩) জ্ঞানীজন সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পেশাগত ভূমিকা বা সামাজিক ভূমিকা (চাকুরি, ব্যবসা বা অন্যান্য ভূমিকা) পালন করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে অন্তর্নিহিত মানসিক (বিষণœতা, আশাহীনতা) ব্যধিতে আক্রান্ত হয় যা তাদেরকে আত্মহত্যায় বেশি উদ্বুদ্ধ করে থাকে। (৪) অনেক জ্ঞানীগণ ব্যক্তিগতভাবে জ্ঞানের সমুদ্রে বিচরণ করায়, তারা নিজেদের সর্বেসর্বা ভাবতে শুরু করে এবং আত্মজ্ঞানের জোরালো প্রকাষ্ঠ তৈরি করে এবং তাদের জ্ঞানের রাজ্যে ব্যক্তিগত প্রতিভূত তৈরিতে তুলনামূলক বেশি অভ্যস্ত। ফলে সমস্যা সমাধানে তারা বেশি জড়তাগ্রস্ত। তাদের এরূপ চিন্তার ধারার জড়তা বেশি আত্মহত্যায় প্রভাবিত করে। (৫) জ্ঞানী ব্যক্তিরা বেশি পীড়নমূলক পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে থাকে যা তাদের আত্মহত্যায় বেশি উদ্বুদ্ধ করে। (৬) জ্ঞানীগণদের আত্মহননের এসব কারণ ছাড়া ও উপরোক্ত সাধারণ কারণ সমূহ আত্মহত্যায়ও উদ্বুদ্ধ করে থাকে।

জৈবিক কারণেও আত্মহত্যা: (১) ব্যক্তির নিউরোট্রানেন্স মিটার গুলো কার্যক্রমে বিশেষ করে সেরোটনিন কার্যক্রমে বিঘœ দেখা গেলে ব্যক্তি আত্মহত্যা প্রবণ হতে পারে। (২) এইসপিএ অক্ষের অতিরিক্ত সক্রিয়তার কারণে ব্যক্তি বেশি মাত্রায় সক্রিয় হওয়ার দরুণ আত্মহত্যা প্রবণ হতে পারে। (৩) সেরোটনিন বিপাক ক্রিয়ার একটি উপজাত (৫-এইচআইএএ) এর ঘাটতি হলে ব্যক্তি আত্মহত্যা প্রবণ হতে পারে। এসব কারণ সমূহও সবাইকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করে থাকে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধ করণ: (১) ব্যক্তির তীব্র মানসিক বেদনা ও কষ্টের অবসান ঘটানো। (২) ব্যক্তির চোখের সম্মুখ হতে পর্দা সরিয়ে ফেলা যাতে সে অনস্তিত্ব ও অনন্ত দুঃখ-কষ্ট ভোগ করা ছাড়া অন্য বিকল্প সম্পর্কে ভাবতে পারে তার জন্য তাকে সাহায্য করা। (৩) ব্যক্তিকে আত্ম বিধ্বংসী কাজ হতে সামান্য পরিমাণ হলেও পিছু হটতে বা বিরত থাকতে উৎসাহিত করা। (৪) সংকটকালের জন্য আগে থেকে পরিকল্পনা গ্রহণ করা (৫) রোগীর প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধি করা। (৬) কিছু ওষুধ যাহা পুনঃ পুনঃ সংগঠিত আচরণ সংবরণ করতে সহায়তা করে, ডাক্তারের পরামর্শ  মোতাবেক সে সব ওষুধ গ্রহণ করা যেতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, আত্মহত্যা ব্যক্তি-পরিবার-দেশ-জাতি সবার জন্য দুঃখদায়ক যা কখনো কাম্য নয়। আপনার বা আপনার সন্তান বা নিকট আত্মীয়ের মধ্যে আত্মহত্যা সম্ভাবনা সূচক কোন আচরণ দেখা গেলে দেরি না করে একজন মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ গ্রহণপূর্বক আত্মহত্যার মত হৃদয় বিদারক পরিস্থিতি হতে আপনি-দেশ-জাতিকে রক্ষা করতে পারেন। 
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা)।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

অন্যান্য

প্রায় ১ মাস আগে