খুলনা | শুক্রবার | ৩০ জুলাই ২০২১ | ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮

২৩ জুলাই থেকে দু’সপ্তাহের কঠোর লকডাউন

পবিত্র ঈদুল আযহা কাল, করোনা দুশ্চিন্তা সর্বস্তরে

আশরাফুল ইসলাম নূর |
১২:২৮ এ.এম | ২০ জুলাই ২০২১

‘ঈদুজ্জোহার চাঁদ হাসে ঐ এলো আবার দুসরা ঈদ ! কোরবানি দে, কোরবানি দে, শোন খোদার ফরমান তাগিদ..’ কাজী নজরুল ইসলামের এই কাব্যসুর আকাশ-বাতাস মন্ডিত করে মন প্রাণ উজালা করে তুলছে ঈদের আনন্দ-রোশনাইয়ে।
মুসলিম উম্মাহর অন্যতম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আযহা আগামীকাল বুধবার, ২১ জুলাই। ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তম দু’টি ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম এ ঈদুল আযহা। ভেদাভেদ ভুলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে মিলিত হওয়ার দিন। মহান আাল্লাহ’র উদ্দেশ্যে পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে দেশের মুসলিম সম্প্রদায় তাদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহা উদযাপন করবেন। ঘরে ঘরে ত্যাগের আনন্দে মহিমান্বিত হবে মন।
তবে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কার মধ্যেই গতবারের মতো এবারও ঈদ উদ্যাপিত হবে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ঈদকে ঘিরে যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস থাকার কথা তা ম্লান করে দিয়েছে বৈশ্বিক অতিমারী করোনাভাইরাস (কোভিড ১৯)। করোনা মোকাবিলায় ও সংক্রমণ বিস্তার রোধে ঈদুল ফিতরের মতো এ ঈদেও সরকারের নির্দেশনায় শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঈদের জামাত শেষে কোলাকুলি এবং হাত মেলানো থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা উল্টো।
মহামারী করোনা পরিস্থিতিতে চারিদিকে মৃত্যুর খবর, আর অজানা আতঙ্ক। এরমধ্যে কোরবানির পশুর হাটগুলোতে, গণপরিবহন, মার্কেট-শপিংমল ও গ্রামের হাট-বাজারে ন্যূনতম স্বাস্থ্য বিধি, নিরাপদ সুরক্ষা দূরত্ব তো নেই-ই, বরং সব বয়সী মানুষের জমায়েত দেখলে মুহূর্তের জন্যে যে কেউ ভুলে যাবেন-বিশ্বে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মহামারী চলছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে দৈনিক সংক্রমনের দিক থেকে শীর্ষে থাকা ১৪টি দেশের একটি। আর দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এই মুহূর্তে খুলনা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সরকারকে ১ জলাই থেকে শুরু হওয়া বিধি-নিষেধ আরও দুই সপ্তাহের জন্য বাড়াতে বললেও, সরকার ঈদের কারণে এক সপ্তাহের জন্য বিধি-নিষেধ শিথিল করে।
যথাযথ ধর্মীয় মর্যদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যদিয়ে সারাদেশে মুসলিম সম্প্রদায় ঈদুল আযহা উদযাপন করবে। কোরবানিকৃত পশুর রক্ত বা বর্জ্য পদার্থ দ্বারা যাতে পরিবেশ দুর্গন্ধময় না হয় সে বিষয়ে সকল প্রকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান।

প্রায় চার হাজার বছর আগে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভের জন্য হযরত ইব্রাহিম (আঃ) নিজ পুত্র হযরত ইসমাইলকে (আঃ) কোরবানি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু পরম করুণাময়ের অপার কুদরতে হযরত ইসমাইল (আঃ)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। হযরত ইব্র্রাহিম (আঃ)-এর ত্যাগের মহিমার কথা স্মরণ করে বিশ্বব্যাপী মুসলিম স¤প্রদায় জিলহজ মাসের ১০ তারিখে আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ লাভের আশায় পশু কোরবানি করে থাকে।

আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য আল্লাহ কোরবানি ফরজ করে দিয়েছেন। এ জন্য ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কোরবানি করাই এ দিনের উত্তম ইবাদত। সেই ত্যাগ ও আনুগত্যের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সারাদেশের মুসলিম সম্প্রদায় শনিবার দিনের শুরুতেই মসজিদে সমবেত হবেন এবং ঈদুল আযহার দু’রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করবেন। নামাজের খুতবায় খতিব তুলে ধরবেন কোরবানির তাৎপর্য। তবে এবার করোনার মতো দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে ভিন্ন পরিবেশে কোরবানির ঈদ হওয়ায় অন্যান্য বারের চেয়ে পশু কোরবানি কিছুটা কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে, আগামী ২৩ জুলাই থেকে ১৪ দিনের লকডাউন আরও কঠোর হবে বলে গত ১৭ জুলাই ঘোষণা দেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। তিনি বলেন, যতদিন ভ্যাকসিন দেয়া না হয় ততদিন মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। ঈদের পর যে লকডাউন আসছে তা কঠোর থেকে কঠোরতর হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২৩ জুলাই থেকে কঠোর লকডাউনের আওতায় আসবে সারাদেশ। সে সময় বন্ধ থাকবে গার্মেন্টস, শিল্প-কলকারখানাসহ সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, ২৩ জুলাই ভোর ৬টা থেকে ৫ আগস্ট মধ্যরাত পর্যন্ত ফের কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে।
এ ছাড়া ২৩ দফা নির্দেশনা দিয়ে ঈদের তৃতীয় দিন অর্থাৎ ২৩ জুলাই ভোর ৬টা থেকে ৫ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে বলে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়।
নির্দেশনা মধ্যে অন্যতম হচ্ছে :

১. ঈদের পর ২৩ জুলাই থেকে সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিসসমূহ বন্ধ থাকবে।

২. সড়ক, রেল ও নৌ-পথে গণপরিবহন (অভ্যন্তরীণ বিমানসহ) ও সব যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে।

৩. শপিংমল/মার্কেটসহ সব দোকানপাট বন্ধ থাকবে।

৪. সব পর্যটনকেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদনকেন্দ্র বন্ধ থাকবে।

৫. সব শিল্প-কলকারখানা বন্ধ থাকবে।

৬. জনসমাবেশ হয় এ ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান (বিবাহোত্তর অনুষ্ঠান, ওয়ালিমা), জন্মদিন, পিকনিক, পার্টি ইত্যাদি বন্ধ থাকবে।

৭. জরুরি পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাক/লরি/কাভার্ডভ্যান/নৌযান/পণ্যবাহী রেল/ফেরি এ নিষেধাজ্ঞার আওতা বহির্ভূত থাকবে।

৮. বন্দরসমুহ (বিমান, সমুদ্র, নৌ ও স্থল) এবং তৎসংশ্লিষ্ট অফিসসমূহ এ নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত থাকবে।

৯. কাঁচাবাজার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে। সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠন/বাজার কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি নিশ্চিত করবে।
১০. অতি জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত (ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়, চিকিৎসা সেবা, মৃতদেহ দাফন/সৎকার ইত্যাদি) কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না। নির্দেশনা অমান্যকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১১. টিকা কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে টিকা গ্রহনের জন্য যাতায়াত করা যাবে।

১২. খাবারের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খাবার বিক্রয় (অনলাইন টেকএ্যাওয়ে) করতে পারবে।

১৩. আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু থাকবে এবং বিদেশগামী যাত্রীরা তাদের আন্তর্জাতিক ভ্রমনের টিকিট/প্রমাণ প্রদর্শন করে গাড়ি ব্যবহার করে যাতায়াত করতে পারবেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে মসজিদে নামাজের বিষয়ে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দেবে।
১৪. ‘আর্মি ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ বিধানের আওতায় মাঠ পর্যায়ে কার্যকর টহল নিশ্চিত করার জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনা মোতায়েন করবে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্থানীয় সেনা কমান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত করবেন।

১৫. জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে সমন্বয় সভা করে সেনাবাহিনী, বিজিবি/কোস্ট গার্ড, পুলিশ, র‌্যাব ও আনসার নিয়োগ ও টহলের অধিক্ষেত্র, পদ্ধতি ও সময় নির্ধারণ করবেন। সে সঙ্গে স্থানীয়ভাবে বিশেষ কোনো কার্যক্রমের প্রয়োজন হলে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিবেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগসমূহ এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবে।

১৬. জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করবে।

১৭. সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮-এর আওতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে আইনানুগ কার্যক্রম গ্রহনের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান করবেন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ