খুলনা | মঙ্গলবার | ০৪ অক্টোবর ২০২২ | ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

ঝগড়া বিবাদ করা

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০১:৩৪ এ.এম | ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২


মহিমাময় কদর রজনী! মহান আল্লাহ তা’য়ালা যে রজনীতে কুরআন নাজিল করেছেন! যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। মহান প্রভু আল্লাহর নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে যে রাতে ফেরেশতাগণ হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম সম্মতিব্যাহারে অবতরণ করেন সব বিষয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে। কবে এই রাত্রি? মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর প্রিয় রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তা জানিয়ে দিয়েছিলেন। একদিনের ঘটনা, রসূলাল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মহিমাময় রজনীসম্পর্কে খবর দিতে সাহাবায়ে কেরামের নিকট বের হলেন ঘর থেকে, রাস্তায় দেখা হল দু’জন মুসলিমের সাথে। যারা ঝগড়ায় লিপ্ত ছিল। মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর প্রিয় রসূলের দিল  থেকে এই ইলম তুলে নিলেন। রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের বললেন, আমি তোমাদের নিকট বের হয়েছিলাম তোমাদের কদর রজনী সম্পর্কে সংবাদ দিতে। কিন্তু অমুক অমুক লোক ঝগড়া করতে থাকলে তার ইলম তুলে নেয়া হয়। 
ঝগড়া-বিবাদ মূলত ক্রোধের ফল। এছাড়াও অহংকার, বিদ্বেষ, ধোঁকাবাজি, অন্যের নিকট যা আছে তার প্রতি লোভ, অন্যের ওপর যে কোনো উপায়ে প্রাধান্য বিস্তার ও বিজয়ী হওয়ার আকাক্সক্ষা, কোনো কাজকর্ম না থাকা এবং সময়, পরিবেশ ও পরিপার্শ্বিকতাও মানুষকে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত করে দেয়। যা যুগ যুগ ধরে প্রাকৃতিক ভাবেই মানুষের স্বভাবের সাথে জড়িয়ে রয়েছে।
পবিত্র কুরআনে কারীমায় মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘আর আমরা এই কুরআনে মানুষের জন্য সকল প্রকার উপমা বিস্তারিত বর্ণনা করেছি। আর মানুষ সবচেয়ে বেশি তর্ককারী।’(সূরা আল-কাহাফ:৫৪)
ঝগড়ার ফলে পারিবারিক, সামাজিক সংহতি ও ঐক্য বিনষ্ট হয়। ইসলাম ঝগড়া-বিবাদকে সবচেয়ে নিম্নস্তরের আমল বিনষ্টকারী বলে গণ্য করেছে।

আল্লামা আওযায়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আল্লাহ তা’য়ালা যখন কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি কামনা করেন, তখন তাদের ওপর ঝগড়া-বিবাদ চাপিয়ে দেন এবং তাদের কাজের থেকে বিরত রাখেন।
ইমাম শাফে‘ঈ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ঝগড়া বিবাদ করা মানুষের অন্তরকে কঠিন করে দেয় এবং পরস্পরের মধ্যে শত্র“তা তৈরি করে। 
মুহাম্মাদ ইবন আলী ইবন হুসাইন রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ঝগড়া দ্বীনকে মিটিয়ে দেয়, মানুষের অন্তরে বিদ্বেষ জন্মায়। 
আব্দুল্লাহ ইবন হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বিবাদ প্রাচীন বন্ধুত্বকেও ধ্বংস করে, সুদৃঢ় বন্ধনকে খুলে দেয়, কমপক্ষে তার চড়াও হওয়ার মানসিকতা তৈরি করে যা হলো, সম্পর্কচ্ছেদের সবচেয়ে মজবুত উপায়।
যে মজলিশে বিতর্ক করা হয় এবং তাতে আল্লাহ তা’য়ালা সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য থাকে না, তাদের আল্লাহ তা’য়ালা ভালো কাজ করার তাওফিক হতে বঞ্চিত করেন। 
কোনও একজন মনীষী বলেন, দ্বীনকে নষ্ট, মরুয়তকে দুর্বল এবং অন্তরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখার জন্য ঝগড়া বিবাদ থেকে এত বেশি মারাত্মক আমি আর কিছুই দেখিনি।
কোন এক আরব বলেছিলেন, যারা মানুষের সাথে বিবাদ করে তাদের সম্মান নষ্ট হয়। যে বেশি ঝগড়া করে সে তা অবশ্যই বুঝতে পারে।
ঝগড়া-বিবাদ সামাজিক অনাচার ও অত্যাচারের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ঝগড়া-বিবাদ মানুষের জীবনে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা ঘটায়। মানবতার ঐক্য ও সংহতিতে ভাঙন সৃষ্টি করে সেখানে বিভেদ, অনৈক্য ও বিভক্তি নিয়ে আসে। ফিতনা-ফ্যাসাদের ফলে পরস্পরের মধ্যে পরচর্চা, পরনিন্দা, কুৎসা রটনা, ঠাট্টা-বিদ্রুপ অপবাদ, মিথ্যা দোষারোপ, হিংসা-বিদ্বেষ, শত্র“তা ও হিংস্রতা সৃষ্টি হয়। অনেক সময় সামান্য তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হত্যাকান্ডের ন্যায় পাপাচারও সংঘটিত হয়ে থাকে।
বিখ্যাত দার্শনিক শেখ সাদী বলেছেন, নির্বোধ এবং গম্ভীর লোকদের সঙ্গে ঝগড়া করো না। কেননা নির্বোধরা তোমাকে কষ্ট দেবে আর গম্ভীর মানুষ তোমার শত্র“তে পরিণত হবে। 
ইমাম জাহাবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যে ব্যক্তি ঝগড়া করে সে যেন শত্র“র অনিষ্ট থেকে নিজেকে সামলানোর জন্য প্রস্তুত হয়।
কলহ-বিবাদ সৃষ্টিকারীদের যেমন সাধারণ মানুষ ঘৃণা করে, তেমনি আল্লাহ তা’য়ালাও তাকে অপছন্দ করেন। 
পবিত্র কুরআনে কারীমায় মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে না, নিশ্চয়ই আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা আল-কাসাস: ৭৭)
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ তা’য়ালার নিকট সর্বাধিক নিকৃষ্ট সে ব্যক্তি যে অধিক ঝগড়া বিবাদ করে।’ (বুখারী)
এছাড়াও অশ্লীল ভাষীকে হযরত রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিকদের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, ৪টি বৈশিষ্ট্য যার মধ্যে থাকবে সে খাঁটি মুনাফিক। ওই চারটি বৈশিষ্ট্য হলো ১. যখন তার কাছে কোনো কিছু আমানত রাখা হয়, সে তার খিয়ানত করে। ২. সে যখন মিথ্যা কথা বলে। ৩. আর যখন প্রতিশ্র“তি দেয় তা ভঙ্গ করে এবং ৪. যখন কারো সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করে, তখন অশ্লীল ভাষায় গালি দেয়। (বুখারী)
মানুষ যাতে পৃথিবীতে দ্ব›দ্ব কলহ সৃষ্টি না করে; পারস্পরিক কথাবার্তায় যেন শালীনতা ও স¤প্রীতি বজায় রাখে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে ইসলামে কথাবার্তায়, আচার-আচরণে সহনশীলতা প্রদর্শনের নির্দেশ প্রদান করেছে।

আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে কারীমায় অনেক জায়গায় বলেছেন, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম ভাষায় ন্যায়সঙ্গতভাবে কথা বল।’ 
অর্থাৎ, যারা উত্তম ভাষায় ন্যায়সঙ্গতভাবে কথা বলে, তাদের জন্য দ্ব›দ্ব-কলহ করার কোনো সুযোগ থাকেনা।
আবু দাউদ শরীফে হযরত মেকদাদ ইবনে আসওয়াদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হযরত রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, ‘ভাগ্যবান সে ব্যক্তি, যাকে ফিতনা থেকে দূরে রাখা হয়েছে। ভাগ্যবান সে ব্যক্তি, যে ফিতনা থেকে দূরে রয়েছে এবং ভাগ্যবান সে ব্যক্তিও, যে এতে পতিত হয়ে ধৈর্য্যাবলম্বন করেছে। তার জন্য ধন্যবাদ।’ এই হাদীস পর্যালোচনা থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যারা নিজেকে ফিতনা, ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে রাখবে তারাই ভাগ্যবান। 
এজন্য সমাজে ও পরিবারে শান্তিশৃঙ্খলা, সুখ-সমৃদ্ধি, ঐক্য-সম্প্রীতি, সাম্য-মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ব ধরে রাখতে দ্ব›দ্ব কলহ পরিত্যাগ করে ঝগড়া বিবাদমুক্ত সমাজ গড়তে আমাদের সকলকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে।
আল্লাহ তা’য়ালা মুসলিম উম্মাহর সবাইকে সমাজের প্রতিটি পর্যায়ে পরস্পরকে সব ধরণের অনর্থক ঝগড়া-বিবাদ-দ্ব›দ্ব-কলহ ও বিতর্ক থেকে বিরত থাকার এবং বিরত রাখার তাওফিক দান করুন। (আমিন) আল্লাহই সর্বজ্ঞ। 
সংকলক : লেখক ও গবেষক।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

ইসলাম

প্রায় ১৫ দিন আগে