খুলনা | মঙ্গলবার | ০৪ অক্টোবর ২০২২ | ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

বেশি দামে গম ও চাল আমদানি কার স্বার্থে

|
১২:২৭ এ.এম | ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২


দেশে আকস্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি ও বর্ষা মৌসুমে স্মরণকালের কম বৃষ্টির কারণে এ বছর বোরো, আউশ, আমন ধানের কাক্সিক্ষত উৎপাদন হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে চালের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করছে সরকারের শীর্ষ মহল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ববাজার থেকে ১০ লাখ টন চাল ও ৯ লাখ টন গম কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে এ সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী হলেও আইন লঙ্ঘন করে বিশ্ববাজারের চেয়ে বেশি মূল্যে রাশিয়া থেকে গম কেনার চুক্তি করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া চালের ক্ষেত্রেও বিশ্ববাজার থেকে বেশি দামে আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।
বিভিন্ন পত্রিকার খবর জানাচ্ছে, রাশিয়া থেকে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) পাঁচ লাখ টন গম কেনায় তৃতীয় একটি পক্ষকে যুক্ত করা হয়েছে। গণ খাতে ক্রয় আইন অনুযায়ী সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) ক্রয় প্রক্রিয়ায় বেসরকারি তৃতীয় কোনো পক্ষ থাকার সুযোগ নেই। অথচ গম ক্রয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি মধ্যস্থতা করেছে ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক নামে একটি কোম্পানি। আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়ার গমের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ইউনাইটেড গ্রেন কোম্পানি হলেও বাংলাদেশ চুক্তি করেছে দেশটির প্রডিনটর্ন নামে স্বল্প জনবল নিয়ে চলা একটি কোম্পানির সঙ্গে।
জানা যাচ্ছে, খাদ্য মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক বাজারের থেকে বেশি ব্যয়ে রাশিয়ার প্রডিনটর্নের সঙ্গে গম কিনতে যাচ্ছে। আগস্টের শেষে যখন চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম প্রতি টন নেমে এসেছে ৩০০ ডলারের কাছাকাছি। জাহাজে পরিবহনের ব্যয় এখন বাড়তি, সে বিবেচনায় আমদানি খরচ কিছুটা বেশি হওয়া যৌক্তিক হলেও খাদ্য মন্ত্রণালয় গম কিনছে প্রতি টন ৪৩০ ডলারে, যা অস্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, সব বিবেচনায় সবচেয়ে কম দামে গম কেনা হচ্ছে। বিদেশ থেকে সরকারি পর্যায়ে চাল ও গম কেনার ক্ষেত্রে বিশ্ববাজার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া ও দরদাম করার জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহŸানের নিয়ম মেনে চলা হয়। ১৭ আগস্ট খাদ্য অধিদপ্তর দরপত্র আহŸান করে, ২৯ আগস্ট সেটি বাতিল করে দেয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১৭ লাখ ৪৪ হাজার টন চাল এবং ১ লাখ ৩৫ হাজার টন গম মজুত রয়েছে। অথচ ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার থেকে চাল আমদানির ক্ষেত্রেও সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বেশি দাম দিতে যাচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে খাদ্য কেনায় এ ধরণের অভিযোগ দেশে নতুন নয়। কিন্তু কোভিড মহামারি এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অভিঘাতে দেশের অর্থনীতি একটা সংকটকাল পার করছে। জ্বালানি ও ডলার সাশ্রয়ে নানা ধরণের কৃচ্ছাসাধনের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এ অবস্থায় সবচেয়ে কম দামে খাদ্য কেনার চেষ্টা করা উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কেনাকাটার প্রক্রিয়া ও ধরণ দেখে মনে হতে পারে, ‘সরকারি মাল দরিয়াতে ঢাল’ নীতিতে চলছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বেশি দামে গম আমদানির সিদ্ধান্তকে জনস্বার্থবিরোধী বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি মনে করে, একটি অসাধু স্বার্থান্বেষী ও সুযোগসন্ধানী চক্রকে সুপরিকল্পিতভাবে অনৈতিক ও অতি মুনাফা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।  সংকটকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে যারা প্রত্যক্ষ লাভবান এবং পরোক্ষ সুবিধাভোগী; সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ