খুলনা | রবিবার | ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

আত্মহত্যাকে ‘না’ বলি !

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী মনোবৈজ্ঞানিক কাউন্সিলর |
০১:৪৫ এ.এম | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২


কথায় আছে- আপনি ১ মিনিট বিষণœতার মধ্যে সময় কাটালেন তো ৬০ সেকেন্ড জীবনের আনন্দ থেকে বঞ্ছিত হলেন। আকাশে যখন রংধনু দেখা যায়, তখন তা রৌদ্র ও বৃষ্টি উভয়কে মোকাবেলা করে অতঃপর তাকে আকাশে আবির্ভাব হতে দেখা যায়। তেমনি জীবন অনেক সুন্দর-আর জীবনকে ব্যথা-বেদনার বাহুডোরে আবদ্ধ থেকে তাকে আরো সুন্দরতম স্থানে অধিষ্ঠিত করার দায়িত্ব আমার নিজেরই।
সম্প্রতি আমাদের সমাজে আত্মহত্যা প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের অভিভাবক সমাজ তাদের সন্তানদের বর্তমান জীবনবোধকে কেন্দ্র করে বেশ উদ্বিগ্ন। অত্যন্ত তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে সন্তানদের স্বচেতনায় আত্মহনন সদৃশ অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণে বর্তমান হালচাল প্রাজ্ঞ সমাজ থেকে সাধারণ মানুষের নিকট আজ মাথা বেদনার বড় কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।
সন্তানের নিকট হতে মোবাইল নিয়ে নেওয়া বা সন্তানকে মোটর সাইকেল কিনে দিতে না পারা অথবা সন্তানকে সাধারণভাবে শাসন করা-এরূপ শাসন বা কর্মপন্থা যা অতি সাধারণ হিসেবে বিবেচিত, তা আজ অনেক সন্তানের নিকট আত্মসম্মানের উপর আঘাত রূপে বিবেচিত হচ্ছে। ওরা আমাকে বাঁচতে দিল না বা একশ’ টাকার জন্য একজন মানুষকে হত্যা করা -এ সবই যুব সমাজের অস্থির চিন্তা-চেতনার নামান্তর মাত্র।
আজকের কৈশর ও যুব সমাজের আত্ম সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু তাদের আত্ম বিশ্লেষণ কমে গেছে। বেশির ভাগ কৈশর ও যুবক নিজেদের ব্যক্তিগত অনুভূতিকে সর্বাগ্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবার কারণে মা-বাবার অনুভূতিকে তারা অনেক ক্ষেত্রে আমলে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের সন্তানরা একটা বয়সে পাশ্চত্য ভাবধারায় নিজেকে স্বয়ং সম্পূর্ণ ভাবতে শিখলে ও বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে তদ্রুপ আত্ম শারীরিক ও মানসিক পরিপূর্ণতা অর্জনে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছে। আমারা পরিবর্তনের ধারায় আবর্তিত হতে চাচ্ছি কিন্তু তা আমাদের যুব সমাজ অনেক ক্ষেত্রে গলার্ধঃকরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে একটা অপরিণত ও অপরিপক্ক যুব সমাজ আমরা পেতে বসতে যাচ্ছি যারা শুধু নিজেদেরকে আত্ম স্তম্ভরিতামূলক ভাবধারায় সম্পৃক্ত করে ফেলতে শুরু করেছে, যেখানে মায়ের মাতৃত্বসুলভ ভালোবাসার তাগিদ বা সংসার চালোনায় বাবার হাড়ভাঙা কষ্টের মূল্য যৎসামান্য হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। আর তার সাথে যুক্ত হচ্ছে সতীর্থদের মানসিক চাপ ও নিপীড়নমূলক মনোভাব।
এরূপ সমাজ ব্যবস্থার জন্য মূলতঃ কারা দায়ি? আমাদের সামাজিক ব্যস্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু সামাজিক দায় অনেক ক্ষেত্রে হ্রাস পেয়েছে। অর্থ অর্জনের পাগলপর নেশা, চাকুরি ও সামাজিক দয়িত্বপালনগত ব্যস্ততা, সন্তাদের প্রতি অতিরশীল বা অবহেলা সূচক মনোভাব অথবা মানসিক কেন্দ্রীক শাসনের অপ্রতুলতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, প্রাত্যহিক জীবনের জটিলতা, সন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অপ্রতুলতা, যৌথ পরিবারের অপ্রতুলতা, শিশুর সামাজিকীকরণে সমস্যা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, পারিবারিক বন্ধনে শিথিলতা, বসবাসগত সমস্যা, শিক্ষায় কো-ক্যারিকুলাম কার্যক্রমের অপ্রতুলতা, সন্তানদের নিকট পিতা-মাতার  অতি প্রত্যাশা, শিশুদের নৈতিক শিক্ষায় দৈন্যতা, প্যারেন্টাল ইস্যু বা প্যারেন্টাল ডিপ্রেসন ইত্যাদি বিষয় সন্তানদের সুস্থ মানসিক বিকাশে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে প্রাদুর্ভাব হচ্ছে। এর ফলে আমরা হয়তো ক্ষেত্র বিশেষ অর্থ, মান যশ বা সামাজিক প্রতিপত্তি বা এরূপ অনেক কিছু লাভ করছি কিন্তু হারায়ে ফেলছি আমাদের সন্তানদের সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশ ধারাকে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে মানসিক  বেকারগ্রস্ত এক যুব সমাজ। তারা বেশির ভাগই অনিয়ন্ত্রিত ভাবধারা দ্বারা তাড়িত। যার জন্য তারা কোন বস্তু বা বিষয়ের গুণগত ভাবধারাকে বোঝার ক্ষমতাকে হারায়ে ফেলে সামাজিক বিধ্বংসী কাজে সম্পৃক্ত হতে বিন্দু মাত্র দ্বিধাবোধ করতে পিছপা হচ্ছে না। 
আত্মহত্যার সাধারণ কারণ: (১) ব্যক্তির ক্রোধ বর্হিমুখী না হয়ে অন্তমুর্খী হলে আত্মহত্যা প্রবণতা বেড়ে যায়। (২) অতীতের অন্যায়ের প্রায়শ্চিত করতে ব্যক্তি আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকে। (৩) মৃত প্রিয়জনের সাথে মিলিত হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে। (৪) পুনর্জন্ম লাভের চেষ্টা ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় প্রলুদ্ধ করতে পারে। (৫) কোন পীড়ন থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা বা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার মানসিকতা ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে।  (৬) কোন বিষয়ের বিষময়তার কারণে অন্যের মধ্যে অপরাধবোধ সঞ্চালিত করে প্রতিশোধ নেওয়া চেষ্টা ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ব করতে পারে। (৭) ব্যক্তি আবেগ শূন্য হলে অথবা ব্যক্তির প্রত্যক্ষণমূলক অবস্থা সংকোচিত হলে অনেক সময় আত্মহত্যা সমীচীন মনে করতে পারে। 
কারা বেশি আত্মহত্যা উদ্বুদ্ধ হয়: (১) যারা সমস্যা সমাধানে অপেক্ষাকৃত বেশি জড়তাগ্রস্ত, (২) যারা অদূরদর্শী ও সমস্যার বিকল্প সমাধানের চিন্তা করতে অক্ষম, (৩) যারা বেশি আশাহীনতায় ভোগে, (৪) যারা বর্জনমূলক অবহতি থেকে তাড়াতাড়ি পালিয়ে যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করে (৫) যারা বেশি অবাস্তব উচ্চাশা প্রকাশ করে এবং তা পূরণে ব্যর্থ হয় (৬) মৃত্যু অবধারিত ভেবে যারা অর্থহীন জীবনকে দ্রুত অর্থপূর্ণ করার দায়িত্ব গ্রহণ করে, (৭) যখন ব্যক্তির মধ্যে সুপ্তভাবে অন্তনির্হিত মরণ প্রবৃত্তি নিজের মধ্যে জাগরিত হয়ে উঠে।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে আমাদের করণীয়: (১) ব্যক্তির তীব্র মানসিক বেদনা ও কষ্টের অবসান ঘটানো যার জন্য প্রয়োজন পারিবারিক সম্পর্ক জোরদারকরণ। (২) ব্যক্তির চোখের সম্মুুখ হতে পর্দা সরিয়ে ফেলা যাতে সে অনস্তিত্ব ও অনন্ত দুঃখ কষ্ট ভোগ করা ছাড়া অন্য বিকল্প সম্পর্কে ভাবতে পারে-তার জন্য তাকে সাহায্য করা। (৩) ব্যক্তিকে আত্মবিধ্বংসী কাজ হতে সামান্য পরিমাণ হলেও পিছু হটতে বা বিরত থাকতে উৎসাহিত করা। (৪) রোগীর প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধি করা।(৫) বন্ধু-বান্ধব, আত্ম-পরিজনের সাথে মেলামেশা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। 
আত্মহত্যা পরিবার, সমাজ, দেশও জাতি সবার জন্য পরম দুঃখ ও কষ্টের। আত্মহত্যার মাধ্যমে পাবার কিছু নাই বরং আত্মহত্যার পরিণতিতে বহন হয় করতে আধ্যাত্ম জগতের দুঃখ ও যন্ত্রণা। তাই আসুন-সমস্বরে বলিঃ- ’আত্মহত্যাকে না বলি, সুন্দর জীবন গড়ি’। 
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

অন্যান্য

প্রায় ৩ মাস আগে