খুলনা | রবিবার | ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

মহৎ হবার অপরিহার্য গুণ (পর্ব-২)

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী |
০৩:৪৬ পি.এম | ২৮ অক্টোবর ২০২২


জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভালকে সবাই ভালবাসে। মহৎ মানুষ সকলেরই আদর্শ ও অনুসরণীয়। সকল প্রকার মহৎ গুণের সমাহার আমরা দেখতে পাই মহানবী সল­াল­াহু আলাইহিস সালামের মধ্যে। এই কারণেই তিনি সকলের জন্য আদর্শ। মহৎ হতে হলে আমাদের কিছু গুণ অর্জন করা অপরিহার্য। কুরআন ও হাদিসের আলোকে তার কিয়দাংশ ইতিপূর্বে এই কলামে আলোচনা করা হয়েছিল। আজ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ মহৎ গুণের কথা এখানে তুলে ধরা হলো। 
নিরহঙ্কারতা : অহঙ্কারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। রসূলের ভিতরে (সাঃ) অহঙ্কারের লেশ মাত্র ছিলনা। তিনি সবার আগে মানুষকে সালাম দিতেন এবং বলতেন, যে আগে সালাম দেয় সে অহঙ্কার মুক্ত। কিন্তু, বর্তমানে আমরা অপরের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থাকি; দেখি মুখ নড়ে কিনা, কখন সে আমাকে সালাম দেয়, এরপর উত্তর দিব। সৃষ্টির সেরা মানুষ হয়েও তিনি বিলাসিতামুক্ত, অত্যন্ত সাটা-মাটা ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন।  খেজুরের ছালভর্তি ছাটায়ের উপর শোয়ার কারণে তার পিঠে দাগ পড়ে যেতো। সাহাবারা (রাঃ) ভালো কোনো বিছানার ব্যবস্থা করার আবদার জানালে তার প্রতিউত্তরে তিনি বলতেন, আমি দুনিয়াতে একজন পথচারী ছাড়া আর কিছুই নই। যে পথচারী একটা গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে একটু পরে সেটা ছেড়ে চলে যায় (তিরমিজি: ২৩৭৭)। তিনি সাহাবাদের সাথে এমনভাবে মিশে বসতেন যে, কোন আগন্তুক এসে চিনতে পারতো না কে আল­াহর রসূল। এ কারণে অধিকাংশ সময়ে তারা জিজ্ঞাসা করতো, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মদ কে? 
বিনয় ও নম্রতা : বিনয় একটি মহৎ গুণ। আল­াহর নবী (সাঃ) ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্র। তিনি এতোই নরম প্রকৃতির ছিলেন যে মদীনার সাধারণ বাচ্চারাও তার হাত ধরে শহরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে নিয়ে যেতে পারতো। তিনি সাহাবায়ে কেরামকেও (রাঃ) মানুষের প্রতি নম্র আচরণের উপদেশ দিয়ে বলতেন, তোমরা নম্র ব্যবহার করো এবং কঠোর ব্যবহার করো না। মানুষকে শান্তি দাও এবং মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করো না (বুখারি: ৫৬৯৪)। কেবল মুসলমানই নয়, অমুসলিমদের সাথে মহানবী (সাঃ) যে উত্তম আচরণ দেখিয়েছেন, তা আজও সবাইকে বিস্মিত করে। কোন অমুসলিম নাগরিকের প্রতি যদি কোন জুলুম করা হয় তাহলে নবীজি (সাঃ) স্বয়ং নিজে তার বিরুদ্ধে বিচারের দিনে দাঁড়াবেন বলে উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছেন। একবার এক ইহুদি নবীকে মারতে এসে তার মেহমান বনে গেলো। রাতে রসূল (সাঃ) যথাসাধ্য আপ্যায়ন করে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। কিন্তু শয়ন কক্ষে বিছানায় সেই ইহুদি লোকটি পায়খানা করে চলে গেলো। সকালে হুজুর (সাঃ) তার কোনো সন্ধান পেলেন না। রাসূল (সাঃ) এর চেহারা মুবারক মলিন হয়ে গেলো। আফসোস আর আক্ষেপ করে বলতেছিলেন, ‘হায়! আমি বুঝি তার যথাসাধ্য আপ্যায়ন করতে পারিনি’। হুজুর (সাঃ) নিজ হাতে সে পায়খানা পরিস্কার করলেন।
অহেতুক রাগ দমন : অহেতুক রাগ দমন করতে না পারলে মহৎ হওয়া যায় না। রাগের সময় মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রাগ একটি খুবই বাজে জিনিস, যা একটু একটু করে আমাদেরকে ধ্বংস করে দেয়। যখন আমাদের সাথে খুব খারাপ কিছু ঘটে, যা আমাদের প্রত্যাশা ছিল না, কিংবা যখন আমরা কারো কাছ থেকে খুব বাজে ব্যবহারের সম্মুখীন হই, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই আমরা অনেক রেগে যাই, ক্রোধান্বিত হয়ে পড়ি। রাগের মাথায় এমন কিছু একটা করে বসি, যাতে মানুষ হিসেবে নিজেরাই অনেক ছোট হয়ে যাই এবং অনেক অনর্থক বিপদও ডেকে আনি। তাই ভালো মানুষ হতে হলে রাগকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। 
লোভ সংবরণ : মানুষ মাত্রই লোভী। কিন্তু সেই লোভকে একান্ত প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। অতিরিক্ত লোভ মানুষকে দুর্নীতি পরায়ণ হতে বাধ্য করে। 
হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার : ভালো মানুষ হতে হলে পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা পরিত্যাগ করতে হবে। অন্যের উন্নতি বা ভালো দেখলে স্বভাবতই আমাদের অনেকের মনে এক ধরণের হাহাকার জেগে ওঠে। কেউ কেউ আবার সূ² ঈর্ষাবোধও করি। কিংবা ভাবি, “আমি যা করতে পারিনি বা হতে পারিনি, ও কীভাবে তা পারল!” অর্থাৎ নিজেদের সাথে তুলনা করে যখন আমরা উপলব্ধি করি যে কেউ আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে, তখন আমরা মানসিক যাতনায় ভুগি, অস্থির হয়ে পড়ি।
হাদিসে নবী সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম বলেছেনঃ তোমরা অনুমান বা ধারণা থেকে বেঁচে থেকো। কারণ অনুমান বড় মিথ্যা ব্যাপার। আর কারো দোষ অনুসন্ধান করো না, গোয়েন্দাগিরী করো না, একে অন্যকে ধোঁকা দিও না, আর পরস্পর হিংসা করো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করো না। বরং সবাই আল­াহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে থেকো।
দ্বিমুখীতা ও চোগলখোরী পরিহার : মহৎ মানুষ কখনও দ্বিমুখীতা অবলম্বন করেন না। দু’মুখো ব্যক্তি সম্পর্কে এক হাদিসে  এসেছেঃ কিয়ামতের দিন তুমি আল­াহর নিকট ঐ ব্যক্তিকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট পাবে যে দু’মুখো। সে এদের সামনে একরূপ নিয়ে আসতো আর ওদের কাছে অন্য রূপে ধরা দিত। চোগলখোরী  অর্থ একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগানো। নবী সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম বলেছেন, চোগলখোর কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। 
মহান আল­াহ তায়ালা আমাদের সকল প্রকার মহৎ গুণ অর্জন করার তৌফিক দান করুন। 
লেখক : মৎস্য বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, সিডনী থেকে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

ইসলাম

প্রায় ১ মাস আগে