খুলনা | রবিবার | ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

হয়রানীর অভিযোগে এডি সানিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা ইতালি প্রবাসীর

দালাল চক্রের দৌরাত্মে জিম্মি বাগেরহাট পাসপোর্ট অফিস, ভোগন্তিতে সেবা গ্রহীতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাগেরহাট |
০১:০৪ এ.এম | ০২ নভেম্বর ২০২২


দালাল চক্রে জিম্মি হয়ে পড়েছে বাগেরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস। অনিয়ম আর দালালদের দৌরাত্মে ভোগন্তির যেন শেষ নেই সেবা গ্রহীতাদের। অতিরিক্ত টাকা নেওয়া, টাকার জন্য হয়রানি, সামান্য ভুলে সেবা গ্রহীতাদের ফিরিয়ে দেওয়া, তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার, দালালদের সঙ্গে সখ্যতাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। খারাপ ব্যবহারের কারণে পাসপোর্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও করেছেন এক সেবা গ্রহীতা।
তবে দালাল চক্র নির্মূল করতে জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী-পরিচালক এমএ সানি।
পাসপোর্ট অফিস ঘুরে সেবা গ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিয়ম মেনে এলেও পাসপোর্টের ফরম জমা দেওয়া যায় না বাগেরহাট পাসপোর্ট অফিসে। আর কোনো রকমে দিতে পারলেও সময়মতো পাসপোর্ট পাওয়া যায় না। শুধু দালালদের হাতে টাকা তুলে দিলেই পাসপোর্ট পাওয়া যায়। পাসপোর্ট জন্ম তারিখ, নাম বা নামের অংশ সংশোধনের জন্যও নেওয়া হয় অতিরিক্ত টাকা। প্রতিটি সংশোধন বা সংযোজনের জন্য দিতে হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
পাসপোর্ট অফিসের এ দালালির সঙ্গে অফিসের আশপাশে এবং বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত ৫০ জন যুক্ত রয়েছেন। এসব দালালরা প্রতি পাসপোর্টে সরকারি ফির চেয়ে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দালালদের অভিযোগ, এই টাকার একটা বড় অংশ দিতে হয় আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। সেটি আবার পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক, অফিস সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহায়ক ও আনসার সদস্যের মধ্যে বিভিন্ন হারে ভাগাভাগি হয়।
রবিবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে পাসপোর্ট অফিসে বসে কথা হয় ফকিরহাট উপজেলার শ্যামল সাহা নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি বলেন, স্থানীয় একটি কম্পিউটারের দোকানদারকে ৮ হাজার ৫০০ টাকা দিয়েছি পাসপোর্ট করার জন্য। এ কারণে তার পাসপোর্ট করা অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু দোকানদারের নাম পরিচয় জানাতে রাজি হননি তিনি।
আল মামুন নামে শরণখোলা উপজেলার এক যুবক বলেন, পাসপোর্ট ফরম জমা দিলেই আগে জানতে চায় কোথা থেকে পূরণ করেছেন। তাদের পছন্দ মতো কম্পিউটারের দোকান বা লোকদের মাধ্যমে ফরম পূরণ করলে সঙ্গে সঙ্গে তা জমা নেওয়া হয়। তিন দিন ঘুরে অনেক কষ্টে পাসপোর্টের ফরম জমা দিয়েছি।
রামপাল উপজেলার উকিল উদ্দিন শেখ বলেন, সরকারি জমা ৫ হাজার ৭৫০ টাকা। কিন্তু সামনের দোকানদার আমার ফরম পূরণ করে ৬ হাজার ৪০০ টাকা নিয়েছেন।
এমডি মুজাহিদ নামে এক ব্যক্তি বলেন, আবেদন করার সময় এক দোকানে আমাকে সরাসরি বলেছে দুই হাজার টাকা দিলে কোনো দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না। আমি তাকে অতিরিক্ত টাকা না দিয়ে এ্যাপ্লিকেশন ও প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র জমা দিতে গেলাম। কিন্তু তারা সেটি জমা না নিয়ে আমার পেশার স্থানে লাল কালি দিয়ে পাঠিয়ে দিল। পরে আবার সেই দোকানে গেলাম। তখন তিনি বললেন, দুই হাজার টাকা দিলে কাজ হবে, নইলে হবে না। তারপর তাকে টাকা দিলে সেই একই কাগজ আবার জমা নিয়েছে। এ সময় তাকে দেখেছি আমার কাগজপত্রের ছবি তুলে অফিসের একজনের কাছে পাঠিয়ে দিল। তখন আমার কাগজের সমস্যা নাই হয়ে গেল।
প্রতিনিয়তই এমন হয়রানির শিকার হতে হয় পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষেরও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দালাল বলেন, পাসপোর্ট অফিসের স্টাফ আশিক, জহির, মোস্তাফিজ ও সাইফুল সরাসরি আমাদের কাছ থেকে টাকা নেন। এই টাকা অফিস-সহকারী থেকে শুরু করে সহকারী পরিচালক পর্যন্ত সবাই পায়।
মানহানী মামলা : পাসপোর্টের ফরম জমা দিতে এসে হয়রানী ও গালিগালাজ করায় বাগেরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক এস এম এ সানিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন ফিরোজ হোসেন নামে এক ইতালি প্রবাসী।
তিনি বলেন, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় দশ বছর মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করি। নিয়ম অনুযায়ী আঙ্গুলের ছাপ প্রদানের নির্ধারিত তারিখে পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হয়ে লাইনে দাঁড়াই। দালাল ও কর্মচারীদের যোগসাজশে লাইনে না দাঁড়িয়েই বেশ কয়েকজন ভিতরে প্রবেশ করেন। বিষয়টির প্রতিবাদ করলে ভিতরে থাকা অফিস সহকারী আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। এর প্রতিকার চেয়ে সহকারী পরিচালকের কাছে অভিযোগ করলে তিনিও খারাপ ব্যবহার করেন। পরে দশ বছরের জন্য করা পাসপোর্টের আবেদনে সময়সীমা কমিয়ে ৫ বছর করে দেয় পাসপোর্ট অফিস।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে পুনরায় দশ বছরের আবেদন করে পাসপোর্ট নিই আমি। পাসপোর্ট অফিসের এই খামখেয়ালির জন্য দুই মাসের বেশি সময় বাংলাদেশে অবস্থান করতে হয় আমাকে। এ জন্য আর্থিকভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়ে আমার প্রতিষ্ঠান। এই ক্ষতিপূরণ চেয়ে আমি আদালতে মামলা করেছি। আশা করি ন্যায় বিচার পাবো।
বাগেরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক এসএমএ সানি বলেন, আমার অফিসে কর্মরতদের মধ্যে কোনো দালাল নেই। বাইরে যেসব দালাল রয়েছে, তাদের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া যেসব সেবা গ্রহীতা পাসপোর্ট করতে এসে হয়রানির শিকার হন, তাদেরকে সরাসরি অভিযোগ দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
বাগেরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকার শতাধিক লোক পাসপোর্ট করতে আসেন। অর্ধশতাধিক মানুষ আসেন তাদের পাসপোর্ট ডেলিভারী নিতে। বর্তমানে ই-পাসপোর্ট করতে হয় গ্রাহকদের। ৪৮ পৃষ্ঠার ৫ বছর মেয়াদী ২১ দিনের মধ্যে ডেলিভারি পাসপোর্টের ফি ৪ হাজার ২৫ টাকা, একই পাসপোর্ট ১০ দিনে নিলে ৬ হাজার ৩২৫, ২ দিনে নিলে ৮ হাজার ৬২৫ টাকা দিতে হয়। ৪৮ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট ১০ বছর মেয়াদী নরমাল ২১ দিনের মধ্যে ডেলিভারি ৫ হাজার ৭৫০ টাকা, ১০ দিনে ডেলিভারি ৮ হাজার ৫০ টাকা, ২ দিনে নিলে ১০ হাজার ৩৫০ টাকা। ৬৪ পৃষ্ঠার ৫ বছর মেয়াদী ২১ দিনের মধ্যে ডেলিভারি পাসপোর্টের ফি ৬ হাজার ৩২৫ টাকা, ১০ দিনে ডেলিভারি ৮ হাজার ৬২৫ টাকা, ২ দিনে ডেলিভারি ১২ হাজার ৭৫ টাকা। ৬৪ পৃষ্ঠার ১০ বছর মেয়াদী ২১ দিনের মধ্যে ডেলিভারি পাসপোর্টের ফি ৮ হাজার ৫০ টাকা, ১০ দিনে ডেলিভারি ১০ হাজার ৩৫০ টাকা, ২ দিনে ডেলিভারি ১৩ হাজার ৮০০ টাকা। পাসপোর্ট নবায়নের ক্ষেত্রেও একই পরিমাণ টাকা পরিশোধ করতে হয় বাংলাদেশী নাগরিকদের। সরকারি নির্ধারিত এই ফিতে পাসপোর্ট করতে হলে সহ্য করতে হয় নানা বিড়ম্বনা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ