খুলনা | রবিবার | ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

পরীক্ষা ভীতিকে ‘না’ বলি!

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিজ্ঞানী |
০২:১৮ এ.এম | ০৪ নভেম্বর ২০২২


কেস স্ট্যাডি-(১) প্রিয়াল, বয়স-১২ বছর। পরীক্ষা সমাগত হলে-পরীক্ষার দিন সকালে প্রায় সময় তাকে অভিযোগ করতে শোনা যায়:-মম, আমার পেট ব্যথা করছে, আমার মনে হয় বমি হতে পারে। মম-দয়া করে শোন! আমি পরীক্ষা দিতে যাবো না।
কেস স্ট্যাডি-(২) স্বপ্না, বয়স-১১ বছর। পড়াশোনায় বেশ আন্তরিক ও খুব সিরিয়াস। কিন্তু বিপত্তি অন্য জায়গায়। পরীক্ষা এলে তার উদ্বিগ্নতার মাত্রা খুব বেড়ে যায়। পরীক্ষার পূর্বে তার খাওয়া দাওয়া কমে যায়। মেজাজ খিট খিটে হয়ে যায়। এমন কি কারোর সাথে কথা বলতে চায় না।
উপরের ঘটনা দু’টির লক্ষণ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা ভীতিতে নির্দেশ করে। ছাত্র জীবনে যে বিষয়টি বেশির ভাগ শিক্ষার্থী সব চেয়ে বেশি ভয় পায়; তা হলো ’পরীক্ষা’। পরীক্ষা মানেই একটু বাড়তি চাপ, যার প্রভাব সবার নিকট সমান ভাবে বিরাজমান।
পরীক্ষার ভীতির মনস্তাত্তি¡ক ও অন্যান্য কারণ : 
পরিবেশগত কারণ: (১) পিতা-মাতা কর্তৃক সন্তানের ফলাফল সংক্রান্ত উচ্চ আকাক্সক্ষা। (২) পিতা-মাতা যখন সন্তানের উপর অত্যধিক প্রত্যাশা প্রয়োগ করেন। (৩) পিতা-মাতা যখন সন্তানের পরীক্ষার ফলাফলকে সামাজিক মর্যাদার মানদণ্ড হিসেবে গণ্য করেন। (৪) পিতা-মাতা প্রায় সময় যখন সন্তানকে অন্য শিক্ষার্থীর সাথে তুলনা করে থাকেন। (৫) ফলাফল সংক্রান্ত শিক্ষকের বিরূপ মন্তব্য বা শিক্ষক সংক্রান্ত অন্য কোন সমস্যা।
পাঠ সংক্রান্ত সমস্যা: (১) অনিয়মিত পড়া, (২) পরীক্ষার পূর্বে সারারাত্র জেগে পড়া, (৩) ট্রপিক্স এর অর্থ না বুঝে মুখস্ত করা, (৪) সঠিক ভাবে রিভাইস না দেওয়া (৫) পড়ার বিষয় মনে করতে ব্যর্থ হওয়া, (৬) রিভাইজিং নোট তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়া। 
মনস্তাত্তি¡ক কারণ: শিক্ষার্থীর-(১) পরীক্ষা সংক্রান্ত নেতিবাচক চিন্তা (২) পরীক্ষা সংক্রান্ত আত্মবিশ^াসের অভাব (৩) পরীক্ষা ও ফলাফল সংক্রান্ত অযৌত্তিক চিন্তা (৪) যদি ফেল করি, তবে মান সম্মান নষ্ট হবে-এরূপ অযৌত্তিক চিন্তা (৫) ১০০% সঠিক ফলাফল প্রাপ্তির আশা নতুবা আমি মূল্যহীন হয়ে পড়বো- এরূপ অযাচিত চিন্তা। (৬) আত্ম বিশ^াসের অভাব
অন্যান্য কারণ:
* জনতার ভীতি: অনেক শিশু বহুসংখ্যক শিক্ষার্থীর মাঝে কথা বলতে, বসতে, এমন কি লিখতে ভয় পায়।
* বংশগত কারণ: পিতা-মাতার যদি এরূপ ভীতি থেকে থাকে তবে তাহা তার সন্তানদের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। 
* স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের গঠন: মানুষের স্নায়ুন্ত্রের মধ্যে দৃঢ়তা ও নমনীয়তার দিক দিয়ে পার্থক্য বিদ্যমান। যাদের স্নায়ুতন্ত্র গাঠনিক কার্যক্রম নমনীয় তাদের একই সময়ে বহু সংখ্যক উদ্দীপক দ্বারা সহজে উদ্দীপিত হয়। যেহেতু পরীক্ষার কক্ষে শিশুর সামনে একই সময়ে বহু সংখ্যক উদ্দীপক উপস্থিত হয়, সেহেতু যাদের মস্তিষ্ক গঠন নমনীয় তারা পরীক্ষা কক্ষে অনেক গুলো উদ্দীপক দ্বারা সহজে প্রভাবিত হয় এবং ভীতি অনুভব করে।
শারীরিক প্রকাশ : (১) পরীক্ষার পূর্বে শিশুর বুক ধরফর করা। (২) পরীক্ষার টেনসনে শিশুর খাবারে অরুচি দেখা দেওয়া। (৩) পরীক্ষার এলে অনিদ্রা সৃষ্টি হওয়া (৪) ক্ষেত্র বিশেষ বমি বমি ভাব দেখা দেওয়া। (৫)পরীক্ষার সময়ে প্রচুর ঘাম হওয়া। (৬) ভয়ে শ^াস প্রশ^াস ছোট হয়ে যাওয়া। 
পরীক্ষর ভীতি দূর করতে মা-বাবার করণীয়:
* বাসায় পড়ার পরিবেশ তৈরি করুন: পরীক্ষার সময় শিশুকে একটি কোলাহলমুক্ত পরিবেশ উপহার দেবার চেষ্টা করতে হবে। এতে করে শিশুর পড়ার মনোযোগ বিধানে সহায়ত করবে।
* শিশুর মনে ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে সহায়তা করুন: ‘তুমি পারবে’-এমন একটি উক্তি শিশুর মনোবল তৈরিতে যথেষ্ট সহায়ক। যা পরীক্ষার ভীতিকে দূর করতে যথেষ্ট সহায়ক। 
* শিশুর পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন: শিশুর ঘুমের ঘাটতি তার মনোযোগ বিচ্ছিন্নতার একটি অন্যতম কারণ। সুতরাং প্রতিদিন কমপক্ষে ৭ হতে ৮ ঘন্ট শিশুর ঘুমের ব্যবস্থা করুন। এতে তার মন শান্ত থাকবে।
* পড়ার মাঝে শিশুটিকে বিরতি দিন : শিশুটিকে পড়ার মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে তার সাথে গল্প করুন কিংবা মাঝে মাঝে প্রিয় কার্টুন দেখতে দিন। এতে তার মানসিক চাপ কমবে।
পরীক্ষার্থী কর্তৃক অনুস্মরণীয় : (১) সময়মত রিভাইস দিতে হবে। (২) পরীক্ষার পূর্বে হালকা খাবার খেতে হবে। (৩) নিয়মিত পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে (৪) পড়ার মধ্যে মাঝে মাঝে বিরতী রাখা। (৬) পরীক্ষার ভীতি সংক্রান্ত বিষয়কে পরিবারের সদস্যদের সাথে বা বন্ধুদের সাথে আলোচনা করা যেতে পারে। (৭) পরীক্ষার পূর্বে নতুন বিষয় টাচ্ না করা। 
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

অন্যান্য

প্রায় ৩ মাস আগে