খুলনা | বুধবার | ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ২৯ মাঘ ১৪৩২

পাইকগাছা লোনা পানি কেন্দ্রের ৪টি পুকুরে চলছে ৮ লাখ পোনার পরিচর্যা

সফলতার দ্বারপ্রান্তে দেশের প্রথম পরীক্ষামূলক ভেনামী চিংড়ি চাষ

সাইফুল ইসলাম বাবলু |
১২:৪৪ এ.এম | ১৩ জুন ২০২১

সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি চাষের নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বহুল আলোচিত ভেনামী চিংড়ির পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয়েছে। যশোরের এম ইউ সী ফুডসের উদ্যোগে খুলনার পাইকগাছা লোনা পানি কেন্দ্রের ৪টি পুকুরে দেশের প্রথম ভেনামী চিংড়ি চাষ সফলও হতে যাচ্ছে। উদ্যোক্তারা আশা করছেন সফল পরীক্ষণের পর প্রান্তিক চাষি পর্যায়ে বাণিজ্যিক ভাবে শুরু হবে ভেনামী চিংড়ির চাষ। এতে বিশ্ব বাজারে রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান আবারও হবে উর্ধ্বমুখী। ফলে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশীয় বাগদা ও গলদা চিংড়ির উৎপাদন দিন দিন কম হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ হিমায়িত চিংড়ি প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় ইতোমধ্যে সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি শিল্পে অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বিশ্ব বাজারে ভেনামী চিংড়ির দাম কমের পাশাপাশি পর্যাপ্ত চাহিদা থাকায় আমাদের রপ্তানিকারকরা সুবিধা করতে পারছে না। যে কারনে আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি চিংড়ি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে চিংড়ি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন বিগত প্রায় এক যুগ ধরে ভেনামী চিংড়ি চাষের অনুমতি লাভের আশায় সরকারের সংগে আলোচনা চালিয়ে আসছে। অবশেষে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উচ্চফলনশীল ভেনামী জাতের চিংড়ি চাষের অনুমতি দেয় সরকার। অনুমোদন প্রাপ্ত যশোর বিসিক শিল্প নগরের এম ইউ সী ফুডস ও সাতক্ষীরার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুশীলন যৌথ উদ্যোগে খুলনার পাইকগাছায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। 
সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর ও মৎস্য গবেষনা ইনস্টিটিউটের অধীনে পরীক্ষামূলক ভাবে পাইকগাছা লোনা পানি কেন্দ্রের ৪টি পুকুরে গত এপ্রিলের শুরুতে ৮ লাখ ভেনামী চিংড়ি পোনা ছাড়া হয়। এর আগে ৩১ মার্চ থাইল্যান্ড থেকে বিমানে করে এই পোনা আনা হয়। পুকুরে পোনা অবমুক্তির পর নিয়মতান্ত্রিক পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষনের দায়িত্ব পালন করছেন চিংড়ি বিশেষজ্ঞ প্রফুল­ সরকার, উপ-পরিচালক (অবঃ) মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ। তিনি জানান, প্রতি সপ্তাহে চিংড়ির বৃদ্ধি এবং রোগ বালাই অনুসন্ধানে নমুনা পরীক্ষা করা হয়। চলতি বছর তাপ মাত্রা বেশী থাকায় কিছুটা শঙ্কা থাকলেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে এই চিংড়ির রোগ প্রতিরোধ এবং জীবন ধারণ ক্ষমতা বাগদা চিংড়ির তুলনায় অনেক বেশী। তিনি বলেন, পোনা ছাড়ার পর ৭ সপ্তাহ পর্যন্ত রোগ বালাইয়ে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশী থাকলেও এ প্রকল্পে তেমনটা দেখা যায়নি।
এদিকে গত ৬ জুন পুকুরের পরিবেশ, রোগ বালাই ভাইরাস প্রতিরোধ ব্যাবস্থা (ব্যাওসিকিউরিটি) পরিদর্শন, এবং চিংড়ির স্বাস্থ্যগত বৃদ্ধি সরেজমিন পরিদর্শনে আসেন বিশেষজ্ঞ টিম। তারা চিংড়ির পরিমাপ ও নমুনা পরিক্ষা করেন। পরিদর্শন টিমের প্রধান ছিলেন খুলনা ফিস ইন্সপেকশন ও কোয়াালিটি কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি ডিরেক্টর মজিনুর রহমান। তাঁর সাথে ছিলেন বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন কবীর, পরিচালক এম এ হাসান পান্না, বাংলাদেশে ভেনামী চিংড়ি চাষের সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটির সদস্য এড. শেখ রফিকুজ্জামান, এম ইউ সী ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাসসহ ফিস ইন্সপেকশন ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাগন। 
পরিদর্শন টিম লিডার মজিনুর রহমান বলেন, পোনা ছাড়ার পর ৬৮ দিনে ভেনামী চিংড়ির গ্রোথ ও ফার্টিলিটি রেট খুবই আশাব্যঞ্জক। প্রতিটি চিংড়ির ওজন ৮ গ্রাম থেকে সর্বোচ্চ ২৫ গ্রাম পর্যন্ত, গড় ওজন ৮.৭৫ গ্রাম দেখা গেছে। এই চিংড়ির উৎপাদন সময়কাল ১২০ দিন। যার মধ্যে প্রথম ৬০ দিন যে পরিমান বৃদ্ধি হয় পরবর্তী ৬০ দিনে তার ৩ গুনের বেশী বৃদ্ধি হয়। সেই হিসাবে আশা করা যাচ্ছে হারভেস্টের সময় প্রতিটি চিংড়ির ওজন হবে গড়ে ২৫ গ্রাম। তিনি বলেন, সাধারণ পুকুরে প্রতি হেক্টরে ৩০০-৪০০ কেজি বাগদা উৎপাদন হয়। অন্যদিকে একই পরিমাণ জমিতে ৭ থেকে ৮ হাজার কেজি ভেনামী চিংড়ি উৎপাদন সম্ভব। পাশাপাশি গলদা ও বাগদা বছরে ১বার চাষ হয় কিন্তু ভেনামী চাষ করা যায় বছরে ৩বার। বিশ্ব বাজারে গলদা ও বাগদার দর পতনের কারনে চাষিরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। ফলে চিংড়ি চাষ কমে যাওয়ায় কর্ম সংস্থান কমছে এবং প্রতি বছর এ খাতের রপ্তানি আয়ও হ্রাস পাচ্ছে। এর থেকে উত্তোরনে সরকার ভেনাম চিংড়ি চাষের অনুমতি দিয়েছে। 
ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন কবীর বলেন, কাঁচা মালের (চিংড়ি) স্বল্পতায় মাছ কোম্পানিগুলো বন্ধ হওয়ার পথে। যে কয়টি চালু আছে তাতে দেশে উৎপাদিত চিংড়িতে সক্ষমতা ও ধারণ ক্ষমতার মাত্র ১৮-২০ ভাগ চাহিদা মিটছে। ফলে প্রক্রিয়াজাত খরচ বেশী হচ্ছে। 
ফ্রোজেন ফুডসের পরিচালক এবং বাংলাদেশে নিবিড়-আধানিবিড় বাগদা চিংড়ি চাষের প্রবর্তক এম এ হাসান পান্না বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাগদার চাহিদা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। ভেনামীর উৎপাদন খরচ বাগদার থেকে কম এবং বড় হওয়ার সময়কালও কম। তবে ভেনামী চিংড়ি চাষ করতে হলে দেশেই এর এসপিএফ পোনা উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। তবেই প্রান্তিক চাষি পর্যায়ে ব্যাপকভাবে এর বিস্তার লাভ করবে। 
এফ এ ও এবং গ্লোবাল এ্যাকুয়াকালচার অ্যালায়েন্সের পরিসংখ্যান মতে, ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাপী মোট ৪৪ লাখ ৮০ হাজার মেঃ টন চিংড়ি উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ভেনামী চিংড়ি ছিল প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার মেঃ টন যা মোট উৎপাদনের ৭৭ শতাংশ। ভেনামী চিংড়ি উৎপাদনের হার ক্রমাগত সবখানে বাড়লেও এর বিপরীতে ছিল বাংলাদেশের অবস্থান। দেশের প্রথম ভেনামী চিংড়ি চাষের উদ্যোক্তা এমইউ সী ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাস বলেন, ৩৩ বিলিয়ন ডলারের চিংড়ির বিশ্ববাজার। যার ৮০ ভাগই দখল করে নিয়েছে ভেনামী চিংড়ি। আমাদেরকে লড়তে হয় মাত্র ২০ শতাংশ বাজারের জন্য। সেখানেও নানা প্রতিকূলতায় বাজারের দর পতনের কারনে চিংড়ির উৎপাদন এবং রপ্তানিতে পিছিয়ে যাচ্ছি আমরা। বিশ্ববাজারের চাহিদার কথা বিবেচনাসহ দেশে এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে ভেনামি চিংড়ি চাষের কোন বিকল্প নেই বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। 
 

প্রিন্ট