খুলনা | রবিবার | ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

আমলের মধ্যে নামাজের গুরুত্ব সর্বাধিক

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী |
০২:০৬ এ.এম | ১১ নভেম্বর ২০২২


নামাজ ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির অন্যতম ভিত্তি। আরবি শব্দ সালাতের বাংলা প্রতিশব্দ হলো নামাজ। ঘরের ভিত নড়বড়ে হলে যেমন ঘর ভেঙে পড়ে ঠিক তেমনি নামাজে গড়বড় হলেও দ্বীন নামক প্রাসাদ ভেঙে পড়ে। ভিত মজবুত হলে বিল্ডিং যেমন মজবুত হয়, তেমনি নামাজ সুন্দর হলেও দ্বীন সুদৃঢ় হয়। নামাজ শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়, এটি পরোক্ষভাবে আল­ার’র সাথে কথা বলাও বটে। তাছাড়া এটা প্রতিদিন মুসলমানদের জন্য অন্তত পাঁচবার পরস্পর সাক্ষাৎ ও খোঁজ খবর নেয়ার সুযোগ করে দেয়। মেরাজে গিয়ে আল­াহ’র হাবিব (সঃ) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়ে এসেছিলেন। এটা থেকেই নামাজের গুরুত্ব বুঝা যায়। অন্যান্য আমল আল­াহ তায়ালা ফেরেশতা জিব্রাইলের (আঃ) মাধ্যমে নবীকে জানিয়ে দিয়েছেন; আর নামাজকে মহান রব্বুল আলামীন একান্ত কাছে ডেকে নিয়ে দান করেছেন। নামাজিদের প্রতি সুসংবাদ প্রদান করে আল­াহতায়ালা আরও বলেনঃ নিশ্চয়ই  যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে; আর নামাজ কায়েম করেছে এবং যাকাত প্রদান করেছে, তাদের রবের নিকট তাদের  জন্য ছওয়াব সংরক্ষিত রয়েছে। তাদের কোন আশঙ্কা নেই এবং দুঃখিতও হবে না (সূরা বাকারাহ: ২৭৭)। 
পবিত্র কোরআন শরিফের অসংখ্য জায়গায় আল­াহ তায়ালা নামাজের আদেশ দিয়েছেন। যেমন, আল­াহ তায়ালা তার প্রিয় হাবিব (সঃ) কে ওহীর মাধ্যমে প্রত্যাদেশ করছেন, আমার ঈমানদার বান্দাদের বলে দিন, যেন তারা নামাজ কায়েম করে এবং আমার দেয়া রিজিক থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে ওই দিন আসার পূর্বেই যেদিন কোন বেচা-কেনা চলবে না এবং কোন বন্ধুত্বও কাজে আসবে না (সূরা ইবরাহিম:৩১)। এক হাদিসে কুদসীতে রসুলুল­াহ (সঃ) এরশাদ করেছেন, মহান আল­াহ তায়ালা ফরমায়েছেন, আমি তোমার উম্মতের ওপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছি এবং এ প্রতিজ্ঞা করেছি যে, যে ব্যক্তি এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো গুরুত্ব সহকারে আদায় করবে আমি তাকে নিজ দায়িত্বে জান্নাতে প্রবেশ করাবো। আর যে ব্যক্তি গুরুত্ব সহকারে আদায় করবে না তার ব্যপারে আমার কোন দায়িত্ব নাই (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)। 
অগণিত হাদিসে নামাজের ব্যপারে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। হযরত জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হুজুর (সঃ) বলেছেন, বেহেশতের চাবি হলো নামাজ, আর নামাজের চাবি হলো ওযু (মুসনাদে আহমাদ)। চাবি ছাড়া যেমন ঘরে প্রবেশ করা যায় না, ঠিক তেমনি নামাজ যারাও জান্নাতে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে যাবে। ঠিকমতো নামাজ পড়লে, আমাদের চলতে ফিরতে প্রতিদিন যে গোনাহ হয় তা নিঃশেষ হয়ে যায়। নামাজ যে গোনাহকে মিটিয়ে দেয় সে ব্যপারে অনেক রেওয়াত বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি হুজুর (সঃ) কে বলতে শুনেছি, আচ্ছা বলো দেখি, তোমাদের কারোর বাড়ির সামনে যদি একটি নদী প্রবাহিত থাকে আর সে তাতে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে তাহলে কি তার শরীরে কোন ময়লা বাকি থাকতে পারে? সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) বললেন, কিছুই বাকি থাকবে না। তিনি বললেন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের দৃষ্টান্তও তদরূপ। এই নামাজগুলোর মাধ্যমে মহান আল­াহ তায়ালা গুণাহকে নিঃশেষ করে দেন (বুখারি, মুসলিম)। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও এক জুম্মা থেকে আর এক জুম্মা পর্যন্ত পঠিত নামাজ এর মধ্যকার সময়ের জন্য কাফফারা স্বরূপ, যে পর্যন্ত না কবীরা বা মারাত্মক গোনাহ করা হয় (মুসলিম)। হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) বলেন, আমি রসুলুল­াহ (সঃ) কে বলতে শুনেছি, যদি কোন মুসলমান ফরজ নামাজের সময় হলেই ভাল করে ওযু করে তারপর একাগ্রতার সাথে নামাজ আদায় করে, তার এ নামাজ তার আগের সমস্ত গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়, যে পর্যন্ত সে কবীরা গুনাহ থেকে দূরে থাকে। তার এ অবস্থা চলতে থাকে সমগ্র কালব্যাপি (মুসলিম)। হযরত আব্দুল­াহ ইবনে কুরত (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী করীম (সঃ) এরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেয়া হবে। যদি নামাজ ঠিক থাকে তবে বাকি আমলও ঠিক হবে। আর যদি নামাজ খারাপ হয় তাহলে বাকি আমলও খারাপ হবে (তাবারানি, তারগিব)। হযরত আলী (রাঃ) বলেন, রসুলুল­াহ (সঃ) মৃত্যুর আগে শেষ ওসিয়ত এই করেছিলেন যে, নামাজ, আপন গোলাম ও অধীনস্তদের ব্যাপারে আল­াহকে ভয় করো (আবু দাউদ)। নামাজের কতো গুরুত্ব যে মহানবী (সঃ) একেবারে জীবনের শেষ মুহূর্তেও নামাজের ব্যপারে জোর তাকিদ দিচ্ছেন। এই জন্য আমাদের সকলের উচিত নামাজ ঠিক মতো আদায় করা। তাই আসুন আমরা ঠিক মতো নামাজ আদায় করি; মহান আল­াহ’র নৈকট্যশীল বান্দাদের আবাসস্থল সর্বোচ্চ জান্নাত ‘জান্নাতুল ফেরদাউসের’ অধিবাসি হয়ে চিরকাল অবস্থান করি এবং মহান আল­াহতায়ালার এই ঘোষণার মধ্যে শামিল হই; মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়-নম্র; যারা অনর্থক কথা-বার্তায় লিপ্ত নয়; যারা যাকাত প্রদান করে; যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে হেফাজত করে...যারা আমানত ও অঙ্গীকার সম্পর্কে হুঁশিয়ার এবং যারা তাদের নামাজের হেফাজত করে; তারাই উত্তরাধিকার লাভ করবে জান্নাতুল ফেরদাউসের যেখানে তারা চিরকাল থাকবে (সূরা মুমিনুন: ১-১১)। 
(লেখক: মৎস্য-বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়; সিডনী থেকে)

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

ইসলাম

প্রায় ১ মাস আগে