খুলনা | রবিবার | ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

বাল্যবিবাহ রোধে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি

|
১২:১৭ এ.এম | ২৩ নভেম্বর ২০২২


একটি আধুনিক ও অগ্রগামী সমাজ বিনির্মাণে নারীদের সামাজিক উন্নয়নের বিকল্প নেই। শহরকেন্দ্রিক নারীরা সেদিক দিয়ে এগিয়ে থাকলেও পিছিয়ে আছেন প্রত্যন্ত ও গ্রামাঞ্চলের নারীরা। সেখানে বড় বাঁধা হয়ে আছে বাল্যবিবাহ। শহর কিংবা গ্রাম যেখানেই হোক, নারীর অধিকার অর্জনে প্রথম ধাপ হচ্ছে যেভাবেই হোক বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে।
আইন প্রয়োগ করা ও প্রশাসনের কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করায় বাল্যবিবাহ অনেকটা কমে এসেছিল। কিন্তু করোনা মহামারি আমাদের মতো মধ্যম আয়ের ও ছোট দেশগুলোর অল্পবয়সী মেয়েদের ওপর অভিশাপ নেমে আসে। একে তো টানা প্রায় ১৮ মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল, তার ওপরে করোনা মোকাবিলায় ব্যস্ত ছিল প্রশাসন। ফলে আমাদের সমাজে বাল্যবিবাহের মতো আরেকটি মহামারি ঘটে গেছে, সেটি বুঝতে আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেছে।
দেশে পুরো করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল দুই দফা। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের ২০২১ সালের এক গবেষণা বলছে, দেশে করোনার কারণে বাল্যবিবাহ ১৩ শতাংশ বেড়েছে। গত ২৫ বছরে যা বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এক গবেষণায় বলছে, করোনাকালে বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ৬৫টি করে বাল্যবিবাহ হয়েছে। সাত মাসে ২১ জেলার ৮৪ উপজেলায় মোট ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিবাহের তথ্য পেয়েছে তারা। গোটা দেশে গত দুই বছরে সেই চিত্রটা নিশ্চয় ভয়াবহ হওয়ারই কথা। মহামারিতে অসচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারগুলোর আয় বন্ধ হয়ে গেলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে করোনার কারণে কোন জেলা-উপজেলাগুলোতে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে, সেটি আবশ্যিকভাবে আমলে নিতে হবে। সেই সঙ্গে বাল্যবিবাহের সঠিক পরিসংখ্যান বা বিস্তৃত ডেটাবেইস গড়ে তুলতে হবে। কারণ, বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েদের আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা, তাদের প্রশিক্ষিত করে কর্মসংস্থানমুখী করে তোলা, ঝুঁঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ এড়ানো ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মতো অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করার অবকাশ থেকে যায়।
বাংলাদেশ সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহমুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছে। করোনা মহামারি অবশ্যই এখানে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করবে। এখনো সেই লক্ষ্যমাত্রার যথেষ্ট সময় আছে, পরিবর্তিত বাস্তবতার নিরিখে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে সেই অঙ্গীকার পূরণ করা সম্ভব। সুবিধাবঞ্চিত, অসচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারগুলোকে আশ্বস্ত করতে হবে, তারা যাতে সন্তানদের বোঝা মনে না করে।
বাল্যবিবাহ নিয়ে গণমাধ্যমের এক গোলটেবিল আলোচনায় বাল্যবিবাহ রোধে বেশ কিছু পরামর্শ উঠে এসেছে। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি কাজের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া উপবৃত্তি বাড়ানো, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালন বা খামার কার্যক্রমগুলো আরও বাড়াতে হবে। বাল্যবিবাহের কুফল, অপরাধ ও এর আইন নিয়ে প্রচারণা আরও বাড়াতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিনিধি, মসজিদের ইমাম, শিক্ষকসহ অন্য পেশাজীবীদের যুক্ত করে ঝুঁঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে উঠান বৈঠকের আয়োজন করতে পারে স্থানীয় প্রশাসন। বাল্যবিবাহ বন্ধে কাজীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে, অনিয়মকারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বয়স লুকিয়ে বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটায় জন্মনিবন্ধন সনদপ্রাপ্তিতে গোটা জনগোষ্ঠী ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এক্ষেত্রে শিশু জন্মের পরই একটি ইউনিক আইডি কার্ড তৈরি করতে হবে, যেটির ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী সময়ে জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরিও সহজ হয়ে যাবে। মোটকথা, একটি সুষম সমাজ গড়তে বাল্যবিবাহ রোধ করতেই হবে। এর জন্য কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণে দেরি করলে চলবে না। মহামারির কারণে আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ