খুলনা | বুধবার | ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ২৮ মাঘ ১৪৩২

করোনা হতে আমরা যা শিখলাম (পর্ব ২)

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০১:২০ এ.এম | ১৩ জুন ২০২১

মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে কারীমায় বলেছেন, ‘আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সবকিছুর তত্ত¡াবধায়ক’। (সূরা যুমার : ৬২)
মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া এই বিশ্বব্রহ্মান্ডে যা কিছু আছে এর সব কিছুই মহান আল্লাহ  তা’য়ালার সৃষ্ট বস্তু বা মাখলুক। আমরা সাধারণ দৃষ্টিতে এই মাখলুক হতে তার গুণ প্রকাশ হতে দেখি যেমন, সূর্য মহান আল্লাহ তা’য়ালার একটি মাখলুক তার গুণ হচ্ছে তাপ ও আলো দান করা, মেঘ মহান আল্লাহ তা’য়ালার একটি মাখলুক তার গুণ হচ্ছে বৃষ্টি দান করা, গাভী মহান আল­াহ তা’য়ালার একটি মাখলুক তার গুণ হচ্ছে দুধ দান করা, মৌমাছি মহান আল­াহ তা’য়ালার একটি মাখলুক তার গুণ হচ্ছে মধু দান করা, গাছ মহান আল্লাহ তা’য়ালার একটি মাখলুক তার গুণ হচ্ছে ফল ও ছায়া দান করা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মাখলুকের নিজ নিজ যে গুণ তার মধ্যে রয়েছে এটা কি তার নিজের? আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, সূর্য তাপ ও আলো দানকারী, মেঘ বৃষ্টি দানকারী, গাভী দুধ দানকারী, গাছ ফল ও ছায়া দানকারী, মৌমাছি মধু দানকারী কিন্তু একটু স্থির মস্তিষ্কে চিন্তা করলেই বোঝা যাবে যে এর পিছনে মহান আল্লাহ তা’য়ালার কুদরত রয়েছে।
তাবলিগ জামাতের মুবালি­গ ভাই আব্দুল ওহহাব রহমাতুাল্লহি আলাইহি খুব সুন্দরভাবে এই মাখলুকের পরিচয় তুলে ধরেছেন, তিনি বলতেন,
১) মাখলুক নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি, একে আল্লাহহ তা’য়ালা নিজ কুদরতের দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।
২) মাখলুকের মধ্যে যে গুণ আছে তা তার নিজের নয়, এই গুণ আল্লাহ তা’য়ালার দেওয়া।
৩) এবং এই গুণ প্রকাশ করার জন্যেও সে আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল, এটি নিজে কিছুই করতে পারে না।
ভাই আব্দুল ওহহাব রহমাতুল­াহি আলাইহির এই উক্তিগুলো হতে আমাদের কাছে এটি স্পষ্ট হয় যে, সূর্য নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি একে আল্লাহ তা’য়ালা নিজের কুদরতের দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে তাপ ও আলো দান করার যে গুণ তা এর নিজের নয় এই গুণ আল্লাহ তা’য়ালার দেওয়া এবং এই গুণ প্রকাশ করার জন্যও এটি আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল, এটি নিজে কিছুই করতে পারে না।
অনুরূপ, এই বিশ্ব জগতের যা কিছু আছে যেমন, মানুষ, জ্বীন, ফেরেশতা, পশু-পাখি, কীটপতঙ্গ, গাছপালা, নদী-নালা, সমুদ্র-পাহাড়, আকাশ-বাতাস, চাঁদ-সূর্য, আগুণ, পানি, মাটি সবইআল্লাহ তা’য়ালার-ই সৃষ্টি! এগুলো নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি, এগুলোকে আল্লাহ তা’য়ালা নিজ কুদরতের দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। এদের মধ্যে যে গুণ আছে তা এদের নিজের নয়, এই গুণ আল­াহ তা’য়ালার দেওয়া। এই গুণ প্রকাশ করার জন্যও এগুলো আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
লক্ষ্য করুন, আমাদের প্রিয় রসূলে কারীম সাাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাাল্লামকে হত্যা করার জন্য শত্র“রা তাঁর বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলেছিল। কাফির পালোয়ানদের চোঁখের সামনে দিয়েই প্রিয় নবীজী বের হয়ে চলে গেলেন! কাফিররা তাঁকে দেখেইনি! তাদের কিন্তু তখন ‘চোঁখ’ চোখের জায়গাতেই ছিল। আমাদের প্রিয় নবীজী তো তাদের সামনে দিয়েই বের হয়েছেন! কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমে ঐ ‘চোঁখগুলি’ নবীজীকে দেখতেই পারেনি। যে চোঁখ আল্লাহতা’য়ালার হুকুমে দেখে, সেই চোঁখই আবার আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমে দেখে না। অর্থাৎ চোঁখ নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি, আল্লাহ তা’য়ালা নিজ কুদরতের দ্বারা তাকে সৃষ্টি করেছেন। তার মধ্যে দেখার যে গুণ আছে তা তার নিজের নয়, এই গুণ আল­াহ তা’য়ালার দেওয়া। এই গুণ প্রকাশ করার জন্যও তা আল্লাহ তা’য়ালার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
নমরুদ যখন হযরত ইব্রাহীম আলাইহিসসাাল্লামকে আগুনে ফেলল, আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমে আগুণ হযরত ইব্রাহীম আলাইহিসসাাল্লামের জন্য একদম শান্তির জায়গায় পরিণত হল! এত বড় আগুণ, তাও ইব্রাহীম আলাইহিসসাাল্লামের একটা পশমও পুড়াল না। যে আগুণ আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমে পুড়ায় আবার সেই আগুণই আল­াহ তা’য়ালার হুকুমে পুড়ায় না। অর্থাৎ আগুণ নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি, আল্লাহ তা’য়ালা নিজের কুদরতের দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে পুড়ানোর যে গুণ আছে তা এর নিজের নয়, এই গুণ আল্লাহ তা’য়ালার দেওয়া। এই গুণ প্রকাশ করার জন্যও আগুণ আল­াহ তা’য়ালার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
ইব্রাহীম আলাইহিসসাল্লাম মহান আল্লাহর হুকুমে পুত্র ইসমাইল আলাইহিসসাল­ামকে কোরবানি করার জন্য তাঁর গলায় ধারালো ছুরি চালালেন কিন্তু ছুরি ইসমাইল আলাইহিসসাল­ামের একটি পশমও কাটতে সক্ষম হল না। আর ঐ ছুরিতেই ইব্রাহীম আলাইহিসসাল্লাম বকরী কোরবানী করলেন। ছুরির ক্ষেত্রেও ঐ একই হুকুম, যে ছুরি আল­াহ তা’য়ালার হুকুমে কাঁটে আবার সেই ছুরিই আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমে কাটে না। ছুরির কাঁটার গুণ প্রকাশ হওয়ার জন্য ছুরি আল­াহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
এজন্য জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে খুব ভালোভাবে মনে রাখতে হবে, মাখলুক নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি, একে আল্লাহ তা’য়ালা নিজের কুদরতের দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে যে গুণ আছে তা এর নিজের নয়, এই গুণ আল্লাহ তা’য়ালার দেওয়া। এই গুণ প্রকাশ করার জন্যও এটি আল­াহর ইচ্ছার (কুদরতের) উপর নির্ভরশীল, এটি নিজে কিছুই করতে পারে না।
অনুরুপভাবে মনে রাখতে হবে,
১) করোনা নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি, একে আল্লাহ তা’য়ালা নিজের কুদরতের দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।
২) এর মধ্যে রোগ সৃষ্টির যে গুণ আছে তা তার নিজের নয়, এই গুণ আল্লাহ তা’য়ালার দেওয়া।
৩) আর তার এই গুণ প্রকাশ করার জন্যও সে আল্লাহর ইচ্ছার (কুদরতের) উপর নির্ভরশীল, সে নিজে কিছুই করতে পারে না।
আমরা লক্ষ্য করে থাকব, ত্রিশ বছর বয়সের টকবগে যুবক করোনাতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে আবার ১১৫ বছরের বৃদ্ধা করোনা দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে গেছে। আবার অনেকে সংক্রমিত হওয়ার পরও তাদের শরীরে কোন প্রকার রোগের লক্ষণই দেখা যায় নি। অর্থাৎ করোনা দ্বারা সংক্রমিত হলেই যে সে রোগাক্রান্ত হবে বা মৃত্যুবরণ করবে এমনটি নয়। এই ভাইরাস একজনের শরীর হতে অন্যজনের শরীরে চলে যেতে পারে কিন্তু তার শরীরে গিয়ে সে ক্রিয়া করবে কি না করবে বা কতটুকু ক্রিয়া করবে এটা আল­াহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
(তবে একথাও ভুলেগেলে চলবে না, মহান আল্লাহ তা’য়ালার উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস রেখে সর্বোচ্চ সাবধানতামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করা এবং প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ গ্রহণ করা ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী নয়।)
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সঠিকটা বুঝার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : বায়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রনালয়, খুলনা।
 

প্রিন্ট