খুলনা | শনিবার | ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ | ২২ মাঘ ১৪২৯

ভিডিও গেম আসক্তি ও করণীয়

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিজ্ঞানী |
০২:০৯ এ.এম | ১৩ ডিসেম্বর ২০২২


ঘটনা-১. সম্রাট (ছদ্ম নাম) বয়স ২২ বছর। সে দিনের বেশির ভাগ সময় ল্যাপটপ বা কোন ইলেকট্রনিকস যন্ত্রে গেম খেলাকে কেন্দ্র করে বেশ সময় পার করে। সে যখন ল্যাপটপ বা কোন ইলেকট্রনিকস যন্ত্রে গেম খেলা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়,তখন তার রাগ হয়। তখন  সে কোন কিছুতে মন বসাতে পারে না। সে সময় কেউ যদি সম্রাটের সাথে ভালো কথাও বলে- তাতে তার মেজাজ আরো বেশি খারাপ হয়।
ঘটনা-২. নিহার (ছদ্ম নাম) বয়স ২০ বছর। ইদার্নিং তার স্কুল, বাড়ি বা দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ কেন্দ্রীকরণে সমস্যা দেখা দিয়েছে। সে আর আগের মত নিত্য দিনের চলার জন্য নিতান্ত যতটুকু প্রয়োজন, তার বেশি কাজ করতে চায় না। বর্তমানে দেখা গেছে সে স্কুল বা বাড়ির কাজ বাদ দিয়ে দিনের বেশির ভাগ সময় ল্যাপটপ বা কোন ইলেকট্রনিকস্ যন্ত্রে সময় কাটাতে বা গেম খেলতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
ওয়াল্ড হেলথ ওর্গানাইজেসন এর মতে, ভিড়িও গেম খেলার চিন্তা থেকে গেম খেলতে বাধ্য হওয়াকে-একটি মানসিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন-যাকে গেম ডিসঅর্ডার হিসেবে অবিহিত করেছেন। গেম ডিসঅর্ডার টার্মটি মূলতঃ তাদের জন্য প্রযোজ্য যারা দিনের বেশির ভাগ সময় গেম খেলে-যা তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, শিক্ষা জীবন, পেশাগত জীবন অথবা জীবনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। 
ভিডিও গেম আসক্তিমূলক বৈশিষ্ট্য মন্ডিত কারণ এরুপ গেম ব্রেনের সন্তুষ্টির মাত্রাকে প্রভাবিত করে শিশুর আচরণের উপর নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা পালন করে। ক্যালিফোর্নিয়ার স্টেট্য বিশ^বিদ্যালয় এক গবেষণায় দেখতে পান যে ভিডিও গেম ব্রেনকে সেভাবেই ক্ষতিকর হিসেবে প্রভাবিত করে, যেভাবে ড্রাগ বা এলকোহল ব্রেনের ক্ষতি সাধন করে। 
ভিডিও গেমের আসক্তির লক্ষণ সমূহ : বর্তমান সময়ে ভিডিও গেম সমস্যা একটি বড় রকমের মানসিক ব্যাধি হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। ভিডিও গেম শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশমূলক ভাবধারয় ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হিসেবে আবর্তীত। এখানে ভিডিও গেমেরে কিছু ক্ষতিকর প্রভাবমূলক লক্ষণ উলে­খ করা হলোÑ 
(১) বাধ্যতামূলক আচরণ প্রদর্শন : শিশু সর্বদা গেম খেলায় ফিরে আসার জন্য ব্যস্ততামূলক আচরণ প্রদর্শন করে। শিশু গেম খেলার সুযোগ হতে বঞ্চিত হলে অসহিষ্ণু ও আক্রমণাত্মক আচরণ প্রদর্শণ করে।
(২) শারীরিক মুভমেন্টের অভাব দেখা দেওয়া : শিশু গেমে আসক্তি হলে কোন নির্দিষ্ট স্থানে বসে থেকে প্রবনতা বৃদ্ধি পায় এবং শারীরিক নড়াচড়া কমে যায়।
(৩) ঘুম কমে যাওয়া: শিশু গেমে আসক্ত হলে খেলাকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত থাকার জন্য তার ঘুম কমে যায়। 
(৪) জীবন সমস্যার মোকাবেলা আগ্রহীনতা: শিশু গেমে আসক্ত হলে জীবনের সমস্যা সমূহ মোকাবেলা করার তুলনায় তাকে এড়িয়ে যাবার প্রবনতায় আবদ্ধ হয়।
(৫) প্রবঞ্চনামূলক আচরণের প্রাধান্যতা: গেমে আসক্ত শিশু গেম খেলাকে প্রাধান্য দেবার কারণে শিশুর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে প্রবঞ্চনামূলক আচরণের ধারা বিকাশ লাভ করতে দেখা যায়। 
(৬) সামাজিক মেলামেশার অভাব দেখা দেওয়া : ভিডিও গেমে আসক্ত শিশু দিনের সময়ের একটি বড় অংশ খেলার সাথে সম্পৃক্ত থাকার দরুণ শিশুর সামাজিক বন্ধনে একটি নেতিবাচকতামূলক ভাবধারার আবর্তন ঘটে। 
(৭) বিদ্যালয় কার্যক্রম ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে অবহেলা: গেমে আসক্ত হওয়ার দরুণ অনেক শিশুর স্কুল কার্যক্রমে অবহেলা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে আস্থাহীনতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়ে থাকে। 
ভিডিও গেমের ক্ষতিকর প্রভাব: দৃষ্টি সংক্রান্ত সমস্যা: অতিরিক্ত গেম খেলার কারণে দৃষ্টি শক্তির সমস্যা যেমন- চোখ লাল হওয়া, ঝাপসা দৃষ্টি দেখা দেয়। 
(২) শারীরিক সমস্যা: গেমে আসক্ত হলে ঘুম কমে যাওয়া দরুণ বিভিন্ন প্রকার শারীরিক সমস্যা যেমন- মাথা ধরা, বুক ধড়ফড় করা, হজমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। 
(৩) মনোযোগ কেন্দ্রীকরণে সমস্যা: শিশু গেমে আসক্ত হওয়ার দরুণ শুধু গেম সংক্রান্ত বিষয় ব্যতীত অন্য কোন বিষয়ে মনোযোগ কেন্দ্রীকরণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। 
(৪) যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থতা: গেমে আসক্ত শিশু গেম সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যস্ত থাকায় সময়ের সঠিক ব্যবহারের ব্যর্থতার দরুণ পরিবার, বিদ্যালয়ে অনেকাংশে যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়। যা শিশুর আগামী দিনকে সংকটাপন্ন করে তুলতে পারে। 
(৫) সমাজ বিরোধী ব্যক্তিত্বের বিকাশ: ভিডিও গেমের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংঘ আপরাধমূলক কার্যকরী পদক্ষেপে ভূমিকা পালনের মাধ্যমে পরবর্তীতে শিশুকে সংঘবদ্ধমূলক অপরাধ সংক্রান্ত কাজে  সম্পৃক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে যা সমাজের শৃঙ্খলা বিধানে অশনি সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে। 
(৬) বিকাশমান ধারা হ্রাস পাওয়া: বাচ্চারা প্রযুক্তির সাথে অনিয়ন্ত্রিত ভাবে সংযুক্ত হওয়ার দরুণ তাদের ভাষা ভিত্তিক কার্যক্রম ক্রমে হ্রাস পায়। ফলশ্র“তিতে ক্রমে তাদের ভাষার বিকাশ ব্যাহত হওয়ার পথে অগ্রসর হয়।
ভিডিও গেম আসক্তি দূরীকরণে করণীয় : 
(১) ভিডিও গেম খেলার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করুন: একটি নির্দিষ্ট নিয়ম করে স্কুল খোলা সময়ে দিনে ১ ঘন্টা করে এবং বন্ধ সময়ে দিনে ২ থেকে ৩ ঘন্টা করে খেলার নিয়ম চালু করা যেতে পারে। 
(২) সন্তানের সাথে ভিডিও গেম খেলার ব্যাপারে কথা বলুন: সন্তানকে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে এবং কোন প্রকার বিতর্ক এড়িয়ে তার জায়গায় অবস্থান করে শিশুর চিন্তার জগৎকে পরিবর্তনের চেষ্টা করুন। 
(৩) অন্যান্য কাজে ব্যস্ত রাখুন: সন্তানকে গেম থেকে দূরে রাখার জন্য ঘরের বাইরে ছোট ছোট কাজ অর্পণ করুন এবং তা পালনের উপর তাগিদ দিন। 
(৪) সন্তানকে সময় দিন এবং গেম বহির্ভূত কাজকে মানসিক তৃপ্তিতে ভরে তুলুন : ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানকে সময় দেবার চেষ্টা করুন এবং গেম বহির্ভূত কার্যক্রমকে বিভিন্ন প্রকার পুরস্কারের মাধ্যমে মানসিক তৃপ্তিতে ভরে তুলুন।
আপনার সন্তান আপনার, সমাজ ও দেশের সম্পদ। তাকে মানবিকতাপূর্ণ ও দায়িত্ববান গড়ে তোলার সবার জন্য প্রয়োজন। আর তার জন্য দরকার মানসিক ও শারীরিক ভাবে সুস্থভাবে গড়ে উঠা। তাই সন্তানের আচরণে কোন প্রকার বিপত্তি তৈরি হওয়ার আগে তাহা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করুন। আপনার সন্তানের আচরণে কোন প্রকার অস্বভাবিকতা প্রতীয়মান হলে এক জন দক্ষ মনোবৈজ্ঞানিকের নির্র্দেশনা গ্রহণ করা যেতে পরে।
লেখক : মনোবিজ্ঞানী, সহযোগী অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ